fbpx
অফবিটকলকাতাগুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

অবন কথা……

অরিজিৎ মৈত্র:  অবন ঠাকুরের লেখা পড়ে রবীন্দ্রনাথ বলতেন, ‘অবন বলে যাচ্ছে, আমি শুনতে পাচ্ছি’,  রাণী চন্দকে  কবি বলেছিলেন, ‘তুই অবনের কাছ থেকে আরও আদায় করে নে। এমনি করে না বলিয়ে নিলেও বসে লিখবার ছেলে নয়’ চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথকে লেখক হিসেবে পাওয়ার জন্য তাঁর প্রিয় রবিকা চিঠিও লিখেছিলেন। কবি লিখলেন, ‘অবন,  কোমর বেঁধে বসে লেখবার ছেলে তুমি নও। এ জিনিস তুমি ছাড়া আর কারও মুখে হবে না। রাণীকে তুমি এমনিতরো আরও গল্প দাও।’ হাতে তুলি নিয়ে নিত্য নতুন সৃষ্টিতে মগ্ন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোর অতীত আর সেই বাড়ির বিচিত্র সব মানুষের গল্প বলে যেতেন। আর রাণী চন্দ সব লিখে রাখতেন।

এমনি করেই সৃষ্টি হয়েছিল, ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’, ‘ঘরোয়া’ ইত্যাদি। রবিকরে ঠাকুরবাড়ির অনেক কৃতী সন্তানের জীবন ও কাজ লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গিয়েছে। তেমনই রবীন্দ্রপ্রয়াণ দিবসেই অবন ঠাকুরের জন্মদিনটিকে আমরা ভুলে গিয়েছি।

১৯৪১ সালের ২২ সালের  শ্রাবণ তাঁর জন্মদিনেই কবির চলে যাওয়ার ছবি এঁকেছিলেন। তাঁর নিজের জন্মদিন উপলক্ষ্যে কোনওরকম আড়ম্বর পছন্দ ছিল না, কিন্তু একবার রবীন্দ্রনাথের কাছে বকুনি খেয়ে রাজি হতে হয়েছিল। তিনি যেন ছবি লিখতেন তেমনই কথাও আঁকতেন। ছোটরা তাঁদের অবুদাদুর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিল,  ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘রাজকাহিনী’,  ‘আলোর ফুলকী’,  ‘নালক’ প্রভৃতি শিশু ও কিশোর সাহিত্য।

ছোটদের ভালোবাসলেও তাদের শাসন করতেও ছাড়তেন না। নাতি বীরু অর্থাৎ অমিতেন্দ্রনাথের একবার ইচ্ছে হয়েছিল জোড়াসাঁকোর ৫ নং বাড়ির বিশাল চৌবাচ্চা যেখানে তাঁর দাদামশায় অবগাহন স্নান করতেন, সেটির গভীরতা পরখ করে দেখার জন্য। কিন্তু দ্বিপ্রহরের নৈঃশব্দের মধ্যেও সেই কাজ করতে বাধা পেয়েছিলেন দাদামশায়ের কাছ থেকে। উল্টে কপালে জুটেছিল অবন ঠাকুর ব্যবহৃত বিদ্যাসাগরী চটির দু’এক ঘা। এখানেই শেষ নয়, তাঁর প্রিয় ভালু কুকুরের চেন দিয়ে নাতিকে বেশ কিছুক্ষণ বেঁধে রেখে শাস্তি সম্পন্ন করেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: ভার্চুয়াল এডুকেশন ইন্টার ফেস-এর সূচনা রাজ্যে, থাকছে কেরিয়ার কাউনসেলিংয়ের সুযোগ

দেখা অদেখার জগতকে রেখায় আর রঙে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ছেঁড়া,  ক্ষয়ে যাওয়া, অযত্নে রক্ষিত লাল হয়ে যাওয়া নানান মাপের কাগজে। পরিষ্কার নতুন সাদা কাগজে ছবি আঁকতে চাইতেন না। চোখে দেখে এঁকেছিলেন উল্লাপাড়া রেল স্টেশনের ছবি। আবার কোনোদিনও আগ্রার তাজমহল না দেখেই এঁকে ফেলেছিলেন ‘শাহজানের মৃত্যু’।

