fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

প্রতিবাদের অক্ষরমালায় পরিযায়ীদের আর্তনাদ

শান্তনু অধিকারী, সবং : জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আজ ঘরে ফিরতে মরিয়া পরিযায়ীরা। তাঁদের ফেরানোর জন্য সরকারি ঘোষণার অভাব নেই। কিন্তু ক্রমশই প্রকট হয়েছে সদিচ্ছার অভাব। রাষ্ট্রীয় হাজারো ছলচাতুরির মায়জাল ছিন্ন করে তাই লক্ষ লক্ষ পরিযায়ীরা নামছেন পথে। প্রখর দহনতাপে দগ্ধ হতে হতে কেউ সপরিবারে হাঁটছেন। নিরূপায় কেউ চড়ে বসছেন পন্যবাহী গাড়িতে। এরই মধ্যে ঘটে চলছে একের পর এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। ঘটনার মর্মান্তিকতায় কেঁপে উঠেছে সারা দেশ। মৃত্যুর কবলে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত শ্রমসম্পদ। তবু লকডাউনের দেশে আজও তাঁরা ব্রাত্য, অবাঞ্ছিত। তাঁদের মৃত্যুমিছিলেও মন গলে না বেআব্রু রাষ্ট্রের। ফোস্কা পড়েছে। রক্ত ঝরছে পায়ে, শরীরে, হৃদয়ে। তাও হেঁটেই চলেছেন পরিযায়ীরা।

 

রোজই দুটো চারটা মৃত্যু উপহার দিতে দিতেই তাঁদের অকুতোভয় এগিয়ে চলা। আত্মবলিদানে এমন সোৎসাহ দৃপ্ততা কতকাল ইতিহাস পরখ করেনি! আজ সে সুযোগ এনে দিয়েছেন পরিযায়ীরা। সুযোগ পেয়েছেন বর্তমানের কবি-শিল্পীরাও। শানিত করছেন তাঁদের প্রতিবাদী অক্ষরমালা। ঠিক যেভাবে ৪৩’এর মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে গর্জে উঠেছিলেন নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য। হাজার হাজার বুভুক্ষু মানুষের আর্তনাদ-চষা জমিতে তিনি ফলিয়েছিলেন এক কালোত্তীর্ণ আগুন-ফসল, যার নাম ‘নবান্ন’। এর আগে লেখা তাঁর ‘আগুন’ নাটকেও ছিল মন্বন্তরে জীবনব্যাপী মানুষের হাহাকার। এক সাক্ষাৎকারে বিজনবাবু বলেছিলেন― সাধারণ মানুষের জানের লড়াই-এর সঙ্গে প্রাণের লড়াইটাও চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায় একজন শিল্পীর। হাজার হাজার মানুষের ক্ষুধার চিৎকারে অস্থির, মর্মাহত হয়ে বিজন ভট্টাচার্য সেই ‘দায়’ মিটিয়েছিলেন তাঁর ‘নবান্ন’-এ, ‘আগুন’-এ।

 

