fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

এই প্রাচীন প্রগৌতিহাসিক রুগ্নপ্রায় মন্দির বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে সরকারের কাছে আবেদন ‘শাসমল পরিবার’-এর

তারক হরি, পশ্চিম মেদিনীপুর: আঠারো শতকের একেবারে গোড়ার দিকে, মহারাজ সুখময় রায়ের অকুন্ঠদানে তখন দুর্গম রাস্তা মোড় নিচ্ছিল উন্নত রাজপথে। যা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ও মহারাজের তত্ত্বাবধানে ১৮১২ সাল থেকে ১৮২৯ সালের মধ্যে। প্রথমে মেদিনীপুর থেকে ওড়িশা, পরে পূর্বদিকে মেদিনীপুর থেকে উলুবেড়িয়া পর্যন্ত বিস্তৃতি হয়। বিগত ২০০ বছর ধরে হাজার হাজার পূণ্যার্থীর জগন্নাথধাম পুরী যাওয়ার একমাত্র পথ যার নাম (ও.টি রোড) বা ওড়িশা ট্রাঙ্ক রোড।

তৎকালীন এই রাস্তার মেরামতির কাজে ঠিকাদারী (কনট্রাক্টর) করে ধনী হয়েছিলেন অধর চন্দ্র শাসমল নামে এক ব্যক্তি। সেই কাজে প্রকৃত অর্থের মালিক হয়ে, তার সুবাদে বড়সড় মাপের এক জমিদারীও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। পরে উনিশ শতকের একদম দোরগোড়ায় ১৯৩০ সালে একটি মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেটি আজ বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের ধামতোড় গ্রামে ” শ্রী শ্রী শ্রীধর জীউ’র মন্দির।  একটি প্রাচীন রাজবর্ষের সালতামামী। ধামতোড় গ্রামের শাসমল পরিবার, তাদের ক্রমশ ধনী হয়ে ওঠা, জমিদারি প্রতিষ্ঠা এবং একটি দেবালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যে জড়িয়ে আছে বাংলার একটি প্রাচীন রাজপথের প্রতিষ্ঠা এবং বিকাশের ইতিহাস!

                       আরও পড়ুন:  পরবর্তী অতিমারীর জন্য তৈরি থাকুন: WHO

ইটের তৈরি পূর্বমুখী মন্দির নির্মিত হয়েছে পঞ্চরত্ন রীতিতে। মন্দিরের সামনের দেওয়ালে একটি উজ্জল লিপি আছে-শ্রী শ্রী শ্রীধর জীউ /শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণ জীউ/শ্রী শ্রী গোপাল জীউ/পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে /এই শিলালিপি /সন ১৩৩৭ সাল ২০ ই ফাল্গুন / সেবাইত শ্রী অধর চন্দ্র শাঁসমল। অর্থাৎ মন্দিরটি ইং ১৯৩০ সালে অধর চন্দ্র শাসমল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শ্রীধর তিনিই মন্দিরের মুখ্য দেবতা। তবে পার্শ্ব দেবতা হিসেবে অধিষ্ঠিত রাধা গোবিন্দ এবং গোপালের বিগ্রহ।

এখানে শ্রীধর পূজীত হোন শলাগ্রাম শিলা বা নারায়ণ শিলায়। ভারতে শলাগ্রাম শিলার আরাধনা অতি প্রাচীন।
মন্দিরটির পাদপীট বেশ উচু, সামনে একটি আয়তকার অলিন্দ, তাতে খিলান রীতির তিনটি দ্বারপথ, গর্ভগৃহের মাথার ছাদ পোড়ানো, মন্দিরের দেওয়ালে ছোট ছোট খোপে মোট ৭৪ টি মূর্তি চারটি সারিতে কার্নিশের নিচে সমান্তরাল ভাবে দুটি সারিতে এবং দুই প্রান্তে, যা কাল ও বিবর্তনে সবগুলিই প্রায় ক্ষয়প্রাপ্ত। রয়েছে গর্ভগৃহের প্রবেশ দেওয়ালে গাড়ো খয়েরি নকশার কাজ। ঘুসুম, চুন আর সুরকির সাথে মিশিয়ে খচিত কিছু নক্সা, যা আজও অক্ষত এবং জ্বলজ্বল করছে। মন্দিরটি দর্শনে তৎকালীন জমিদারী আমলের একটা প্রেক্ষাপটের চিত্র, তা সহজেই অনুমেয় করা যায়।

