fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

অবলা বসু…স্বামীর পাশে থাকতে ছেড়েছিলেন ডাক্তারি পড়া

বিশেষ প্রতিবেদন: অবলা বসু…নামটা হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। তবে তাঁর নাম হয়তো অবলা হতে পারে, কিন্তু আমরা অবলা নামের যে আক্ষরিক অর্থ জানি তার ঠিক বিপরীত ছিলেন এই মহিলা। তবে তাঁর এক বড় পরিচয় হল তিনি ছিলেন বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর স্ত্রী।অবলার জন্ম ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৮ অগাস্ট । আজকের বাংলাদেশের বরিশালে । তাঁর পৈতৃক পরিবার ছিল মেধা ও মননে অত্যন্ত সমৃদ্ধ । ঢাকার বিক্রম পুরে তেলিরবাগে বাস ছিল তাঁদের দাস পরিবারের । পরে চলে আসেন বরিশালে । সেখান থেকে কলকাতায় ।

অবলার বাবা দুর্গামোহন ছিলেন ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম হোতা এবং সংস্কারক । তাঁর এবং পরিবারের বাকি সদস্যদের সন্তানরা এক এক জন দিকপাল । দুর্গামোহনের ছেলে সতীশরঞ্জন ছিলেন বাংলার অ্যাডভোকেট জেনারেল । এক মেয়ে সরলা ছিলেন শিক্ষাবিদ ও গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা । আমরা সকলেই জানি যে প্রথম বাঙালি মহিলা ডাক্তার ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলি। তবে এই অবলা বসু কাদম্বিনীরও আগে হতে পারতেন বাংলার প্রথম মহিলা ডাক্তার। কিন্তু হতে পারেননি, কারণ মাঝপথে ডাক্তারী পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিয়ে করেছিলেন যাঁকে তিনি জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী। ছিলেন স্বামীর সকল কাজের অনুপ্রেরণাদাত্রী, যোগ্য সহধর্মিনী। স্বামীর কর্মযজ্ঞের মাঝে নিজেকে আড়াল করে রাখলেও কখনোই ঘরের চার দেয়ালে বিলীন হয়ে যাননি। সমাজের নানা গঠনমূলক কাজে নিজেকে সর্বদা ব্যস্ত রেখেছিলেন। বাংলায় নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অগ্রগণ্য ভূমিকা আজও চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

 আরও পড়ুন: অবশেষে বিপদ কাটল… রিপোর্ট নেগেটিভ, করোনামুক্ত হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ

রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আদর্শে উদ্বুদ্ধ অবলার বাল্যকাল থেকেই ডাক্তারি পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সে সময়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজে মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার কোনোরকম সুযোগ ছিল না। তবে প্রায় পাঁচ বছর পরে কাদম্বিনী এই অচলায়তন ভেঙেছিলেন। তবে সেই সময়ে একমাত্র মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজেই মেয়েদের ডাক্তারী পড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু এত দূরে মেয়েকে ডাক্তারি পড়ানোর ব্যাপারে খুব একটা রাজি ছিলেন না দুর্গামোহন। কিন্তু মেয়ের আগ্রহ আর পিতৃবন্ধু ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের সনির্বন্ধ অনুরোধের কাছে বাবা দুর্গামোহন হার মানলেন। তিনি মেয়েকে মাদ্রাজে পাঠাতে সম্মত হলেন।

বেঙ্গল গভর্নমেন্টের সাম্মানিক বৃত্তি নিয়ে ১৮৮২ সালে অবলা পাড়ি দিলেন মাদ্রাজে। বস্তুতঃ অবলাই হলেন বাঙালি মেয়েদের মধ্যে প্রথম মেডিকেল শিক্ষার্থী। কিন্তু মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে সে সময় মেয়েদের পড়াশোনার  জন্য কোনো হস্টেল ছিল না। ফলত, মি. জেনসেন নামক এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে তিনি থাকতে শুরু করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে স্বপ্নের জন্য এতটা পথ পাড়ি দিলেন, সে পূরণ হলো না। দুই বছর পড়াশোনা করার পর শারীরিক অসুস্থতার জন্য ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ না করেই অবলা কলকাতায় ফিরতে বাধ্য হন।

