fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

নারায়াণা কস্তুরি-এক দিব্যজীবন

অরিজিৎ মৈত্র: আকাশবাণীর নামকরণ সংক্রান্ত বিতর্কে একটি ভ্রান্ত তথ্য সব সময়ে মানুষের সামনে প্রকাশ পায়। তিনের দশকের একদম শেষ ভাগে আকাশবাণী কলকাতার জন্য একটি আশীর্বাণী লিখে রবীন্দ্রনাথ পাঠিয়েছিলেন শান্তিনিকেতন থেকে। সেটিকে কবিতা বলাই ভালো। সেখানে এক জায়গায় কবি লিখেছিলেন ‘ধরার আঙিনা হতে উঠিল আকাশবাণী।‘ সেটা কিন্তু প্রকৃত অর্থে কোনও নামকরণ ছিল না।

নারায়াণা কস্তুরি

 

আসল ঘটনা হল নারায়াণা কস্তুরি ‘আকাশবাণী’ নামকরণটি করেছিলেন। তিনি তখন ছিলেন মাইসোর রেডিওর অধিকর্তা। বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষই তাঁর নাম জানেন না এবং এই বিশেষ মানুষটি সম্পর্কে অবহিত নন। দক্ষিণ ভারতীয়, বিদ্বান মানুষটির জন্ম কেরলের উত্তর ট্রাভাঙ্করে। পুরো নাম ‘কস্তুরি রাঙ্গানাথা শর্মা। ২১ বছর বয়সে স্নাতক হন ত্রিভানদ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্ম জীবন শুরু করেন মাইসোরের এক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে। এর কয়েক বছর পরে আইন পড়ার প্রতি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন। ১৯২৮ সালে মাইসোরের ‘মহারাজা কলেজ অব আর্টস’-এ কিছুদিনের জন্যে অধ্যাপনা করেন।

  আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী ও যোগী আদিত্যনাথকে নিয়ে আপত্তিজনক পোস্ট, গ্রেফতার ব্যবসায়ী

অধ্যাপনা এবং আইন পড়ার সময় থেকেই আধ্যাত্মিক জগৎ তাঁকে আকর্ষণ করত। সেই ভালোবাসা এবং আগ্রহই তাঁকে মাইসোরের রামকৃষ্ণ মিশনে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি প্রায় ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে মঠের সম্পাদকের দায়িত্ব সামলান। সেই সময় তাঁর সহকারী হিসেবে কাজ করেন স্বামী রঙ্গনাথানন্দজি, যিনি পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ হন। ওই সময়ই তিনি সিদ্ধারুদ্ধ স্বামী, রমণ মহর্ষি, মেহের বাবা এবং নারায়ণ গারুর মতো মহাপুরুষদের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের প্রত্যক্ষ শিষ্য মহাপুরুষ মহারাজ তাঁকে জপের মাধ্যমে ঈশ্বর সাধনার পথ দেখান।

             আরও পড়ুন: বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, মৃত কমপক্ষে ৯ জন

এরপর ব্যাঙ্গালোরে থাকাকালীন কস্তুরিজি ১৯৪৮ সালে সত্য সাই বাবার সান্নিধ্যে আসেন। সেই সাক্ষাৎ তাঁর বাকি জীবনের ভবিতব্য ঠিক করে দেয়। সত্য সাই বাবা তাঁকে বলেন, তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে অবসর নিয়ে আমার কাছে আসতে পারো। সেই সঙ্গে এও বলেন যে তুমি আমার জীবনী লিখবে। সেই কথায় কস্তুরি বেশ অবাক হযে উত্তরে বলেছিলেন ‘আমি?’…হয়ে সাইবাবা বলেন, আমি তোমাকে এই বিষয় নির্দেশ দেব এবং যোগাযোগ করিয়ে দেব আমার শৈশবের বন্ধু, শিক্ষক এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। এর কিছুদিন পর থেকেই কস্তুরি সেই কাজ শুরু করেন। প্রকাশিত হয় ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ শীর্ষক গ্রন্থের একাধিক খণ্ড। একই সঙ্গে তিনি নিযুক্ত হন সত্য সাই সেবা সংস্থার মাসিক পত্রিকা ‘সনাতন সারথী’-র সম্পাদক হিসেবে। সংস্থা আয়োজিত গ্রীষ্মকালীন শিক্ষা-শিবির পরিচালনাও করেছেন তিনি বেশ কিছু বছর। ১৯৪৯ সালে দেবাংগিরির ইন্টারমিডিয়েট কলেজে তিনি যোগ দেন সেখানকার অধ্যক্ষ হয়ে। পাঁচ বছর কলেজে কাজ করার পর তিনি অবসর নেন।

সত্য সাই বাবা-র সঙ্গে

অবসর নেওয়ার পরে নিজের মা এবং সহধর্মিণীকে নিয়ে কস্তুরি সত্য সাই বাবার সঙ্গে উত্তর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থানে ভ্রমণ করতে চলে যান। দু’বছর পরে কস্তুরির প্রবল আপত্তি থাকা সত্বেও, সাইবাবা তাঁকে একরকম জোর করেই নবগঠিত আকাশবাণী ব্যাঙ্গালোরে যোগ দিতে পাঠান। সম্ভবত সেই সময়ই তিনি ‘আকাশবাণী’ নামকরণটি করেন। কন্নড় সাহিত্যে নারায়াণা কস্তুরির অবদান উল্লেখ করার বিষয়। ওই ভাষায় তিনি প্রায এক হাজারের উপর প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বিখ্যাত মালায়ালাম উপন্যাস ‘চেম্মিন’-এর কনাড়া অনুবাদ করে তিনি পাঠক মহলে সাড়া ফেলে দেন।

কস্তুরি প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা ‘কোরাভানজি’-র যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়। সেই পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা ছিল দু’লক্ষের উপর। নিজের আত্মজীবনী ‘লাভিং গড’ ভীষণ ভাবে জনপ্রিয় হয়। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আয়োজিত তাঁর ভাষণ শ্রোতাদের কাছে এক অন্য মাত্রা বহন করেছে। আজও সেই  বইয়ের চাহিদা এতটুকু কমেনি।

সাতের দশকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ সম্মান প্রদান করে। দেশের শিক্ষাজগৎ এবং সাংস্কৃতিক জগতে তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল দেশের অল্প সংখ্যক কিছু মানুষ ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নারায়াণা কস্তুরির নাম এবং তাঁর পবিত্র এবং দিব্য জীবনের সঙ্গে পরিচিত নন। বলাই বাহুল্য যে তাঁর কর্মময় জীবন ও সাহিত্যের সঙ্গে যাঁরাই পরিচিত হয়েছেন, তাঁদের সামনেই দেশের বিশেষ কয়েকটি রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত উচ্চমানের সাহিত্য ছাড়াও ঈশ্বরের আলোয় আলোকিত দিব্যত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তাঁরা লাভ করেছেন এক অনাবিল আনন্দ। সচেতন হয়েছেন পবিত্র চিন্তা-ভাবনা এবং জীবনবোধের সম্পর্কে।

Related Articles

Back to top button
Close