মন্দির প্রতিষ্ঠাতার শেষ বংশধর শ্রী সুকুমার শাসমল বাবু বলেন-” পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা যায় মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা অধর চন্দ্রের ছিলেন আরেক সহোদর ভাই শ্রীধর চন্দ্র শাসমল। দুই ভাই মিলে মন্দিরটি নির্মাণ করান, পরবর্তীকালে সম্পত্তির নিজাংস্ব বুঝে নিয়ে অধর চন্দ্র শাসমল ধামতোড় থেকে অন্যত্র চলে যান। তখন থেকে জমিদারি নিজাংশ এবং মন্দিরের দেখভাল শ্রীধর নিজের কাঁধে তুলেনেন। পুরুষানুক্রমে শ্রীধরের পুত্র সুরেন্দ্র নাথ, তাঁর পুত্র বিজয় কৃষ্ণ তিনিও তিন পুত্র রেখে প্রয়াত হয়েছেন। আমি এবং আমার দুই ভাই যথা- দিলীপ শাসমল ও অশোক শাসমল। এখন আমরা এই তিন ভাই সেবাইত আছি।’….

বর্তমানে এখন দিনে ও সন্ধ্যায় দুবার নিত্যপূজার রীতি রয়েছে। এছাড়াও সারা বছরে নানান উৎসব আয়োজন করার রীতি প্রচলিত ছিল, তার মধ্যে – অক্ষয় তৃতীয়া, এক দিনের ঝুলন উৎসব, জন্মাষ্টমি, রাধাষ্টমি, রথযাত্রা, মকর সংক্রান্তি ইত্যাদি এর মধ্যে রাস যাত্রা ও দোল উৎসব একসময় মহাসমারহে জাঁকজমক ভাবে পালিত হতো। তা এখন কেবল স্মৃতি মাত্র….! এখন আর সেই সাধ্য নেই। জমিদারি প্রথা চলে যাওয়ার পরও জমিদারী ও দেবোত্তর উভয়ই যথেষ্ঠ সম্পত্তি ছিলো সেকাল তথা সাহাপুর পরগনার বিভিন্ন গ্রাম জুড়ে। গত শতাব্দীর অক্টোবরের শেষ দিকে ভয়ানক গভীর সংকটের আকার ধারণ করতে থাকে, বেলাগাম রাজনৈতিক কার্যকলাপের শিকার হতে হয় আমাদের গোটা পরিবারকে, মন্দিরও সেই আক্রমনের হাত থেকে রেহাই পায়নি, সম্পত্তি বে-দখল হয়ে যাওয়ায়, তার আঘাত এসে লেগেছে সেবাপূজা এবং মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের কাজেও। বর্তমানে আমার দুই ভাই পরিবার নিয়ে কলকাতা ও কলকাতার বাইরে থাকেন।

বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে আমরা একত্রিত হলেও ন্যায়, আচার অনুষ্ঠানের রীতি মেনে মোটামুটি সেবাপূজা চালিয়ে যাচ্ছি। আমার বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বর্তমানে রোগাগ্রস্থ, হার্টের রোগ ও মাসে মাসে ডায়লিসিস করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যায় সাপেক্ষ।
এমতাবস্থায় করুন অনুরোধ জানায় যদি সরকারী ভাবে মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণর দায় ভার নিয়ে সংস্কার করে, বা মন্দিরটি ‘হেরিটেজ’ ঘোষণা করে। কাল বিবর্তনে ক্ষয়িত না হয়ে, যদি কোনো সমাজসেবি সংগঠন এর রুগ্নতা ফিরিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়, তবে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে সাক্ষ্য নিয়ে আরও কয়েক যুগ মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে ‘ঐতিহ্যবাহি এক ইতিহাস”।

Related Articles

Back to top button
Close