এসবের মাঝেই ১৮৮৭ সালে অবলার বিয়ে হয়ে যায় জগদীশ চন্দ্র বসুর সঙ্গে। অবলা দাস হলে গেলেন অবলা বসু। বিয়ের পর সংসারধর্ম পালনের পক্ষে অবিচল অবলা ছেড়ে দিলেন পড়াশোনা। সারা জীবন জগদীশচন্দ্রের পাশে ছায়ার মতো থেকে স্বামীর যোগ্য সহধর্মিনী হিসেবে তাঁর সব ধরনের কর্মকান্ডে সহযোগিতা ও সমর্থন করে গেছেন। তিনি ছিলেন স্বামী অন্তপ্রাণ। স্বামীর বিজ্ঞান সাধানায় যাতে কোনোরকম ব্যঘাত না ঘটে সেদিকে ছিল তাঁর সদাসতর্ক দৃষ্টি। প্রথম জীবনে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল জগদীশচন্দ্রের সংসারের হাল শক্ত হাতে ধরেছিলেন অবলা।

সস্ত্রীক জগদীশ চন্দ্র বসু

যদিও নিজে বিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ায় জগদীশের অনেক ধরনের গবেষণার কাজেই অবলা সহযোগিতা করতেন। বিজ্ঞান সাধানার জন্য জগদীশ চন্দ্র বসুর বসু মন্দির প্রতিষ্ঠায় অবলা বসুরও অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে। প্রখ্যাত স্বামীর সাথে একাধিকবার বিদেশ সফর করলেও খুবই সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। নিজেদের একমাত্র সন্তান অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় স্বামীর ছাত্রদের অপত্য স্নেহে ভরিয়ে রেখেছিলেন। ১৯১৬ সালে নাইট উপাধি লাভ করলেন জগদীশচন্দ্র। অবলা বসু-এর নতুন পরিচয় হল লেডি অবলা বসু।

জীবনভর অবলা কাজ করে গেছেন স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের জন্য। মেয়েদের জন্য শিক্ষার দ্বার খুলে দেওয়া এবং বাল্যবিবাহ রোধ করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল ব্রত। ১৯১০ সালে অবলা ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের সম্পাদিকা নিযুক্ত হন। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত এই পদে থেকে তিনি যোগ্যতার সাথে স্কুলটি পরিচালনা করেছিলেন। সমগ্র বিদ্যালয়টিই নতুন করে গড়ে তোলেন তিনি। এছাড়াও বাংলার মেয়েদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নারী শিক্ষা সমিতি’ নামক একটি অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থার মাধ্যমে গ্রাম-বাংলায় ৮৮টি প্রাথমিক ও ১৪টি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন অবলা বসু। এইসব স্কুলে শিক্ষয়িত্রীর অভাব পূরণের জন্য ১৯২৫ সালে গড়ে তুললেন ‘বাণীভবন ট্রেনিং স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকেই নারীদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে নিয়োগ করা হত।

গোখেল মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠার পশ্চাতেও দিদি সরলা রায়ের দিকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছিলেন অবলা। এছাড়া আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর মৃত্যুর পর তাঁর সঞ্চিত এক লক্ষ টাকা দিয়ে তিনি ‘সিস্টার নিবেদিতা উইমেন্স এডুকেশন ফান্ড’ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯৫১-র ২৬ অগাস্ট প্রয়াত হন ৮৭ বছর বয়সে । গলাবন্ধ ফুলহাতা জামার সঙ্গে আটপৌরে শাড়ি পরা, ঘোমটা দেওয়া এই বঙ্গনারীকে আজও বলা হয় উনিশ শতকের ফেমিনিস্ট

 

 

Related Articles

Back to top button
Close