fbpx
ব্লগহেডলাইন

২২ গজেও বর্ণবৈষম্যের ছায়া!

আসাদ মল্লিক: আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে তোলপাড় গোটা বিশ্ব। ইতিপূর্বে বিশ্বের নানা প্রান্তে বর্ণবৈষম্য-জাতিবৈষম্যের ঘটনায় সময়ে সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন মানুষ। খেলার জগতেও এমন বৈষম্যের ছায়া পড়েছে। ক্রিকেট সহ অন্যান্য খেলার মাঠে ইতিপূর্বে দেখা গেছে বর্ণবৈষম্যের বর্বরতা। সম্প্রতি ব্রেসিয়া ও লেজিও ফুটবল ক্লাবের মধ্যে আয়োজিত একটি ম্যাচে ইতালিয়ান স্ট্রাইকার মারিও বালোতেলি বর্ণবৈষম্যের শিকার হন। তৎক্ষণাৎ লেজিও সমর্থকদের বিরুদ্ধে সরব হন বালোতেলি, প্রতিবাদে এগিয়ে আসেন লেজিওর কোচ সাইমন ইনজাঘি। লিখিত তথ্যানুযায়ী, সর্বপ্রথম বর্ণবৈষম্যের প্রতিবাদে দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে যেতে রাজি না হয়ে ইংল্যান্ডের জাতীয় দল থেকে বিরতি নেন বাসিল দে’অলিভিয়েরা। এই ঘটনা থেকেই ‘অ্যাপার্টহেইড’ শব্দটি জানতে পারেন সকলে। অ্যাপার্টহেইড বলতে মূলত দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে আসা বর্ণবৈষম্য নীতিকে বোঝানো হয়।

ক্রিকেটের ইতিহাসে এরপরও ঘটেছে এমন আরও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ইতিহাস কলঙ্কিত হয়েছে বারংবার। ক্রিকেটের মাঠে এমনই আরও কিছু জঘন্য ও কুখ্যাত বর্ণবৈষম্যের ঘটনার কথা জেনে নেওয়া যাক…

টনি গ্রেইগ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মে ১৯৭৬

ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের অধিনায়ক টনি গ্রেইগ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে একটি সাক্ষাৎকারে ‘গ্ৰভেল’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, “আপনাদের হয়তো মনে থাকবে যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মানুষেরা যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে তারা মাথা নিচু করে হামাগুড়ি দেয়, তারা পদপিষ্ট হয়। এই কারণেই আমি তাদের এটা অনুভব করিয়েছি যে তারা এমনতর আচরণেরই যোগ্য!” ‘গ্ৰভেল’ কথার শব্দ নিচু বা অবনত হওয়া অথবা পদপিষ্ট হওয়া। মূল কথা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদের পদদলিত করার কথাই জানান টনি গ্রেইগ। কিন্তু যেহেতু ইতিপূর্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘অ্যাপার্টহেইড’ ঘটে গেছে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম হওয়ার কারণে তাঁর উপর বর্ণবৈষম্যের আরোপ আসে। কয়েক শতাব্দীর দাসত্ব সহ্য করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মানুষেরা, ফলত এমন উক্তি তাঁদের ভাবমূর্তিকে আঘাত করে।

ডিন জোন্সের হাসিম আমলাকে ‘টেরোরিস্ট’ বলা, আগস্ট ২০০৬

২০০৬-এর আগস্টে কলম্বোয় দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম শ্রীলঙ্কা টেস্টের চতুর্থ দিনে কুমার সাঙ্গাকারার ক্যাচ ধরেন দক্ষিণ আফ্রিকার হাসিম আমলা। তখনই ধারাভাষ্যকারদের বক্সে থাকা অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ব্যাটসম্যান ডিন জোন্স বলেন, “সন্ত্রাসবাদীটা আবার একটা উইকেট পেল!” হাসিম আমলা একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম, যিনি একজন প্রখ্যাত ব্যাটসম্যান ও টেস্ট/ওয়ানডেতে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ব্যাটিং ওপেন করেন। ডিন জোন্সের এমন কটূক্তিতে ধারাভাষ্যকার তক্ষুনি তাঁর সমালোচনা করেন। এর পূর্বে বর্ণবৈষম্যের নজির ছিলই, তবে এইবারে যোগ হল জাতিবৈষম্যের মত কটু একটি বিষয়। ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে খ্যাত হাসিম আমলার বিশেষত্ব তার লম্বা দাড়ি, এক্ষেত্রে ‘টেরোরিস্ট’ বকে ‘জঙ্গি’ বলার মাধ্যমে নাশকতা বা সন্ত্রাসের সাথে গোটা ইসলামের নাম জড়িয়ে জাতিবৈষম্যের কুখ্যাত নজির গড়েছেন ডিন জোন্স।

