fbpx
কলকাতাপশ্চিমবঙ্গব্লগহেডলাইন

জাগে তোমার আগমনী…

অরিজিৎ মৈত্র: করোনা, লকডাউন, আনলক-১, ২, ৩-মৃত্যুভয়, বিচ্ছেদ, সব কিছুর মধ্যেই আকাশ, বাতাস আর চারিদিকের পরিবেশ জানান দিচ্ছে এবার তাঁর আসার সময় হয়েছে। তিনি তো আসবেনই কারণ বাপের বাড়ি বলে কথা। অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় কন্যার মোবাইলের স্পিকারে বেজে উঠল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ। কিন্তু সময়টা বড় বেমানান। ভর দুপুর, শরতের রৌদ্র ক্রমে হচ্ছে প্রখর আর ভাদ্রের ঘাম থেকে মুক্তি নেই। মেয়েকে ধমক দিয়ে বললাম এই সময় আবার চণ্ডীপাঠ কেন? ওটা মহালয়ার ভোরের জন্যই তোলা থাক। বরং তার বদলে পুরাতনী বা আগমনী শোনো। যেমন ‘যাও যাও তুমি গিরি আনিতে গৌরী, সোনালী শরৎ এসেছে।’ মতান্তরে এই গানের একটি অংশে রয়েছে, ‘যাও যাও তুমি গিরি, আনিতে গৌরী, উমা আমার দুখে রয়েছে।’

কথার পরিবর্তন হয় হোক, তবু গানটিতে বেশ একটা আগমনী আগমনী ব্যাপার আছে। পিতৃগৃহে আসার জন্য উমা তো কাঁদবেই কারণ হিমের পরশ না থাকলেও এসেছে শরৎ। মর্তে এখন যতই করোনা রোগের প্রকোপ থাকুক না কেন, তবু বৎসরান্তে তো একবারই চারদিন আদর-আপ্যায়ন পাওয়ার সুযোগ হয়। সেই সুযোগ কী কেউ ছাড়ে না ছাড়া উচিৎ? এবারটা না হয় বৈভব বর্জন করে ছোট করেই মাতৃ আরাধনা হোক। আপাতত থিম মহাশয়কে আইসোলেশনে পাঠিয়ে ছোটবেলায় দেখা সাধারণ মণ্ডপ, হলুদ বাল্বের চেন, টিউব লাইট আর ক্যাপের শব্দেই বাঙালি মেতে উঠুক আসন্ন দুর্গাপুজোয়।

মাইকে থিম সং-এর বদলে বাজুক হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, সন্ধ্যা, সতীনাথ, প্রতিমা প্রমুখের গান। অন্যদিকে রং-বেরঙের পুজাবার্ষিকীর সঙ্গে যদি মধ্যবিত্ত পাড়ার একান্নবর্তী, শরিকী বাড়ির দালান থেকে শিউলির গন্ধ পাওয়া যায়, তবে তো কথাই নেই। শরৎ তপনে প্রভাত স্বপনে যখন সবুজ ঘাসের ওপর সাদা শিউলির দল এক অপার্থিব সৌন্দর্য নিয়ে পড়ে থাকে, তখন মন প্রশান্তিতে ভরে যায়। সরকার বাহাদুর পুজোর নির্ঘণ্টের সঙ্গে নিজেদের নির্ঘণ্টে কী নিয়ম জারি করবেন, কে জানে? সেটা নিয়ে একটা আশঙ্কার প্রহর গুনছেন বঙ্গবাসী।

