fbpx
অন্যান্যবিনোদনহেডলাইন

তরঙ্গ কথা….

পর্ব-৫

মনীষা ভট্টাচার্য: ‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট, রক্তজমাট শিকলপূজার পাষাণবেদী’-সারগামটা ভালো করে লক্ষ করো, পা ধা সা সা সা সা, সারে সানি সা গা গা গা গা, পাপা রেগা পা পা রেগা পা পা পা পা। আরেকটু প্রাণ দাও। ভালো হবে। রেওয়াজটা ঠিক মতো না করলে….।

রেডিওতে গান শুনে শুনে গুন গুন করাটা আমার স্বভাব। ঠাকুমা তাই দেখে আমার জন্য মাকে বলে এক গানের টিচার  জোগার করেছেন। তিনি আসেন নিয়মিত। কিন্তু আমার গান শেখা হয়না। তবু…। নজরুলের গান কবিতায় কেমন একটা জেগে ওঠার ডাক রয়েছে। ঠাকুমার কাছে শুনেছি এই নজরুল নাকি বেতারে এক সময় গান শেখাতেন। সংগীত পরিচালকের ভূমিকাতেও চাকরি করেছেন বেশ কিছুদিন। বেতারের অনেকেই সেইসব স্মৃতিকথা বলেছেন নানা জায়গায়। আজ সেই সব কথা দিয়ে সুরে সুরে নজরুল।

সালতামামীর হিসেবে নজরুল বেতারের সঙ্গে তাঁর গাটছড়া বেঁধেছিলেন ১৯২৮-২৯ সালে। ১৯২৮ সালে তিনি বেতারে একটি গান গেয়েছিলেন। পরের বছর স্বকণ্ঠে ছিল আবৃত্তি। ইতিমধ্যে নজরুলের ‘ধুমকেতু’, ‘লাঙ্গল’ প্রভৃতি বই প্রকাশিত হয়েছে। এই সময় কলকাতা বেতার এবং গ্রামাফোন কোম্পানি এইচ এমভি-র সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। আস্তে আস্তে মঞ্চে এবং চলচ্চিত্রেও তিনি কাজ করতে শুরু করলেন। চুক্তিবদ্ধ হয়ে বেতারের সঙ্গে কাজ শুরুর আগে থেকেই তাঁর গান রেডিওতে শোনা গেছে। কখনও তিনি গেয়েছেন, কখনও আবার উমাপদ ভট্টাচার্য, ইন্দুবালা দেবী, আঙুরবালা দেবী এঁদের কণ্ঠে শোনা গেছে তাঁর গান। তখনও এই গান আলাদা করে নজরুলগীতি রূপে স্থান পায়নি,  বাংলা আধুনিক গান হিসাবেই সম্প্রচারিত হতো। তবে রেডিওতে অন্যান্য গানের মতোই তাঁর গানও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

১৯৩২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে পজকুমার মল্লিক কৃত নজরুল রচিত একটি গানের স্বরলিপি ছাপা হয়েছে। গানটি ছিল ‘দোলে নিতি নবরূপের ঢেউ’। ধীরে ধীরে অল ইন্ডিয়া রেডিওর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক নিবিড় হতে থাকে। বেতারনাটকের জন্য তখন তিনি গান লিখছেন। ১৯৩২ সালে মন্মথ রায়ের ‘মহুয়া’, ১৯৩৬ সালের জগৎ ঘটকের ‘জীবনস্রোত’, ‘মীরা উৎসব’ ইত্যাদি নাটকে নজরুলের গান ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্যে পাওয়া যাচ্ছে ১৯৩০ সালে ৫ অগাস্ট  কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মরণে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল উপস্থিত ছিলেন। ১৯৩৭ সালে শরৎচন্দ্রের জন্মদিনে ‘শরৎ শর্বরী’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র। শোনা যায়, এই  অনুষ্ঠানে নজরুল একটি কবিতা পাঠ করেন।

এরপরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে বিদ্রোহীকবি বেতারের স্থায়ী কর্মী হন। ওই সালে যে ‘দেবস্তুতি’ গীতিনাট্য সম্প্রচারিত হয়, তার গীতিকার এবং পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং কবি। সংগীত পরিচালক ছিলেন নিতাই ঘটক। ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলা হয়েছিল, হিন্দুর মহাদেবী আদ্যাশক্তির বিভিন্ন কালে বিভিন্ন রূপের যে মহনীয় বিকাশ-সেই শ্রীশ্রীমহাকালীর প্রকটকালের ভাব সংগীত এই ‘দেবস্তুতি’। গানগুলি গেয়েছিলেন ‘বাসন্তী বিদ্যাবীথি’ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। ভাষ্যপাঠে ছিলেন স্বয়ং  নজরুল। সেই সময় অনুষ্ঠানটি এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে সেটি পুনরায় প্রচারিত  করা হয়।

বেতারের বিভিন্ন স্মৃতিকথায় পাওয়া যাচ্ছে স্থায়ীপদে বেতারকেন্দ্রে যোগ দেওয়ার পর কাজী নজরুল নিজে অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে শুরু করেন। বিশেষভাবে স্মরণীয় রাগসংগীত বিষয়ে তাঁর পরিচালিত হারমণি অনুষ্ঠানটি। নলিনীকান্ত সরকারের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় ‘নবরাগমালিকা’ নামক একটি অনুষ্ঠান যেখানে ‘নির্ঝরিণী’, ‘মীনা্রী’, ‘সন্ধ্যামালতী’, ‘বনকুন্তলা’, ‘দোলনচাঁপা’ প্রভৃতি রাগগুলি নজরুল তৈরি করেছিলেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র লিখছেন, গানের সুরে তিনি ডুবে যেতেন সব সময়ে। দুপুর একটা থেকে শুরু করে রাত্রি আটটা পর্যন্ত অক্লান্তভাবে সংগীত শিক্ষাদান করছেন কয়েকজন গায়ক-গায়িকাকে নিয়ে। বিন্দুমাত্র বিরক্তি নেই। অবসাদ নেই। একটা চাদর পাতা তক্তপোষের ওপর বসে অবিরত পান খেতে খেতে গান শেখাতেন তিনি।

অন্যদিকে ব্রহ্মমোহন ঠাকুরের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় দুটি চিঠি। যেখান থেকে বোঝা যায় যে বেতার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নজরুলের প্রোগ্রামভিত্তিক চুক্তি ছিল, বেতনভিত্তিক চাকরি তিনি করতেন না। এই কলকাতা বেতারেই তাঁর সংগীতের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। অপ্রচলিত বহু সংখ্যক রাগকে যেমন বাংলা গানের কাব্যিক মাধুর্যে ভরিয়ে তুলেছিলেন, তেমনই ১৮টি রাগ সৃষ্টি  করে বাংলাগানের পরিধি বিস্তার করেছেন। বাংলায় ‘লক্ষণগীত’, তাঁর অন্যতম সংযোজন যা বেতারেই সম্প্রচারিত হয়েছিল। আমরা জানি, জীবনের শেষ ৩৬ বছর নজরুল বাক্যহারা হয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই বেতারকেন্দ্রেই তাঁর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ছোটদের আসর অনুষ্ঠানে কবির কিছু বলার কথা ছিল। কিন্তু সেদিন বহু চেষ্টা করেও তিনি একটি স্বরও বের করতে পারেন নি। এরপর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তাঁর কলম থেকেও কোনও সৃষ্টি  হয়নি, মুখ থেকেও কোনও শব্দ উচ্চারিত হয়নি। কাউকে চিনতে পর্যন্ত পারেননি আর। শুধু কেউ যদি তাঁর সামনে তাঁর গান গাইতেন, তাহলে তাঁর মুখে একটু খুশির হাসি দেখা যেত।

কেন তাঁর মতো এমন এক শিল্পীর এই নির্মম পরিণতি তা হয়তো আমরা কেউই জানি না। তবু তিনি মানেই আহ্বান, তিনি মানেই আগুন। বিষের বাঁশিতে তিনিই পারেন সুর লাগাতে। কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচনও তিনিই দেখাতে পারেন। ‘আমি’-র অহংকারে তিনিই বলতে পারেন, ‘…মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর। বল বীর, আমি চির উন্নত মম শির’।

কৃতজ্ঞতা : কলকাতা বেতার

চলবে…

Related Articles

Back to top button
Close