fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

আলুচাষের উন্নত প্রযুক্তি…

নিজস্ব প্রতিনিধি: কৃষিপ্রধান দেশে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের খাবারের অন্যতম সবজি আলু। দেশের অনেকেরই হয়তো দুবেলাই পাতে পড়ে আলু সেদ্ধ আর ভাত। এই আলু চাষে ভারতের উত্তরপ্রদেশ প্রথম স্থানাধিকারী। দ্বিতীয় স্থানে রযেছে পশ্চিমবঙ্গ, তৃতীয স্থানে বিহার, গুজরাট রয়েছে চতুর্থ স্থানে এবং অসম সপ্তমে| সারা ভারতে মিষ্টি  আলু সহ বিভিন্ন ধরনের (জ্যোতি, চন্দ্রমুখী ইত্যাদি) আলুর চাষ হয়ে থাকে| এবার দেখে নেওয়া যাক, ভারতের এই অন্যতম অর্থকরী ফসলের চাষ পদ্ধতি সম্বন্ধে।

প্রথমেই বলা যাক মাটির কথা| যে মাটির জলধারণ ক্ষমতা বেশি সেই মাটিতে আলু চাষ না করাই উচিত| অর্থাৎ এঁটেল মাটি আলু চাষের জন্য অনুপোযুক্ত| উন্নত জলনিকাশী ব্যবস্থা সহ বেলে-দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি আলুচাষের উপযুক্ত| মাটির অম্লতা সাড়ে ছয শতাংশ থেকে সাড়ে সাত শতাংশ হলে খুবই ভালো হয়| আলু চাষের জমিতে আগে যদি স্বল্পমেয়াদি আমনধান চাষ করা যায় তাহলে আলুর ফলন ভালো হয| এই চাষের জন্য মাটি ঝুরঝুরে হওয়া প্রয়োজন| সেইজন্য চাষের আগে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বি ভাবে ৩-৪ বার চাষ দেওয়া দরকার| জমির অম্লত্ব যদি বেশি হয় তাহলে চুন কিংবা ডলোমাইট প্রয়োগ করতে হবে এবং এর  প্রয়োগে তিন সপ্তাহ সময় দিতে হবে| সাতদিন পর ৩০-৪০ কেজি জৈবসারের সঙ্গে দেড়কেজি ˆট্রাইকোডারমা ভিরিডি ও ৩ কেজি হারে সিউডোমোনাস ফ্লোরেসেন্স ব্যবহার করলে রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যাবে| প্রতি একর জমিতে ৫-৬ টন জৈবসার ব্যবহার করতে হবে এবং শেষ চাষে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা ভালো|

রোগমুক্ত ভালো আলু পাওযার জন্য প্রয়োজন আলুর বীজশোধন| বীজ শোধনের জন্য জৈব কিংবা রাসাযনিক ছত্রাকনাশক উভয়ই ব্যবহার করা যেতে পারে| জৈবসার হিসাবে ˆট্রাইকোডারমা ভিরিডি তো রযেইছে  আর রাসাযনিক ছত্রাকনাশক হিসাবে প্রতি লিটার জলে  গ্রাম মিথোক্সি ইথাইল মারকিউরিক ক্লোরাইড গুলে সেই দ্রবণে আলুর বীজ  মিনিট ভিজিযে রেখে শোধন করতে হবে| আলুর বৃদ্ধির জন্য রাতের তাপমাত্রা ১০-১৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং দিনের তাপমাত্রা ১৬-২৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হওয়া বাঞ্ছনীয়।৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উর্দ্ধে যদি তাপমাত্রা হয তাহলে আলুর কন্দের বৃদ্ধি ব্যহত হয| মূলত তিনরকমের বীজ বপন করা হয| জলদি, মধ্যমেয়াদি এবং নাভিজাত| জলদি জাতীয় আলু ৭০-৮০ দিনের মধ্যে হয়| নাভিজাতের আলু হতে সময় লাগে ১১০-১২০ দিন| দক্ষিণবঙ্গের তুলনায উত্তরবঙ্গে ঠান্ডা বেশি এবং অনেকদিন পর্যন্ত থাকে বলে উত্তরবঙ্গে লাল জাতীয় লালু বেশি ভালো পরিমানে হয়|