এই দেশের নাগরিক হয়েও ঘরে ফিরতে চাওয়া― পরিযায়ীদের কাছে এক প্রাণান্তকর লড়াই। মানুষের প্রতি শিল্পের দায় মেটাতে সেই লড়াইয়ে শরিক হয়েছেন বর্তমান সময়ের কবি শিল্পীরা। কেউ ফুঁসছেন ক্রোধে। কারও অক্ষরমালায় কেবলই সহানুভূতির আর্তনাদ। কেউ আবার অশ্রুসজল হয়েও আগুন ধরিয়েছেন পংক্তিতে। কবি কেশব মেট্যা সদ্যই লিখেছেন ‘হাঁটার হিসেব কবে’। তিনিও ছত্রে ছত্রে পা ফেলেছেন পরিযায়ীদের দুঃসহ পরিক্রমায়― “আজকে হাঁটছি কালকে হাঁটছি পরশু তবে কী?/খিদের জ্বালায় করোনাকালে হাঁটতে নেমেছি।/কেউবা শ্রমিক কেউবা মজুর ভোটের উন্নয়ন/বন্ধ পথেই পথ ভেঙে হাঁটে আমাদের পরিজন!/হাঁটতে হাঁটতে পথের মাঝেই প্রসব করে মা/আজন্মকাল নিঙড়ে নিলি খেতেও দিলি না/তপ্ত পিচে রক্ত ঝরে ফোস্কায় জ্বলে পা/ শ্রমিকরক্তে কলঙ্কিত মানচিত্রের গা। এই কবিতার মাঝেই কবির আক্ষেপ― “দেশ মানে তাই দীর্ঘ হাঁটা, দেশ মানে বুকে ভয়/দেশ মানে নয় স্বপ্নে দেখা নিশ্চিত আশ্রয়।” মানবতার অবমাননা যেখানে সেখানেই সোচ্চার হন প্রকৃত মানুষ। কখনও কণ্ঠ, কখনও কলম হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। মানবতার অবক্ষয়ে সঞ্চারিত বেদনা থেকেই বেরিয়ে আসে প্রতিবাদী সৃষ্টি। ইতিহাস তার সাক্ষী।

 

বর্তমানের সংকটে সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি আরও একবার কবি অলক জানা’র ‘পরিযায়ীর ইস্তাহার’ কবিতায়― “গনগনে দুপুরের ভেতর/কারা যেন কিছু ছায়া চেয়ে/মেখে নেয় পথের ধুলো,/না ফেরা ঘরদুয়ার পড়েই থাকে !/সভ্যতার সৌখিন পিচে গলতে থাকে/আপাদমস্তক, পোড়া স্তন মুখে/শিশুটিও চিরতরে এই প্রথম শান্ত সুবোধ।/পথে পড়ে থাকে শতেক মৃত ভাস্কর্য/এ শতক জানিয়ে যায়―/শ্মশান নামে কোন আলাদা ভূমি/পৃথিবীতে আর হয় না।” “আকণ্ঠ আমাজন দহন নিয়ে/যে শ্রমিক-সভ্যতা পথ ভেঙে আসে”― তাঁদের জন্য ‘মেধার সমূহ ফুল’ উৎসর্গ করতে চেয়েছেন অলক তাঁর ‘আগুনের জ্বর’ কবিতায়।

কবি মানস মাইতিও যেন গর্জে উঠেছেন দারুণ রোষে। পরিযায়ীদের মর্মান্তিক যন্ত্রণায় তিনিও অস্থির, মর্মাহত। ‘মাইলস্টোন ও সহজঘর’ কবিতায় যেন ভেঙে গেছে তাঁর সংযমের বাঁধ― “…ওরা মাইলস্টোনে রক্ত লাগিয়ে/ছুঁয়ে ফেলেছে মানচিত্র/পাললিক আকুলতায় দহন-দাগ/উদ্বাস্তু ডানাকাটা পাখি/টেনে হিঁচড়ে উগরে দিচ্ছে পাকস্থলী…” কবি গৌতম মণ্ডলও উগরে দিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ ― “একটা ভারত ফোস্কা পায়ে/ হাঁটতে থাকে পথ/একটা ভারত ঘণ্টা বাজায়/ছোটায় বিজয় রথ।” ‘বাঁচতে চাইছে ভারত’ কবিতায় তিনি আরও লিখেছেন “হাঁটতে হাঁটতে জীবন ফুরায়/ফুরায় না তো পথ/ক্ষুধার রুটির চাঁদের আলোয়/বাঁচতে চাইছে ভারত।”

সৃষ্টির ঐতিহ্য মেনেই পরিযায়ীদেরই পরিজন বানিয়েছেন লেখক-শিল্পী-কবিরা। তাঁদের শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্তকেই করেছেন অন্তরের প্রণোদনা। মরতে মরতেও পরিযায়ীদের পথ হাঁটা আজও ফুরোয়নি। তাই ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙেছে কবি শংকর দত্তেরও।

 

 

