fbpx
একনজরে আজকের যুগশঙ্খগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

বাংলাদেশের হিন্দু নারীরা কেন উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত?

তসলিমা নাসরিন : যদিও বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে, নারী নীতিতেও বলা হয়েছে সমান অধিকারের কথা, কিন্তু দেশের কোনও নারীই পিতা-মাতার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির সমান অংশ পায় না। মুসলমান নারী তাদের ভাইরা যতটুকু পায়, তার অর্ধেক পায়। আর হিন্দু নারীরা তো কোনও ভাগই পায় না। বিভিন্ন ধর্মালম্বীদের পারিবারিক আইন সমানাধিকারের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি, হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। মূল সমস্যা এখানেই। কোনও ধর্মগ্রন্থই যেহেতু নারীর সমানাধিকারের কথা বলেনি, সেহেতু নারীকে সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ফৌজদারি আইন কিন্তু ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মশাস্ত্র অনুসরণ করেনি। শুধু পারিবারিক আইনটিকেই ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে, সে কারণে সংবিধানে নারীর সমানাধিকারের কথা থাকলেও আইনে নেই। এটি দ্বিচারিতা ছাড়া আর কী? রাষ্ট্র যখন দ্বিচারী হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের প্রতি সম্মান কী করে মানুষের থাকবে! হাজার হাজার বছরের পুরোনো নারীবিরোধী রীতিকে আধুনিক রাষ্ট্রে আইন হিসেবে ঢুকিয়ে দিয়ে কোনও ধর্মই কিন্তু উদ্ধার হয়না, শুধু রাষ্ট্রের হর্তাকর্তাদের পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রই প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়।

সমানাধিকারের ভিত্তিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দাবি কি আজ থেকে? আমি নিজেই তো আশির দশক থেকে এ নিয়ে সরব। কিন্তু আমি তো নিতান্তই এক লেখক। নারীর সমানাধিকারের জন্য যেসব নারী সংগঠনের কর্মীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন, তাঁদের দাবিও তো কোনও সরকার মেনে নেয়নি। মাঝে মাঝে মনে হয় ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন যদি পুরুষকে অসম্মান করতো; বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে পুরুষের যদি নারীর চেয়ে অধিকার কম হতো, অর্ধেক হতো, বা হতোই না, তবে কি এই আইনটিকেই এভাবেই রাখা হতো যেভাবে আদিকাল থেকে রাখা হয়েছে? আমরা এর উত্তরটি জানি, হতো না। একে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া হতো। এখন যেহেতু পারিবারিক আইনটি নারীবিরোধী আইন, তাই নারীবিরোধী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এটিকে সাদরে গ্রহণ করছে। যুক্তিবুদ্ধির মানুষেরা যতই এটির সংশোধন দাবি করুক, সরকারের কোনও হেলদোল নেই। কারণ শাসকগোষ্ঠির লোকজন খুব ভালোভাবেই অবগত আছেন যে, দেশের অধিকাংশ মানুষ নারীবিরোধী সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত, ধর্ম এতে ইন্ধন জোগায় বলে ধর্মের অন্য কোনও ভালো দিকের চর্চা না হলেও এই মন্দ দিকটির চর্চা বেশ মহাসমারোহে হয়।

হিন্দু ধর্মালম্বীদের অনেকেই মুসলমান মৌলবাদিদের অত্যাচারে প্রায়শই দেশ ত্যাগ করতে, অথবা দেশের ভেতর মুখ বুজে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের, পৃথিবীর সর্বত্রই, প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে ধর্ম। বাংলাদেশের হিন্দুদেরও তাই। তাদের ধর্মের ওপর আঘাত আসে বলেই তারা ধর্মকে আঁকড়ে ধরে। সে কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশ ভারতে ধর্মের সংস্করণ সম্ভব হলেও সংখ্যালঘু হিন্দুর দেশ বাংলাদেশে তা সম্ভব হয় না। সমানাধিকারে বিশ্বাসী হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু নারীপুরুষ ধর্মের সংস্করণের দাবি করেছেন, এতে আপত্তি করছে হিন্দু মহাজোট, ইস্কন নামের হিন্দু সংগঠনগুলো। ঠিক একই রকম মুসলমানদের ধর্মীয় আইন সমানাধিকারের ভিত্তিতে করার দাবি ওঠালে মুসলমান মৌলবাদিরা দেশ জুড়ে জ্বালাও পোড়াও শুরু করে।

