fbpx
গুরুত্বপূর্ণদেশপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

বালুরঘাট থেকে পার্লামেন্ট: মোদির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বে বাংলার নারীশক্তির প্রত্যয়ী উত্তরণ

শুক্লা সিকদার, দমদম : তিনি ধীর-স্থির, স্বল্পবাক এবং প্রত্যয়ী I তার কথায় কোনও অতিরঞ্জনের বাড়াবাড়ি নেই, তিনি সাবলীল, পরিমিত I ব্যক্তিত্বে তার সম্ভ্রম,  নিষ্ঠা ও কর্মপরায়নতা I তিনি রায়গঞ্জের নির্বাচিত সাংসদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী I  বিজেপি সাংসদ তপন শিকদারের পর  বঙ্গ বিজেপিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের খরা কাটিয়ে বাবুল সুপ্রিয়র সঙ্গে যুগপতভাবে হলেও  তিনিই একমাত্র নারী  যিনি মোদি সরকারের দ্বিতীয় দফায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীপদ আলোকিত করেছেন I

 

রায়গঞ্জ থেকে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তিনি জয়ীর শিরোপা লাভ করেছেন I নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিলেন ২০১৪-র সিপিএম সাংসদ অভিজ্ঞ নেতা মহঃ সেলিম,  কংগ্রেসের  খ্যাতনামা নেত্রী কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন ঘরনী দীপা দাশমুন্সি। ছিলেন রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের কানাইয়ালাল আগরওয়াল। লড়াই কঠিন ছিল, কিন্তু রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে দলের জন্য জয় ছিনিয়ে এনেছেন দেবশ্রী। পেয়েছেন “জায়েন্ট কিলারের”খেতাব I অমিত শাহ-এর দেবশ্রীর সমর্থনে প্রচারে এসে করা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে তিনি পেয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব I আর  প্রথমবার নির্বাচিত সাংসদ হিসেবে শপথ নেওয়ার সময়  বাঙালি হিসেবে  তিনি বেছে নিয়েছেন বাংলা ভাষা I

আরও পড়ুন: দৈনিক সংক্রমণ ৭০ হাজারে নামল, একদিনে করোনা সারিয়েছেন ৮৪ হাজারের বেশি

নরেন্দ্র মোদিজির ও রাজনাথ সিংয়ের উজ্জ্বল  উপস্থিতিতে বাংলা ভাষায় শপথবাক্য পাঠ করে তিনি শুরু করেছেন বাংলার গর্বের আরেক অধ্যায় I কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার রাজ্যের জন্য নারী এবং শিশু বিকাশ মন্ত্রী হিসেবে প্রতিমন্ত্রীত্ব  পেয়েছেন তিনি I নবনির্বাচিত সাংসদ হিসেবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব পাওয়া তার ক্ষেত্রে প্রথম বারেই এসেছে এবং তা এসেছে তাঁর কর্মক্ষমতা এবং সুদীর্ঘ সময়কালীন আপোষহীন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে I নারী ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়ে তিনি মনে করেন যে, নারী দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকলে সমাজে নারীর প্রতি অন্যায় অবিচার অনেকটা কমে যায় I তাই তার এবং নারীদের রাজনৈতিক সংযোগ এবং উত্তরণ নারী শক্তির সার্বিক অবস্থার উন্নতিতে  যে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে তা বলার অপেক্ষা থাকে না I

আরও পড়ুন: বিশ্বজুড়ে হিন্দু সংস্কৃতির উত্থান, লল্ডনে পুরীর আদলে তৈরি হচ্ছে বিশালাকৃতি প্রভু জগন্নাথের মন্দির

১৯৭১ সালের ৩১ জানুয়ারি জন্ম আজকের এই জনপ্রিয় নেত্রীর ।  মা-বাবার চার সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় । তাঁর বাবা দেবীদাস চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত দিনাজপুরের আরএসএস-এর শাখা বিস্তারক এবং ভারতীয় জনতা পার্টির জেলা সভাপতি । দেবশ্রী  চৌধুরীর পড়াশোনা শুরু বালুরঘাট খাদিমপুর হাইস্কুলে।  আর সেখান থেকে তিনি মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর বালুরঘাট জেলা গার্লস হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং বালুরঘাট কলেজে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেন। সেখানে তিনিই প্রথম এবিভিপির ইউনিট খোলেন। ছাত্র নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাও  করেন।

আরও পড়ুন: ‘বিজেপি ক্ষমা চাও’, মমতার পাশে দাঁড়িয়ে অনুপমের মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা অধীরের

পরবর্তীকালে তিনি আরএসএসের মতাদর্শে সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন I রাজ্যে কংগ্রেস ও  বাম শাসনকালের ভিন্ন মতাদর্শিক দেবশ্রী ও তার পরিবারকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েও তীব্র ইচ্ছাশক্তির উপরে ভিত্তি করেই এগোতে হয়েছে I ১৯৯৩ সালে দুই ভাইয়ের সঙ্গে দেবশ্রী চলে আসেন দক্ষিণবঙ্গে I ১৯৯৬ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর সম্পূর্ণ করেন।