মূলত আলু দুভাবে লাগানো হয়| এক, আলুর ভেলি তুলে ও দুই সরাসরি গোটা আলু দিয়ে| সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ১৮-২০ ইঞ্চি অর্থাৎ এক হাত আর গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৬-৮ ইঞ্চি অর্থাৎ হাতে তিনটি| ২-৩ ইঞ্চি গভীরে ২-৩ টি চোখযুক্ত আলু লাগালে খুব ভালো হয়| আলুর চোখগুলি উপরের দিকে কিংবা পাশের দিকে করে আলু বুনতে হবে| আলু বোনার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে মাটিতে হালকা বা পর্যাপ্ত পরিমানে জো থাকে| একর প্রতি প্রায় ৩০ হাজার বীজ আলু লাগাতে হবে যার জন্য ৭-৮ কুইন্টাল বীজের প্রয়োজন|

এক্ষেত্রে চাষীভাইদের অনুরোধ করা হয় যেন সংশোধিত বীজই তারা লাগান| গোটা আলু লাগানো সব থেকে ভালো| প্রসঙ্গত বলি, গোটা বীজ আলুর ব্যাস হবে ২-৩ ইঞ্চি, ওজন হতে হবে ২০-৩০ গ্রামের মধ্যে এবং আলুতে যেন ২-৩টি চোখ অবশ্যই থাকে| যদি আলু কেটে লাগানো হয় তাহলে খেয়াল রাখতে হবে যে ওই আলুতে কোনও দাগ না থাকে| তাছাড়া যে ছুরি কিংবা বঁটি দিয়ে আলু কাটা হচ্ছে সেটিকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটে ধুয়ে নিলে রোগের বিস্তার কম হবে|

মাটির পরীক্ষা ভিত্তিক রাসায়নিক, জৈব এবং জীবাণুসার ব্যবহার করা উচিত| প্রথম চাষের সময ৫-৬ টন জৈবসার যদি মাটিতে প্রয়োগ করা যায় এবং দ্বিতীয় চাষের সময় যদি অ্যাজোস্পরিলিয়াম বা অ্যাজোটোব্যাক্টর জীবাণুসার ব্যবহার করা যায় তাহলে আলুর ফলন ভালো হবে| এছাড়া মাটি পরী্ক্ষার ভিত্তিতে উর্বর জমিতে হেক্টর প্রতি ২০০ কেজি নাইট্রোজেন, ১৫০ কেজি ফসফেট ও ১৫০ কেজি পটাশ ছড়িযে দিতে হবে|

মূল সারের সঙ্গে অর্ধেক নাইট্রোজেন এবং পুরো ফসফেট এবং অর্ধেক পটাশ প্রয়োগ করতে হবে| পরবর্তীতে আলু লাগানোর একমাস পর প্রথম চাপানসার এবং ৭ দিন পরে দ্বিতীয় চাপান সার হিসাবে ২৫ কেজি ইউরিয়া এবং ১০ কেজি মিউরিয়েট অফ পটাশ প্রয়োগ করতে হবে| আলু চাষে অণু খাদ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ| অণুখাদ্য হিসাবে বোরো এবং জিঙ্ক খুবই প্রয়োজনীয়| বোরোর অভাবে আলু ফেটে যায় এবং গায়ে দাগ দেখা যায়| অন্যদিকে জিঙ্কের অভাবে আলু গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়| পরীক্ষার ভিত্তিতে মাটিতে প্রতি হেক্টরে ৮ কেজি সালফার, ২৫ কেজি জিঙ্ক সালফেট এবং ১০ কেজি বোরোক্স অণুখাদ্য প্রয়োগ করলে আলুর ফলন ভালো হয়|

 

যে সমস্ত চাষীভাই মাটি পরীক্ষা করেন না কিংবা মূল সারে অণুখাদ্য প্রয়োগ করেন না তারা প্রথম ও দ্বিতীয় চাপান সারের মাঝে পাতায় অণুখাদ্য স্প্রে আকারে দিতে পারেন| এইভাবে যদি নিয়ম মেনে উন্নত প্রযুক্তিতে চাষীভাইযেরা চাষ করেন তাহলে আলুগাছের বৃদ্ধি এবং ফলন আশানুরূপ হবে|

Related Articles

Back to top button
Close