ভেঙেছে কলমের আগল তাঁর সদ্য লেখা ‘এটাই আমার দেশ’ কবিতায়, “আটকে গেছি হাঁটতে গিয়ে পা চলে না আর/বিস্কুট-জল-শুকনো রুটি দেবেই কে বারবার!” কিংবা “আমরা খাঁটি মিস্ত্রি লেবার, পাখির মতোই ছুটি/গুজরাট টু গোয়ালিয়র, সবখানেতেই জুটি।” কিন্তু জোটেনি রাষ্ট্রের আনুকূল্য। তাই তো সতেরো দিনের শিশুকে কোলে নিয়ে কোনও এক ‘মাদার ইন্ডিয়া’ পাঁচশো কিলোমিটার পথ হাঁটতে নেমে পড়েন রাস্তায়। সন্তানকে জড়িয়ে আবার চলতে শুরু করেন সদ্য জন্ম দেওয়া জননী। অসুস্থ সন্তানের কাছে ফেরার অনুমতি মেলে না কোনও এক অসহায় বাবার। এমন কতশত নজির প্রত্যক্ষ করছে এই দেশ।

 

লেখক-কবি দেবাশিস দণ্ডের সদ্য লেখা অনুগল্পেও তারই রেশ। গভীর অনুভবের ‘২৫’ গল্পে পঁচিশ বছরের দাম্পত্যের কনট্রাস্টে বসিয়েছেন এক পরিযায়ী দম্পতির পঁচিশদিন ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতাকে। তিনি লিখেছেন, “মাত্র পঁচিশ দিন। হ্যাঁ, মাত্র পঁচিশ দিন ধরে হাঁটতে থাকা দম্পতি জানেন বছরের চেয়ে দিন কত বড় হয়।”

শুধু জানে না রাষ্ট্র। দেখেও না দেখে নীরব এ দেশের সংবিধানের তল্পিবাহকেরা। প্রতিবাদে সরব হয়েছে তাই সুরের দেশও। বিপুল চক্রবর্তীর কথায় ‘একটি আশ্চর্য পথচলার গল্প’ গেয়েছেন তাপস মৌলিক― “আমরা দু’জনে দুটি সাইকেলে/চলা শুরু করি একটি বিকেলে/মুম্বাই থেকে আঁকাবাঁকা পথে চলেছি মোজিলপুর/মোজিলপুর তো বাংলার গ্রাম/অনেকদূর সে তবু চললাম/কেন না সেখানে ঘরের মানুষ/আমার ও বন্ধুর।/আজকে সকলে সেঁধিয়েছে ঘরে/গ্রাম থেকে যারা এসে কাজ করে/দিল না শহর তাদের সেখানে থাকার একটু ঠাঁই/ওদিকে ঘরে অভাবী স্বজন/নেই সরকারি কোনও আয়োজন/কঠিন এ পথ জেনেও আমরা বেরিয়ে পড়েছি তাই।” সেই ‘বেরিয়ে পড়া’র পরিণতি কী দাঁড়ায়― লকডাউন পরবর্তী অধ্যায়ে প্রায় রোজই দেখছে দেশ। যাঁদের রক্তে ঘামে দেশের এগিয়ে চলা, ঘোরতর অন্যায় আজ তাঁদেরই বেঁচে থাকার আর্তি।

 

 

‘নবান্ন’ নাটকের সাফল্য বিষয়ে বিজন ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘যে মানুষেরা রাস্তায় দুর্ভিক্ষের মড়া দেখে মুখ ফিরিয়ে গেছে, ‘নবান্ন’ নাটক দেখিয়ে সেই মানুষদের চোখে আমরা জল ঝরাতে পেরেছি– এটা ছিল আমাদের কৃতিত্ব।’ পরিযায়ীদের আর্তনাদমাখা অক্ষরমালায় উদাসীন প্রশাসনের চোখে জল ঝরিয়ে হালের কবি-শিল্পীরা সেই ‘কৃতিত্ব’-এর শরিক হতে পারেন কিনা, এখন সেটাই দেখার!

Related Articles

Back to top button
Close