এছাড়া ভারতমাতা,  কৃষ্ণলীলা সিরিজ,  শ্বেতশুভ্র ময়ূর, ওয়াজির ও শাহারজাদি,  রবি বাউল, বীণাবাদক, কচ ও দেবযানী, আরব্য রজনীর কাহিনী, বুদ্ধ ও সুজাতা সিরিজ,  যমুনার তীরে শ্রীরাধা এবং মহাশ্বেতার মতো বিখ্যাত চিত্রাবলী তো আছেই।  নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সারা জীবন যত এঁকেছি,  দেখেছি তার থেকেও বেশি, মনের মধ্যে সব জমিয়ে রেখেছি।’

রবীন্দ্র তিরোধানের পরে শান্তিনিকেতনে গিয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন আশ্রমের। রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর আচার্য। সেই সময় আশ্রমের চারধারে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন আবাসের স্কেচ করে রঙের ওয়াশ দিয়েছিলেন রাণী চন্দ সহযোগে। উদয়ন বাড়িতে আলো আঁধারির এক বিকেলে শেষ করলেন ‘মহাশ্বেতা’ ছবিটি,  তাতে সাদা রঙের টাচ দিয়ে আনমনে গেয়ে উঠেছিলেন, ‘গাও বীণা-বীণা, গাওরে।’

শিল্পীগুরু মনে করতেন, ‘ক্রুড মেথর্ড-এর মাধ্যমে রস ভোগ করানো সম্ভব নয়।’ ভাবতেন কল্পনায় ধরে আনতে হবে এক-একটি রূপকে যা লোকের চোখের সামনে নেই, তাকে এনে চোখের সামনে তুলে ধরো। ছবি হচ্ছে সাইলেন্ট মিউজিক। অবন ঠাকুরের ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী’ পড়লে শুধুমাত্র বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট-ই নয়, ভারতীয় চিত্রকলার সম্পর্কে একটা সামগ্রিক ধারণা করা যায়।

মনে ছিল অগাধ রসবোধের প্রাচুর্য। লেখার সময় বানানের দিকে খেয়াল রাখতেন না। ‘ঘরোয়া’ বইটির ভূমিকাতে ওঁর মূল হস্তাক্ষর ছাপা হয়। বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগের এক কর্মী তাঁর কাছে স্পেলিং মিস্টেকের বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অবনীন্দ্রনাথ ধমক দিয়ে বলে ওঠেন, ‘স্পেলিং নয়, স্পেলবাউন্ড করাই আমার কাজ।’ জোড়াসাঁকো চত্ত্বরের দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের ৫ নং বাড়ি বিক্রি হয়ে গেলে গুনেন্দ্রনাথ-সৌদামিনীর তৃতীয় সন্তান অবনীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের আবাস ছিল বরাহনগরের ‘গুপ্ত নিবাস’। বাড়ির লাগোয়া দীঘির জল তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত একদা জোড়াসাঁকো বাড়ির দক্ষিণের লুপ্ত হয়ে যাওয়া পুকুরের কথা। পুরাতন বিদায় নেয়, নতুন আসে। এই নিয়মে, এই ছন্দেই চলেছে জগৎ সংসার।

শেষ দিনগুলোতে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন সব কিছু থেকে। ছবি আঁকা বন্ধ, কুটুম কাটাম গড়া স্তব্ধ এমনকী হাতের কলমও নীরব। তখন সেই ধারা বহন করে চলেছেন নন্দলাল বসু,  ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার, অসিতকুমার হালদার,  মুকুল দে, রণদা উকিল প্রমুখ।  তাঁর বার্ধক্যের স্থির মূর্তি আপনমনে বসে থেকে কোন গভীর সমুদ্রে অবগাহন করতে চাইত, নাগাল পাওয়া যেত না।

ও. গিলার্ডি এবং চার্লস পামারের ছাত্র ধীরে ধীরে ডুব দিলেন দিগন্তবিস্তৃত অন্তহীন প্রকৃতির মধ্যে। সেখানে অবন ঠাকুরের মুক্তি হল আলোয় আলোয়।

Related Articles

Back to top button
Close