fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

১৪০টি পরিবারের খাবারের দায়িত্ব নিলেন মহিষাদল রাজ হাইস্কুলের প্রাক্তনীরা

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক: ‘বন্ধু, কিসের তরে অশ্রু ঝরে, কিসের লাগি দীর্ঘশ্বাস / হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস / রিক্ত যারা সর্বহারা সর্বজয়ী বিশ্বে তারা / গর্বময়ী ভাগ্যদেবীর নয়কো তারা কৃতদাস’। রবি ঠাকুরের এই গান তাঁদের জানা। আর তাই নিজের নিজের কাজকর্ম সামলে, সংসার সামলে হামলে পড়েছে রিক্ত, নিঃস্ব, সর্বহারাদের পাশে।

বিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও বন্ধুত্বের মধ্যে ছেদ পড়েনি এখনও। এঁরা বর্তমানে কেউ ডাক্তার, কেউ ফার্মাসিস্ট, কেউ শিক্ষক, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ এলআইসি-র প্রশাসনিক পদাধিকারী, কেউ পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর, কেউ সফটওয়্যার কর্মী, কেউ নার্স, কেউ MBA পাঠরত তো আবার কেউ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সবার লক্ষ্য এক এবং অদ্বিতীয়।

করোনা আবহে এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিত নির্মল বাতাস পৌঁছে দেওয়া।

ডাক্তারি করে সৌরভ, অর্পণ, প্রণয়, ফার্মাসিস্টের কাজ রাতুলের, শিক্ষকতায় যুক্ত অয়ন, সফটওয়্যার কর্মী শৈবাল, আইআইটি-র গবেষক অশেষ, পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর অমিত, এলআইসির প্রশাসনিক পদাধিকারী কিংশুক, এমবিএ পাঠরতা পৌলমী ছাড়াও আছেন সানোয়ার, কৌশিক, পূজন আরও কয়েকজন। যাঁরা সবাই মহিষাদল রাজ হাইস্কুলের ২০১১ র বিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তনী।

কর্মসূত্রে এবং জীবনসূত্রে সবাই ভিন্নতর জায়গায় রয়েছেন। আজ করোনার আবহে সবাই একছাতার তলায় হাজির। মানবতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ হয়েছে সকলেই। এঁরাই একত্রিত হয়ে উদ্যোগ নিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদল, কাপাসএড়িয়া, চৈতন্যপুর, কুঁকড়াহাটি, নন্দকুমার এলাকার মোট ১৪০টি পরিবার খাদ্যের দায়িত্ব নিয়েছে। যতদিন লকডাউন চলবে, এই দায়িত্ব তাঁদের। পুরো লকডাউনের প্রতি সপ্তাহে চাল, আলু, পেঁয়াজ, সোয়াবিন, মুসুর ডাল, সবজি, সাবান, চিড়ে, গুঁড় পৌঁছে দেবে ওই পরিবারগুলোতে। গত ১৫ এপ্রিল মহিষাদল থেকে তাঁরা এই কাজ শুরু করেছে।

আজ এঁরা নিজ নিজ পেশায় যুক্ত থেকে দায়িত্ব সামলাচ্ছে, আবার দারিদ্র অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারও নিয়েছে। এঁদের মধ্যে বাঁঙ্গুর হাসপাতালের ডাক্তার সৌরভ ভুঁইয়া নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একাধারে সামলাচ্ছেন করোনায় আক্রান্ত রোগিদের। আবার সময় পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছেন সমাজের সেবায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের প্রত্যেককে মিলিয়ে দিয়েছে। একত্রিত করে দিয়েছে। আর তাঁরা জানে ‘সবে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’। বিশ্ব জুড়ে করোনা ভাইরাসের কথা তাঁদের অজানা নয়। তেমনি অজানা নয় তাঁদের এক সময়ের স্কুল জীবনের এলাকার গরিবগুর্বো মানুষগুলোর ছবি। এই লকডাউনের বাজারে কেমন আছেন তাঁরা, এটাই তাঁদের মাথাব্যথার কারণ। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিল এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সেইসব সাধারণ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কেবলমাত্র ত্রাণ নয়, যতদিন লকডাউন চলবে ততদিন ১৪০টি পরিবারের খাবারের দায়িত্ব নেবে এই প্রাক্তন প্রাক্তনীরা।

