fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

শরতের অলঙ্কার কাশফুলের বনে আজ কান্নার রোল

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা / নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।। / এসো গো শারদলক্ষী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে, / এসো নির্মল নীলপথে, / এসো ধৌত শ্যামল আলো ঝলমল বনগিরিপর্বতে / এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেতশতদল শীতল শিশির ঢালা’। এভাবেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শরতের কাশকে সংবর্ধনা জানিয়েছেন। কিন্তু সেই কাশফুল ক্রমশঃ কমছে প্রকৃতি থেকে। আগের চেয়ে অনেক নিষ্প্রভ কাশের অবাধ বিচরণ।

 

আসলে পরিবেশ দূষনের পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ন বৃদ্ধি কাশফুলের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দিচ্ছে। নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের কোনো উঁচু জায়গায় কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই এঁদের বেশি দেখা যায়। কবি টিঙ্কু রঞ্জন মিত্র যথার্থই লিখেছেন, ‘স্রোতস্বিনীর স্রোতের কল্ কল্ শব্দ / ভেসে চলছে বায়ুর আলিঙ্গনে। / দুই তীরে কাশফুলেরা মাথা উঁচিয়ে / হেলে দুলে স্বাগত জানায় / আগমনীর বার্তা’। কিন্তু আদৌ কি আগের মতো কাশফুলের রমরমা লক্ষ্য করা যাচ্ছে? প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশপ্রেমীরা।

আরও পড়ুন: আজ প্রধানমন্ত্রীর ৭০ তম জন্মদিন, সত্তর হাজার গাছ লাগানো থেকে মাস্ক বিতরণ, দেশজুড়ে বিশেষভাবে সেলিব্রেট

কাশ হল শরতের এক অতি জনপ্রিয় ফুল। সংস্কৃতে একে শারদ, সিতপুষ্পক বলে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছে SACCHARUM SPONTANEUM । গ্রামিণী বা ছন গােত্রের এই গাছটির সাথে কাশতলা, কাশমিলি গ্রামনামের অনুসঙ্গ যুক্ত। পােটগল, কাশী, কাশা, কাস, ইক্ষুগন্ধা, দর্ভপত্র, কাণ্ডকাণ্ডক, বায়সেক্ষু, কাকেক্ষু, অমরপুষ্পক, কচ্ছুলকারক, লেখন, কাসক, নাদেয়, ইক্ষ্বারি, কাণ্ডেক্ষু নামেও পরিচিত কাশফুল। একসময় কোলাঘাট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাইয়ের ওপর ব্যাপক পরিমাণে কাশ গাছ জন্মাতে দেখা যেতো। গত কয়েক বছর তা কমেছে ভালো মতোই।

আসল কারণটা কি? বিশিষ্ট প্রকৃতিপ্রেমী শিক্ষক কার্তিক আদক জানান, চারিদিকে পার্থেনিয়াম গাছে ছেয়ে যাচ্ছে। কাশফুল ফোটার যায়গা অপ্রতুল। সরকারি বনসৃজন প্রকল্পের দরুনও কোপ পড়েছে কাশের বনে। অথচ কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘কাশফুল মনে সাদা শিহরণ জাগায়, মন বলে কত সুন্দর প্রকৃতি, স্রষ্টার কি অপার সৃষ্টি।’

কাশফুলের সেই শিহরণ আজ আর রোমাঞ্চকর হচ্ছেনা। কাশের বনে আজ কান্নার রোল যেন! চারিদিকে গজিয়ে উঠছে ঘরবাড়ি। বেঘর হয়ে পড়ছে শরতের পরিচায়ক কাশফুল। তাই হয়তো বহু আগেই কবিগুরু লিখে ফেলেছিলেন ‘শূন্য এখন ফুলের বাগান, / দোয়েল কোকিল গাহে না গান / কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে / যাক অবসাদ বিষাদ কালো, দীপালিকায় জ্বালাও আলো / জ্বালাও আলো, আপন আলো, শুনাও আলোর জয়বাণীরে’