      আরও পড়ুন: মেট্রো চালু হতেই কলকাতার অন্তত ৭০ টি রুটে ফের গড়াল তিনচাকা

গত কয়েক মাসের লকডাউনের ফলে অর্থনৈতিক অবস্থা যতই খারাপ হোক না কেন, সীমা স্বর্গের ইন্দ্রাণীর মত সুগৃহিণীদের আলমারিতে যত্ন করে তুলে রাখা তাঁতের শাড়ি পরে বাড়ির মা-মাসীরা আমন্ত্রণ, অধিবাসের পরে মার কাছে চাইবেন নবমীনিশি পোহালে বিজয়ার সন্ধ্যায় মা যেন করোনা রূপী অসুরকে সঙ্গে নিয়ে কৈলাসে পাড়ি দেন। হিমালয়ান কোয়ারেন্টাইনে মায়ের বাহন লায়নের সামনে দিন পনেরো আটকে থাকলে ব্যাটা করোনা মালুম পাবে কত ধানে কত চাল। মাস্ক আর স্যানিটাইজারের অত্যাচার যে আর সয় না। পোটপাড়ায় আর কুমোরদের ঘরে উঁকি-ঝুঁকি দিলে দেখা যাবে দেবী প্রতিমা নিজের দৈর্ঘ্য কমিয়ে নিয়ে সজ্জিত হচ্ছেন। কারণ পুজোর উদ্যোক্তারা কেউ আর কুলিদের সাহায্যে মাকে মণ্ডপে নিয়ে যেতে রাজি নয়। এমনটাই শোনা গেল।

 আরও পড়ুন:  আজ সংসদে ভারত-চিন সীমান্ত বিরোধ নিয়ে বিবৃতি দেবেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং

বিসর্জনের দিনে মাকে তাঁরাই গঙ্গাবক্ষে বিসর্জন দিতে চান। দৈহিক দূরত্বের জন্যই এমন সব চিন্তা-ভাবনা। বিজ্ঞাপন এবং স্পনসারারদের দরজা বন্ধ। তাদের অনুপ্রেরণায় পুজোর সাজ-সজ্জায় এবার ভাটা পড়তে চলেছে। পুজোর চারদিন শহরের রাজপথের দুপাশে বসে থাকা রোল, ফুচকা, সহ নানান ফার্স্টফুডের বিক্রেতাদের হাল-হাকিকত যে কী হবে, এখনই তা বোঝা যাচ্ছে।

গ্রাম বাংলার সবুজ প্রান্তরের বুকে কাশের ঝালর দোলা শরতের শান্ত আকাশের নীচে ঢাকিরা বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা মাস্ক করতে পারছেন, জানি না। ছকভাঙা পুজোয় এবারে বাদ্যিও সম্ভবত ডিজিটাল সিস্টেমেই বাজবে। কেউ আর এখন বহিরাগতদের জুটিয়ে নিয়ে এসে ভিড় বাড়াতে চাইছেন না। এরপরে আছে অঞ্জলি, সিঁদুরখেলা, প্রণাম আর কোলাকুলির ভবিষ্যৎ জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আরও এক মাসের কিছু বেশি। সেই সব চিরাচরিত প্রথাতেও কি স্যোশাল ডিস্টেনসিং থাবা বসাবে? এত সব ভাবনার পরেও শোনা যাচ্ছে দেবীর আগমন ঘোড়ায়, আবার গমনও নাকি ঘোটকে। শাস্ত্রমতে ফল ‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’। ছত্রভঙ্গ তো হয়েই আছি, নতুন করে আর কতটা খারাপ হবে? ‘গজে চ ফলদা দেবী শষ্যপূর্ণ বসুন্ধরা’। কবে যে আবার মায়ের এমনতর আসা-যাওয়া ঘটবে তা বলতে পারবে একমাত্র ভবিষ্যৎ পঞ্জিকা। যাক, অভাব, অভিযোগ, ঘ্যানঘ্যানানি, প্যানপ্যানানি ছেড়ে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবকে স্বাগত জানানো হোক।

সব কিছুর পরেও আশঙ্কা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। করোনা নামক রোগের দল আবার ভেবে না বসে যে এসেই যখন পড়েছি, তখন পুজোটা দেখেই যাওয়া যাক। অনেকদিন আগে থেকেই এই উৎসবের সুখ্যাতি শোনা আছে। তাই এবার না হয় জনসাধারণের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের সর্বনাশ করতে করতে চক্ষু সার্থক করি। করোনার উদ্দেশ্যে বলি, পুজো দেখতে হয় দেখো, কিন্তু তারপরে আবার দীপাবলি দেখার জন্য বায়না ধরো না যেন। যত দিন যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি তোমার বিদায় নেওয়ার কোনও ইচ্ছাই নেই। ব্যাটা বোধহয় মনে মনে সংকল্প করেছে যে সামনের বছর আবার হবে। আর মাকে আগাম বলে রাখি ‘আজও মরেনি অসুর, মরেনি দানব, ধরনীর বুকে করে তাণ্ডব, সংহার নাহি করি সে অসুরে কেন যাস বিজয়ায়’।

Related Articles

Back to top button
Close