মাঙ্কিগেট, জানুয়ারি ২০০৮

আধুনিক ক্রিকেটের আধুনিকতম বৈষম্যের ঘটনা হল ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে ঘটা ‘মাঙ্কিগেট’ ঘটনা। ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়ার সিডনি টেস্টের তৃতীয় দিনে ভারতীয় অফস্পিনার হরভজন সিংয়ের বিরুদ্ধে তাঁকে ‘মাঙ্কি’ ওরফে ‘হনুমান’ নামে ডাকার অভিযোগ আনেন অস্ট্রেলিয়ার অল-রাউন্ডার অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস। ম্যাচ রেফারি মাইক প্রোকটার পরবর্তী তিন টেস্টের জন্য হরভজনের খেলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পরেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আপিলের কারণে হরভজনের শাস্তি ম্যাচ ফি-র ৫০% কেটে নেওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। পরবর্তীকালে ভারতীয় ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকারের আত্মজীবনীতে এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সচিনের বক্তব্য, তিনি হরভজনকে উত্তর-ভারতীয় ভাষায় কিছু একটা বলতে শোনেন যা শুনে তাঁর ‘হনুমান’-ই মনে হয়েছিল!

‘ওসামা’ মঈন, সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে হওয়া অ্যাশেসের উত্তেজনা হার মানাবে যেকোন আন্তর্জাতিক মানের টি-টোয়েন্টিকে। কিন্তু ২০১৮-এ ইংল্যান্ডের অল-রাউন্ডার মঈন আলির আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে ২০১৫-এর অ্যাশেসের কলঙ্কময় মুহূর্ত। মঈনের মতে, অস্ট্রেলিয়ার ওই দলের এক অজানা সদস্য তাঁকে ‘ওসামা মঈন’ নামে ডাকেন। কুখ্যাত জঙ্গি ওসামা-বিন-লাদেনের সঙ্গে চেহারাগত সাদৃশ্য থাকায় এমন কটূক্তির সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। ২০১৫-এর অ্যাশেসে কার্ডিফে প্রথম ম্যাচে নামার পূর্বে এমন উক্তির সম্মুখীন হন মঈন। মঈন আলি তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেন, “এক অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড় আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে, “এটা নাও, ওসামা”। আমি এটা শুনে রীতিমত রেগে যাই। ২২ গজে এর আগে হয়তো এত রাগ কখনও হয়নি।”

সরফরাজ ও ফেহলুকোয়ায়ো, জানুয়ারি ২০১৯

ক্রিকেটের মাঠে সাম্প্রতিককালের কুখ্যাত বৈষম্যের ঘটনার উল্লেখ করতে গেলে পাকিস্তানের সরফরাজ আহমেদের নাম বলতেই হয়। সরফরাজ পাকিস্তানের জাতীয় দলের উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। মহম্মদ হাফিজের পর তাঁকেই একদিবসীয় ম্যাচে অধিনায়কত্ব করতে দেখা যায়। ২০১৯-এর জানুয়ারিতে পাকিস্তান বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার একদিবসীয় ম্যাচে ব্যাট করছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যান্ডিল ফেহলুকোয়ায়ো। উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে ফেহলুকোয়ায়োর উদ্দেশ্যে সরফরাজ বলেন, “আব্বে কালে, তেরি আম্মি আজ কাহা ব্যয়ঠি হ্যায়? ক্যায়া পারওয়াকে আয়ে হ্যায় আজ? (এই যে কালো ছোকরা, তোর মা আজ কোথায় বসে আছে? আজ মাকে কি বুঝিয়ে-পড়িয়ে এনেছিস?)। উইকেটে লাগানো মাইকের মাধ্যমে সরফরাজের এহেন কটূক্তি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে ফেহলুকোয়ায়োর কাছে গিয়ে সরফরাজ ক্ষমা চেয়ে নিলেও সেই ম্যাচকে চিরকালের জন্য কলঙ্কিত করে রাখে এই বর্ণবৈষম্যের ঘটনা।

Related Articles

Back to top button
Close