বাঙ্গুঁর হাসপাতালে চিকিৎসারত ডাক্তার সৌরভ ভুঁইয়া। এখানকার প্রাক্তন ছাত্র। তিনি বলেন, ‘একজন সহনাগরিক হিসেবে এসময় পাশে দাঁড়াতে পেরে খুবই খুশি। এরকম কাজের অভিজ্ঞতা জীবনে প্রথম। ভবিষ্যতে আরও বেশি করে দুঃস্থ ও আর্ত মানুষের কাছে পৌঁছনোর শক্তি পাব এবার। ভবিষ্যতে আমরা দু:স্থ মানুষের স্বাস্হ্য, শিক্ষা এবং অন্ন জোগানোর কাজ করব। আর এক কৃতি প্রাক্তনী কৌশিক মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের এই কাজটাকে হৃদয় দিয়ে করছি। আসলে মানুষের পাশে আসতে পেরে মনের ভেতর ভালো করার তাগিদটা আরও জেগে উঠছে। ভবিষ্যতে এটাই আমাদের আরও উৎসাহ জোগাবে’।

আজ থেকে ১৭ বছর আগে যেদিন স্কুলে ভর্তি হয়েছিল, সেদিনই নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। সেদিনের সেই বন্ধুত্বের বন্ধন আজও অটুট। যেখানে নেই কোনও স্বার্থ, নেই কোনও অহংকার। শুধু রয়েছে বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর মানুষের পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার। একদিন সবাই একজায়গায় ছিল। একসঙ্গে খুনসুঁটি, একসঙ্গে মারামারি, রাগ, অভিমান ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। আজ আর কেউই ছোট নেই। সকলেই ম্যাচিওরড। সকলেই অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। মানসিকভাবেও বড়।

কিন্তু পড়াশোনা বা পেশার কারণে সবাই একসঙ্গে সব সময় মিলিত হতে পারে না। কিন্তু কখনও ছেদ পড়েনি ভালোবাসায় ও বন্ধুত্বে। কয়েকজন বন্ধু পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় থাকলেও অনেকেই রয়েছে জেলার বাইরে। কয়েকজন আবার ভিন রাজ্যে রয়েছেন। সব সময় নিজেরা একত্রিত হতে পারেন না। অথচ যোগাযোগ আছে নিত্যদিন। সৌজন্যে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, হোয়াটস-অ্যাপ এর মাধ্যমেই আজ তাঁরা সকলেই এক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছে। আর্তের পাশে দাঁড়ানো।

এঁদের কথায়, স্কুল জীবন থেকেই আমরা বন্ধুরা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করতাম। তা মাঠ পরিস্কার হোক বা স্কুলের স্পোর্টস সব কিছুই। আর আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে শিখিয়েছেন স্কুলের শিক্ষকরা। অনেক বছর পর যখন বন্ধুরা সাবলম্বী হলাম, তখন আমাদের ইচ্ছে হল যে মানুষ হয়ে মানুষের জন্য কিছু করার। তাই অন্তরের একটা তাগিদ থেকে শুরু করলাম ভালো কিছু করার। খবর নিতে শুরু করলাম মানুষজনের।

যেখানে আজও মানুষ অভুক্ত থাকেন, বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যান, সেই পরিবারগুলোতে পৌঁছতে পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম। বন্ধুদের সকলকে জড়ো করে সংস্থার নাম দিলাম এনআইও। যার মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানুষের কাছে অন্ন জোগানোর অঙ্গীকার থাকবে। এই চিন্তা-ভাবনা থেকেই আমাদের এগিয়ে চলার মন্ত্র শুরু। আজ তাঁরা দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকেও গাইতে ভালোবাসে ‘বন্ধু, রহো রহো রহো সাথে / আজি এ সঘন শ্রাবণপ্রাতে / ছিলে কি মোর স্বপনে সাথীহারা রাতে / বন্ধু, বেলা বৃথা যায় রে / আজিএ বাদলে আকুল হাওয়ায় রে / কথা কও মোর হৃদয়ে, হাত রাখো হাতে ‘।

Related Articles

Back to top button
Close