এই গাছটির আদি নিবাস সুদূর রোমানিয়া। সাধারনত উচ্চতায় ৩ মিটার পর্যন্ত হয়। এর চিরল চিরল পাতার দুই পাশ বেশ ধারালো। গবাদি পশুদের খাদ্য। তাছাড়া ভালো জ্বালানি হিসেবে গ্রামবাংলার লোকজন ব্যবহার করে। কাশগাছ কেটে শুকনো করে উনুনের সঙ্গী করা হয়। এছাড়া কাশফুলের আরও অনেক উপকারী গুণ আছে। পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত গাছের মূল খেলে তা দূর হয়। কাশমূল বেটে চন্দনের মতো নিয়মিত গায়ে মাখলে গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়। এছাড়াও শরীরে ব্যাথানাশক ফোঁড়ার চিকিৎসায় কাশের মূল কাজে লাগে।

সুপ্রাচীন গ্রন্থ ‘কুশজাতক’ এর কাহিনি অবলম্বন করে ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন কবিগুরু। রূপক তরফদার লিখেছেন, ‘শরতের মিঠে রোদ আর কাশফুল দেখে করি, / পূজোর আনন্দ খোঁজার বৃথা চেষ্টা, / শিশুমন হয়েছে যুবক, সোশ্যাল মিডিয়ায় গিলেছে সময়, / এখন Like Share মেটায় মনের তেষ্টা’। একদিকে আকাশে সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, আর ঠিক নিচে দুধসাদা কাশের মাথা দুলুনি। এসব দেখেই কবির কল্পনায় শরৎ হয়ে উঠেছে কল্পনার রঙে রঙিন। কবি রিয়াজুল জান্নাত তাই সেই দৃশ্য এঁকেছেন এভাবেই, ‘কাশের বনে লেগেছে দোলা, / শুভ্র মেঘেরা ভাসিয়েছে ভেলা। / শরৎ মেঘের আকাশটা নীল, / কবিতারাও পেয়েছে অন্ত্যমিল। / মন-পবনের নাও ভাসিয়েছি, / স্মৃতির জোয়ারে হয়েছি বানভাসি। / তোর আর আমার, যত মিষ্টি ভুল; / জানুক শুধু, ভুবনডাঙার কাশের ফুল’।

যে করেই হোক, কাশের বন বাঁচাতেই হবে। আসলে উদ্ভিদবিজ্ঞানের এই অতি পরিচিত গাছটি আসলে প্রকৃতির সৌন্দর্যের ‘রূপোর কাঠি সোনার কাঠি’। গ্রামবাংলার খোলতাই রূপ প্রকাশে কাশফুল যেন ‘হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা’! আগমনীর বার্তা বয়ে আনতে কাশের জুড়ি মেলা ভার। কবি চন্দ্রকান্ত দত্তর লেখায় পাই, ‘আগমনীর সুর বেজে উঠেছে, / সাদা কাশফুল উড়ছে আকাশে / মনটা খোঁজে তোমার ছোঁয়া, / এই শরৎ এর আশ্বিন মাসে’। তেমনি ব্রততী ব্যানার্জীর লেখনিতে ফুটে ওঠে, ‘ভোরের আকাশে শুনি আগমনীর গান / কাশ ফুলেরা করছে খেলা, উচ্ছ্বসিত প্রাণ! / শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধে মনটা দুলে ওঠে / মা আসছে হেঁটে হেঁটে মোদের মেঠো মাঠে’।

কিন্তু, কাশফুল নিজেও জানেনা যে তাঁর অস্তিত্ব ক্রমশঃ সঙ্গীন হয়ে আসছে। ফিকে হয়ে আসছে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনপথ। এক শ্রেনীর অবিবেচকদের স্বার্থপর আচরণে আজকের অপু দুর্গার চোখে খোঁজ মেলেনা শ্বেতশুভ্র কাশ। যদিও কবি দীপশিখা লিখেছেন, ‘কাশফুল এর বনে অপু দুর্গার লুকোচুরি, / দুর থেকে ট্রেন দেখার খামখেয়ালী, / ট্রেনে চড়া তাঁর ভাগ্যে জোটেনি, / এরই নাম পথের পাঁচালী’। কিন্তু পরিশেষে বলা যায় পরিনত বয়সেও সেই কাশফুল কারো কারো জীবনে নস্টালজিক দ্যোতনা তৈরি করে কবি অপর্ণার উপলব্ধি অনুযায়ী, ‘দামী জিনিস ছাড়া নাকি কমানো যায়না বয়স / রাস্তার ধারের কাশফুল মনে করিয়ে দেয় / ছেলেবেলাটা এখন necessity / বড় হওয়াটা ছিল choice’।

Related Articles

Back to top button
Close