বাংলাদেশে হিন্দুদের পারিবারিক আইন প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী রচিত। সেই ধর্মশাস্ত্রে হিন্দু নারীকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। পুরুষেরা যত ইচ্ছে বিয়ে করতে পা্রে, স্বামীকে তালাক দেওয়ার অধিকার কোনও নারীর নেই, বাপের সম্পত্তি, স্বামীর সম্পত্তি, কোনও সম্পত্তিতেই নারীর কোনও অধিকার নেই। হিন্দু মেয়েরা কী যে দুঃসহ জীবন কাটাতে বাধ্য হয়! অত্যাচারী স্বামীকে ত্যাগ করার কোনও অধিকার তাদের নেই,তাদের পায়ের তলায় মাটি নেই, অভাব অনটনে স্থাবর অস্থাবর কোনও সম্পত্তিই তারা ভোগ করতে পারে না, যেহেতু উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের কিছুই পাওয়ার অধিকার নেই। মেয়েরা বিধবা হলে তাদের আর দাঁড়াবার কোনও জায়গা থাকে না। যারা অর্থনৈতিক ভাবে স্বনির্ভর , তারা না হয় বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু যে বিধবারা পরনির্ভর বা যে পরনির্ভর সধবাকে স্বামী ভরণ পোষণ দেয় না, তাদের তো বেঁচে থাকার জন্য কোনও উপায় থাকে না। তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি, ওটিই তাদের দুঃসময়ে সহায় হতে পারতো।

এককালে স্বামীর মৃত্যু হলে স্বামীর চিতায় মেয়েদের ছুড়ে দেওয়া হতো, আগুনে জ্বলে পুড়ে জ্যান্ত মানুষটির মৃত্যু হতো। এই বীভৎস সহমরণ বা সতীদাহের কতো গুণগান যে গাওয়া হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। সতীদাহের আগুন থেকে বাঁচলেও সমাজ থেকে বিধবা মেয়েদের নির্বাসন দেওয়া হতো কাশিতে, সেখানে বিধবারা ধুকে ধুকে মরতো। হিন্দু আইন পালন করলে বিধবাদের প্রায় একই দশা হয়, এই একবিংশ শতাব্দিতেও। চিতার অদৃশ্য অনলে আজকের বিধবাকেও জ্বলতে হয়, অথবা পরমুখাপেক্ষী হয়ে অভাবে অত্যাচারে ধুকে ধুকে মরতে হয়।

এই জীবন থেকে নারীর মুক্তি পাওয়ার বিরুদ্ধে জেগে উঠেছেন প্রচন্ড পুরুষতান্ত্রিক হিন্দু নেতারা। তাঁরা বলছেন হিন্দু মেয়েরা তালাক দেওয়ার অধিকার পেলে বা বিধবারা পিতার সম্পত্তি পেলে, যেহেতু হিন্দু পুরুষেরা ডিভোর্সি বা বিধবাদের বিয়ে করে না, তাদের বিয়ে করবে মুসলমান পুরুষেরা। এবং হিন্দু মেয়েদের সম্পত্তি চলে যাবে মুসলমানদের হাতে। হিন্দুরা তখন জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে। এই যদি ভয়, তাহলে তারা আইন সংশোধন করে ডিভোর্সী এবং বিধবাদের নিজেরাই কেন বিয়ে করছে না! হিন্দু মেয়েদের বঞ্চিত করে এ কেমন ধর্ম রক্ষা, এবং সম্পত্তি রক্ষা!

আর কত যুগ হিন্দুর এবং মুসলমানের বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনের পরিবর্তন সংশোধন নির্ভর করবে কট্টরপন্থীদের ওপর? সভ্য শিক্ষিত মানুষ এই দায়িত্ব নিক। মনে রাখা জরুরি, পৃথিবীর কোনও ভালো কাজ আজ পর্যন্ত ধর্মান্ধদের দ্বারা হয়নি।

১৯৫৬ থেকে ভারতের শাস্ত্রনির্ভর হিন্দু আইন পরিবর্তন করে সমানাধিকারের ভিত্তিতে করা হলেও সংখ্যালঘু মুসলমান ধর্ম আঁকড়ে বসে আছে, তারা ধর্মীয় আইন ত্যাগ করবে না, যে ধর্মীয় আইন মেয়েদের মানুষ বলে গণ্য করে না। এক দেশ এক আইন, অর্থাৎ অভিন্ন দেওয়ানি বিধির জন্য যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা দাবি করলেও ধর্মান্ধরা রাজি নয়। ধর্মান্ধরা নিশ্চিতই নারীবিদ্বেষী। তাই আইনের মাধ্যমে নারীকে দাবিয়ে রাখতে, নারীকে পেষণ করতে, নারীকে পুরুষের দাসি করে রাখতে তাদের উৎসাহের সীমা নেই।

