fbpx
অফবিটব্লগহেডলাইন

মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে

শ্রেয়শ্রী ব্যানার্জী

একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি

তোমার জন্য গলির কোণে

ভাবি আমার মুখ দেখাব

মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে……।

আজকের ভোগবাদী সমাজ বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর। কোন প্রোডাক্ট চলবে আর কোন প্রডাক্ট চলবে না তা নির্ধারণ করে বিজ্ঞাপনের ভাষা। এই বিজ্ঞাপনের হাত ধরে চলতে মানুষের নিত্য নতুন প্রয়োজনের চাহিদা মেটানো। বর্তমান বিজ্ঞাপনের অবস্থানকে দেখে একথায় বলা যেতে বিজ্ঞাপন আমাদের জীবনের একটা অঙ্গ। যা আমাদের গৃহস্থে সর্বত্র বিচরণ করে বেড়চ্ছে। সাবান থেকে হরল্কিস, ব্যাট থেকে টিভি, ফোন থেকে জামা কাপড়, মাদক, এমনকি সিনেমাও এর বাইরে নয়।
রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রসেনজিৎ বিপণনের দায়িত্ব নিতে হয় সবাইকে। তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সৃজনশীলতার বীজ। একের পর এক তৈরি হয় বিজ্ঞাপনের মাস্টার। সাহিত্য, সঙ্গীত, বা অন্য শিল্পকলার থেকে যা কনো অংশে কম যায় না। তৈরি হয় মিথ। তৈরি হয় দর্শন প্রোডাক্ট থাকে না, থেকে যায় বিজ্ঞাপনের নস্ট্যালজিয়া। আচ্ছন্ন করে মননও।
এক কথায় বিজ্ঞাপন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞাপন তো নয়, যেন অনুভূতি নিয়ে খেলা! টেলিভিশন চালু করলে বিজ্ঞাপন, রেডিও চালু করলে বিজ্ঞাপন, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলে পাশের দেওয়ালে বিজ্ঞাপন, একটু উপরে তাকালে হাজারো বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপন, ল্যাম্পপোস্টের গায়ে বিজ্ঞাপন- এমনই নানা বিজ্ঞাপনের চাপে পিষ্ট সকলে। আজকাল তো টেলিভিশনে নাটক বা অন্য কোনও অনুষ্ঠান দেখতে বসে ভুলেই যেতে হয় অনুষ্ঠানের মাঝে বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞাপনের মাঝে অনুষ্ঠান! সর্বদাই চলছে এই বিজ্ঞাপন যন্ত্রণা। সাধারণ মানুষজন তা বুঝেও যেন না বোঝার ভান করে চলেছি। এটি আপনার দোষ নয়, দোষ নয় বিজ্ঞাপনদাতাদেরও। এটি আমাদের উপর এমনভাবেই প্রভাব ফেলে যে আমরা একটি সময় গিয়ে সাড়া দিয়ে ফেলব।

শুধু টেলিভিশনেই না, বর্তমানে পত্রিকাগুলোর সামনের-পেছনের পৃষ্ঠায় বিশাল অংশজুড়ে বিজ্ঞাপন থাকা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ভেতরের পাতায়ও যেখানে সেখানে থাকে অসংখ্য বিজ্ঞাপন৷ মাঝে মাঝে তো বিজ্ঞাপনের অভিনব কৌশলে সংবাদ থেকে তাকে আলাদা করতেও বিপাকে পড়তে হয়৷ আর অনলাইনের তো কথাই নেই৷ ওয়েবসাইটের মূল অধ্যায়ের চারিদিকে থাকার পাশাপাশি যেখান সেখান দিয়ে হুট করে হাজির হচ্ছে বিজ্ঞাপন৷ আধুনিক বিজ্ঞাপনের জনক বলে খ্যাত টমাস যে ব্যারেট বলেছেন, ‘‘রুচি পালটায়, ফ্যাশন পালটায়, আর বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়েই পালটাতে হবে৷ এমনটা নয় যে প্রতিবারই নতুন আইডিয়া পুরনো আইডিয়ার চেয়ে ভালো হবে৷ কিন্তু তা অবশ্যই পুরনোটার চেয়ে ভিন্ন এবং তা বর্তমান রুচির সঙ্গে মিলবে৷”