তবে রাজনৈতিক মতাদর্শগত প্রতিবন্ধকতাকে বাদ দিয়েও দেবশ্রীকে লড়তে হয়েছে আরেক লড়াই I  সেই লড়াই ছিল চিরাচরিত সেই সামাজিক বেষ্টনী অতিক্রম করার যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ করে দেয় I আর নারী হিসেবে সেই প্রতিবন্ধকতার সীমা তিনি বার বার লঙ্ঘন করেছেন তার হার না মানা লড়াকু মানসিকতার জোরে I উত্তরণ ঘটিয়েছেন বাংলার  নারীশক্তির I যে শক্তি ক্ষমতার আস্ফালনে নয় কর্তব্যের পালনেই বিশ্বাস রাখে I

নারী হিসেবে বাঙালি সমাজের তুলনামূলক উদার পরিমণ্ডলেও দেবশ্রীর যাত্রাপথ যে মসৃণ হয়নি তা তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন I তাই তিনি মনে করেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের সপ্রতিভ উপস্থিতি ও দৃষ্টান্তমূলক প্রতিদানই পারে তাদের   প্রতিবন্ধকতার সীমা লঙ্ঘন করে সকলের চোখে উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত করতে I তাই আজকের নারীদের গতানুগতিক পরিসর ছেড়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রমাণ করার মধ্য দিয়েই আদায় করে নিতে হবে স্বীকৃতি I যা আবার পরোক্ষে মসৃণ করবে ভবিষ্যতে মেয়েদের জয়যাত্রার পথ I

সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় থাকতে গিয়ে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা পছন্দকে অনেক ক্ষেত্রেই দেবশ্রীকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়েছে, তবে তিনি আপস করতে পারেননি বাংলার মিষ্টির প্রতি তার অমোঘ আকর্ষণের সঙ্গে I হ্যাঁ, আর পাঁচটা বাঙালির মতো বাংলার মিষ্টিই তার সবচেয়ে পছন্দের খাবার I সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চেহারায় তার স্পষ্ট বাঙালিয়ানা, শালীনতা তার ভঙ্গিমায়, আর পোশাক হিসেবে তিনি শাড়িতেই স্বাচ্ছন্দ্য I বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হিসেবে তার অসাধারণ জয়যাত্রার জন্য তিনি নিজেকে কৃতিত্ব দেন না বরং কৃতিত্ব দেন তার পারিবারিক রাজনৈতিক মতাদর্শ, বিচারধারা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকে যা তিনি নিজেও বহন করে চলেছেন ছোটবেলা থেকে I

 

তবে ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু দায়িত্বপূর্ণ পদ সামলেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে I ছিলেন বিজেপির যুব মোর্চার  প্রদেশ উপাধ্যক্ষ, তারপরে পালন করেছেন প্রদেশ সচিবের দায়িত্ব I মানুষের দুঃখ দুর্দশাকে অনেক কাছ থেকে  তিনি দেখেছেন I বিজেপি নেতৃত্বের বলিষ্ঠ সংগঠক দিলীপ ঘোষের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজ্য কমিটিতে সাধারণ সম্পাদিকার ভূমিকা পালন তার রাজনৈতিক দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম সংযোজন I কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর রায়গঞ্জের এই সাংসদ ব্যক্ত করেছেন তার নিজের কেন্দ্রের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা I তিনি মনে করেন, উত্তরবঙ্গ তথা রায়গঞ্জের পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি, সেখানকার জনজীবনের উন্নতিতে  অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে এবং সে ব্যাপারে তিনি উদ্যোগীও I এছাড়া ভারতে সার্বিকভাবে নারী ও শিশু বিকাশে তার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও রয়েছে I

 

তিনি দীর্ঘকাল রাজনীতিতে থাকলেও তাঁর পক্ষে জনাদেশ অত সহজে আসেনি I ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনী, কেন্দ্র ছিল বর্ধমান দুর্গাপুর। ২০০৬ সালে বালুরঘাট থেকেও  বিধানসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি I ২০১৬-র ডিসেম্বরে মৌলনা নূর রহমান বরকতির মন্তব্যের জেরে বৈষ্ণবনগরের বিধায়কের সঙ্গে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। রাজ্য সরকারের অন্যায়ের  বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন I তবে কোনও তাৎক্ষণিক অসাফল্য তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি কারণ তাঁর উদ্দেশ্য শুধু নির্বাচিত সাংসদ কিংবা মন্ত্রী হওয়া নয়। তার উদ্দেশ্য সমাজে পরিবর্তন আনা, মানুষের জন্য কাজ করা ও মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা I তার সেই প্রত্যয়ী অঙ্গীকারই দিশা দেখাচ্ছে তার নির্বাচনী কেন্দ্র রায়গঞ্জ, সমগ্র উত্তরবঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের সব প্রান্তিক মানুষদের, সর্বোপরি বাংলার নারীদের I

Related Articles

Back to top button
Close