হিন্দু নারীদের পিতার সম্পত্তির ভাগ না পাওয়া কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবেনা, জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। এই হাইকোর্টের আরও একটি রুল জারি করা জরুরি, ‘মুসলমান নারীদের পিতার সম্পত্তিতে সমান ভাগ না পাওয়া কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।’

 

হিন্দুদের বিবাহ নিবন্ধন হওয়ার কথা হিন্দু আইনে নেই, সে কারণে সাধারণত বিবাহ নিবন্ধন হয় না। যে হিন্দু পুরুষেরা দেশের বাইরে বাস করছেন, দেশে ফিরে বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারেন না দেশের বাইরে। বিরাট সমস্যার মধ্যে তাঁদের পড়তে হয়। কারণ বিয়ে নিবন্ধন না হওয়ায় কোনও প্রমাণ থাকে না বিয়ের। বিয়ে নিবন্ধন না থাকার দূর্দশা সম্পর্কে বেশ ক’জন ভুক্তভোগী হিন্দু নারী-পুরুষ, যেহেতু সব হিন্দু নারী পুরুষই নারীবিরোধী হিন্দু আইনের পক্ষে নন, বলেছেন, ”প্রবাস জীবনের পরবর্তী সময়ে স্ত্রীকে দেশ থেকে নিয়ে যেতে ভোগান্তীর শেষ ছিল না। পুরোহিতের কাছ থেকে সনদ সংগ্রহ করে নোটারী পাবলিকের দপ্তরে সাক্ষী উপস্থাপন করে নোটারী পাবলিকের সনদ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে উপস্থাপনের পরে মিলেছে স্ত্রীর সেই কাংক্ষিত ভিসা।‘’ ‘’ ছুটিতে বেড়াতে বের হই। তবে বিবাহ নিবন্ধন না থাকায় তা প্রদর্শনে ব্যর্থতার কারণে সব সময় সব হোটেলে থাকা যায় না ।‘’ ‘’ আমাকে ডিপিএস হিসেবের নমিনী করেছিলেন আমার স্বামী। স্বামীর মৃত্যুর পরে আমি বিয়ের প্রমাণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে প্রদানে ব্যর্থ হই। শুরু হয় ভোগান্তির দিনরাত্রি।‘’ হিন্দু নারী-পুরুষের যতই ভোগান্তি হোক, তবুও বিয়ের নিবন্ধনে রাজি নন হিন্দু ধর্মের নেতারা।

ইদানিং সরকারি সহযোগিতায় কিছু বিবাহ নিবন্ধন শুরু হয়েছে । বিদেশ যাত্রায়, ভ্রমণে, প্রবাস জীবনে, সম্পদের হস্তান্তর এবং দানপত্র তৈরি করতে, আদালতের প্রামাণিক বৈধ পন্থায় তালাক প্রদানে নারীকে সুরক্ষা দিচ্ছে, বাল্য বিবাহও রোধ হচ্ছে । কিন্তু খুব অল্প ক’জন হিন্দুই এই সুবিধে নিচ্ছে। অধিকাংশ হিন্দুই ধর্মীয় আইনের অযুক্তির শেকলে বন্দি।

  • আসলে সভ্যতার এবং সমানাধিকারের পক্ষের কোনও কাজ ধর্মীয় নেতাদের হাতে দেওয়া উচিত নয়। তাঁরা কোনওদিনই কোনওকালেই সমানাধিকারের সমাজ চান না, তাঁরা মানবাধিকারে, গণতন্ত্রে, সমতায়, উদারতায়, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করেন না। তাঁদের অগ্রাহ্য করে ধর্মের নয়, সম্পূর্ণ সমানাধিকারের ভিত্তিতে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মুসলমান এবং মানব ধর্মে বিশ্বাসী সকলের জন্য এক আইন আনতে হবে। সবাইকে সমান ভাবে দেখতে হলে সংবিধানকে কোনও গোষ্ঠীর নয়, বরং ধর্ম বর্ণ জাত জেণ্ডারের উর্ধে উঠে সকলের সংবিধান করা জরুরি। সংবিধান থেকে রাষ্ট্র ধর্মটি বিদেয় করতে হবে। ধর্ম মানুষের বিশ্বাস, রাষ্ট্রের বিশ্বাস নয়। রাষ্ট্রের ঘাড়ে যদি কোনও একটি ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের সংবিধান বলতে পারে না যে নারী পুরুষের অধিকার সমান। বললে সেটি মিথ্যেচার হয়ে যায়। রাষ্ট্রকে দ্বিচারিতা ত্যাগ করতে হবে।

Related Articles

Back to top button
Close