fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পাগল অটোচালকের চোখে সাহেবী দাদাগিরির স্বপ্ন

ভাস্করব্রত পতি, চুঁচুড়া : তিনি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন বোনেন। স্বপ্ন দেখান। সমাজের পিছিয়ে পড়া সেইসব মানুষের জন্য তিনি যেন ‘মসীহা’। ঈশ্বরের দূত। তিনি পার্থ দত্ত। একজন প্রতিবন্ধী এবং ছাপোষা সংসারের দাঁড়টানা নৌকার মাঝি। টলমল সেই নৌকায় বসে স্বপ্নে আঁকেন সকলকে প্রেরণা দেওয়ার ঈপ্সা এবং এবং কল্পনার বাস্তব রূপায়নের গভীর কামনা বাসনা।

 

পার্থবাবু পেশায় একজন সামান্য অটোচালক। কিন্তু বাজারচলতি অন্যান্য অটোচালকদের চেয়ে একটু আলাদা ঘরানার মানুষ। নিত্য অভাব। সাধ্য কম। কিন্তু সাধ অনেক। হুগলির সাহাগঞ্জের এহেন মানুষটি এই লক ডাউনের অন্তহীন দুর্বিষহ জীবন উপেক্ষা করেও লক্ষ্যতে অবিচল রয়েছেন। অতি সাধারণ অথচ অসাধারণ মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংকল্পবদ্ধ তিনি। থ্যালাসেমিয়া রোগী, গরিবগুর্বো কৃতি ছাত্র ছাত্রী, প্রতিবন্ধী, অনাথ শিশুদের জন্য তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেকে। চুঁচুড়া থেকে ত্রিবেণী পর্যন্ত তাঁর অটো চলে। এখন ব্যবসায় মন্দা। দিনের পর দিন বেআইনি অটো, টোটোর রমরমা। রাস্তায় গাড়ির ভিড়। আগের মতো উপার্জন হয়না। সর্বত্র একটা প্রতিযোগিতা। সামান্য একজন অটোচালকের আয় দিনে ৫০০ টাকা। তাও এই ক’মাসে একেবারেই তলানিতে। ড্রাইভার রেখেছেন। নিজে পারেননা। সরকারি নিয়মে একদিন ছাড়া অটো চালানোর সুযোগ রয়েছে।

আমরা অটোচালক মানেই বুঝি কুচুটে, ঝগড়ুটে এবং অর্থখোর একজন লোক। পার্থ দত্ত যেন ‘আকাশের চাঁদ’! তাঁর পকেট ‘গড়ের মাঠ’। পরিস্থিতিতে শিকার হয়ে তাঁর এখন ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’ অবস্থা। কিন্তু মনটা আকাশের মতো দিগন্ত বিস্তৃত। প্রসারিত। তাই নিজের হাতে সংবর্ধনা দিতে ভোলেননা সেইসব মানুষের কীর্তিকলাপকে, যাঁরা সমাজের আড়ালে মেঘনাদের মতো থেকে সমাজের সেবা করছেন। লড়াই করছেন। পাশে থাকেন তাঁদের, যাঁরা নাকি সভ্য সমাজের চোখে অছ্যুত।

 

নিজে পড়েছেন মাত্র ১১ ক্লাস পর্যন্ত। তাঁর কাছে শিক্ষাই আসল। তাই সব কিছু সামলেও নিজের মেয়েকে বি এড পড়াচ্ছেন। এর সাথে প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ করে বাড়ির অন্নপূর্ণা পূজায় তিনদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন গুণিজন সংবর্দ্ধনা। এই কীর্তি জেনে স্বয়ং সৌরভ গাঙ্গুলি তাঁকে ‘দাদাগিরি’তে আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন। এখন তিনিই বিভিন্ন প্রতিভাকে নিয়ে যান বিভিন্ন রিয়েলিটি শোয়ের মঞ্চে।

 

আজ যেসব ‘হিরো’রা ঘুরে বেড়াচ্ছেন হতাশার তিমিরে, তাঁদের প্রেরণাদাতা হয়ে পার্থ দত্ত যেন জীবন্ত ‘কাগজের নৌকা’। সেই নৌকায় জীবনের স্বাদ চোঁয়ানো ভালোবাসা মেলে। সেই নৌকার মাঝি পাগল হয়েও সামাজিক ঝড়ঝঞ্ঝা অনায়াসে কাটানোর দক্ষতায় ভরপুর। দুর্দমনীয় গতিতে এগিয়ে চলার ক্ষমতা রাখেন। প্রায় ষাট ছুঁই ছুঁই এই অপাপবিদ্ধ মানুষটি যখন ‘দাদাগিরি’র মঞ্চে গিয়ে দাদার পিঠ চাবড়ানি পান, তখন কিন্তু তিনি লুকিয়ে রাখেননি নিজের স্বপ্নটাকে। লজ্জাকে। বাইরের লোক তো বটেই, বাড়ির লোকজনও তাঁকে ‘পাগল’ বলতে কুন্ঠিত নয়। কেন তিনি ‘ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানো’ স্বভাব পুষে রাখবেন? এ প্রশ্ন সকলের।

 

চোখের মনিতে প্রতিবন্ধকতা। অথচ সেই চোখে সকলের পরিচিত ‘সাহেব’ আজ ‘পাগল’ তকমা নিয়ে অন্নপূর্ণার আরাধনা করেন। তাঁর কাছে দেবসেবা মুখ্য নয়। জনসেবার মাধ্যমেই দেবতার দর্শন মেলে। গঠন করেছেন ‘মা অন্নপূর্ণা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’। অটো চালিয়ে প্রতিদিন ২৫ টাকা জমিয়ে জমিয়ে জনসেবায় খরচ করেন তিনি। সংসারের জোয়াল কিভাবে চলবে, তার কোনো হুঁস নেই। নেই এক কপর্দক অর্থও। তিনি এখন চান একটু সহায়তা। একটু সাহায্য। তাঁর স্বপ্নটাকে মেরে ফেলতে চাননা তিনি। জিইয়ে রাখতে চান জীবনের মন্ত্র।

Related Articles

Back to top button
Close