রবীন্দ্রনাথ জীবদ্দশায় বিজ্ঞাপনের জন্য দু’হাতে এনডর্সমেন্ট। মিষ্টি থেকে শুরু করে মাথায় মাখার তেল মিষ্টি পান। হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ থেকে ইনসিওরেন্স কোম্পানির একসময় শেয়ার হোল্ডার ছিলেন ঠাকুর পরিবার। তাই এই সংস্থার বিজ্ঞাপনে আছে রবীন্দ্রনাথ। তৎকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথকে দেখা গিয়েছিল হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক ওষুধের বিজ্ঞাপনে উৎসাহী ভূমিকায়। রেডিও স্নো ক্রিমের বিজ্ঞাপনেও হাস্যরত রবীন্দ্রনাথকে দেখেছে বাঙালি। আবার কোনও কোনও বিজ্ঞাপনে তাঁর আঁকা ছবি, গান কবিতার ব্যবহার করা হত।

রবীন্দ্রনাথ দিয়ে শুরু তারপর সেলিব্রিটিরা বহুবার এসেছেন বিজ্ঞাপনে। নায়িকার সাবান নিজে মাখলে তবেই তো নায়িকার মতো সুন্দরী হওয়া সম্ভব। লাক্স সাবানের প্রথম লাইন থেকে এসেছে ক্যাচলাইন, ‘চিত্রতারকাদের সৌন্দর্য সাবান’। বিজ্ঞাপনে মুখ দেখাতে পারলে তবেই একজন নায়িকা সত্যিকারের দরের নায়িকা হয়ে উঠতে পারেন। এমনটাই মনে করা হত একটা সময়ে। বিজ্ঞাপনের আধুনিক দিকটায় চমকপ্রদ নায়িকার বদলে শাহরুখ খানের দেখা মিলেছে। সিনেমার নায়িকারা সাবান মাখেন, নায়করা করেন সব কিছু, জামাকাপড় থেকে ঠান্ডা পানীয়, গ্লুকোজ বিস্কুট থেকে সিগারেট মাদক, সবেতে অবাধ বিচরণ। অশোক কুমার থেকে অমিতাভ বচ্চন রাজেশ খন্না, অক্ষয়কুমার থেকে ইরফান খান জগতে এনডর্সমেন্ট করেছেন সকলেই। আর এদের হাত ধরে শুরু এল ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডারের যুগ।

বিজ্ঞাপন নির্মাতারা নারীকে পণ্যই বানিয়ে ফেলছেন৷ বডি স্প্রে, ডিওডোরেন্ট কনডম ইত্যাদির বিজ্ঞাপন যৌনতাকে আশ্রয় করে তৈরি হয় না- একথা কেউ বলতে পারবে না৷ পুরুষ স্প্রে করলেই পরীসদৃশ নারীরা বাড়ি ঘর ভেঙে মর্তে পড়ে, পুরুষের বডি স্প্রের বিজ্ঞাপনে নারী ভাষ্যকার প্রশ্ন করেন, আজ রাতে কোথায় যাবেন?  ‘তৃষ্ণায় দু’হাত বাড়ালে তোমায় পাওয়া যায়’ কোমল পানীয়র বিজ্ঞাপনে পানীয়টা হাতে থাকলেও তৃষ্ণার্ত পুরুষ ব্যক্তিটি হাত বাড়ান চারপাশে নাচতে থাকা নারীর দিকে৷ বর্ণবাদী বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল প্রসাধনী পণ্যের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ডাভ৷ তিনটি ছবি যুক্ত বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী তার শরীরের টি-শার্ট খুলে ফেলছেন৷ তার চামড়ার নিচে একজন সাদা নারীকে প্রকাশ করতে টি-শার্ট খুলে ফেলেন তিনি৷ তৃতীয় ছবিতে টি-শার্ট খুলে ফেলার পর মুহূর্তের মধ্যেই কৃষ্ণাঙ্গ থেকে একজন শেতাঙ্গ এশীয় নারী বেরিয়ে আসে৷ অর্থাৎ ডাভ সাবান ব্যবহারের পর একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর শরীরের রঙ পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গেছে৷ কৃষ্ণাঙ্গ থেকে মুহূর্তের মধ্যেই শেতাঙ্গ হয়ে যান তিনি৷ অসঙ্গতিযুক্ত চটকদার বিজ্ঞাপনে মনে রাখার মতো কোনও বার্তা বা সারবস্তু নেই৷পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করছে তো? না হলে ধরে নিতে হবে পুষ্টির অভাব হয়েছে। এমনি খাবার হবে তাই চাই হরল্কিস কিংবা বাড়ন্ত বাচ্চার জন্য কমপ্লেন অথবা DHA যুক্ত বনভিটার পুষ্টি। স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিয়ে ব্র্যান্ডের মধ্যে ব্র্যান্ডের মারামারি বহুযুগের। কোনও ডাক্তার পেসক্রিপশনে লিখলে কী হবে অনেকের ধারনা হরলিক্স না কমপ্ল্যান না খেলে বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার কী মহিমা বিজ্ঞাপনের। অথচ প্রথম কমপ্ল্যানের বিজ্ঞাপনে বাচ্চাদের পুষ্টির কথা বলা হত না, তা ছিল অন্তঃসত্ত্বাদের স্বাস্থ্যর বিজ্ঞাপন, হরলিক্স ছিল সবার জন্য। পরের দিকে বদ্ধমূল ধারনা নুয়ে জন্ম নিল রেজাল্ট ভালো হবে কমপ্ল্যান হরলিক্স খেলে। ক্রিকেট মানেই গ্ল্যামার, আর একশো কোটি ভারতীয় এগারোজনের দেবতা, বিজ্ঞাপনে এদের অবধারিত অনুপ্রবেশ, ওয়াদেকার থেকে কপিল দেব, বেল ক্রিম মেখেছেন। সৌরভ থেকে জাদেজা কিং ফিসার খেয়েছেন। ধোনি থেকে বিরাট কি না করেছেন। কাল্পনিক চরিত্ররাও বিজ্ঞাপনে জায়গা করে নিয়েছে, আমূল মাখন থেকে ভোডাফোনে সর্বত্রই।

সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। সিগারেট ক্যান্সারের কারণ। এই সব আপ্তবাক্যগুলো একটা সময়ে দরকার হত না। ধূমপান করত আমোদ করে, তা ছিল মানুষের কাছে লাইফস্টাইল। বিজ্ঞান লাইফস্টাইলের প্রতিফলন। ‘লিভ লাইফ কিং সাইজ’ থেকে ‘স্পিরিট অব ফ্রিডম’। ‘মেড ফর ইচ আদার’ থেকে ‘সুখ টানের সম্পর্ক’। ওই সময়ে সিগারেট খাওয়া না খাওয়া নিয়ে কোনও নিষেধজ্ঞা ছিল না। বিজ্ঞাপন তৈরি হত সিগারেটের জন্য। দিন বদলাচ্ছে সিগারেটের বিজ্ঞাপনের আর নেই কিন্তু আসাধারণ ক্রিয়েটিভ নিয়ে সিগারেট বেআইনি হয়ে যাওয়া বিজ্ঞাপন থেকে যাবে বিজ্ঞাপনের ইতিহাস।

যুগের পরিবর্তন মানেই তাঁর রুচির পরিবর্তন। সিনেমা হল সমাজের দর্পণ, সিনেমার গল্প চরিত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই বদল হচ্ছে পোস্টারের ধরণ। প্রমথেশ বড়ুয়া থেকে উত্তম কুমার, প্রসেনজিৎ থেকে দেব যে ধারা ধরে বাংলা সিনেমায় পরিবর্তন এসেছে বাংলা সিনেমার পোস্টারে তা লক্ষ্য করা গেছে। তাছাড়া একজন স্বতন্ত্র পোস্টার আটির্স্ট হিসেবে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের। কথা আমাদের আলাদা করে মনে করিয়ে দেয়। বাংলা সিনেমায় ঐতিহাসিক পোস্টার গায়ে আঁকা রয়েছে। বাংলা পোস্টারে একটা স্বতন্ত্র সত্তা রয়েছে। আর এই পোস্টারই দর্শকদের হলমুখী করে রেখেছে।

বিজ্ঞাপন যেমন একদিকে সাধারণ মানুষের মনে প্রোডাক্ট সমন্ধে আগ্রহ জাগায়, তেমনই ভুল বিচার করার ক্ষমতাও জোগায়। আক্ষেপের বিষয় এটাই সাধারণ মানুষের বিচার করার ক্ষমতা দিনে দিনে লোপ পাচ্ছে। বিখ্যাত ব্যক্তিরা প্রোডাক্টের প্রচার করছে, সাধারণ মানুষ না জেনে, না পরক্ষ করে ব্যবহার শুরু করতে শুরু করে এতে শারীরিক ক্ষতি হয়। বিজ্ঞাপন একদিকে যেমন গণমাধ্যমের কাজ করে অন্যদিকে এমন কিছু ছবি ব্যবহার করে যা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্য দূষণ বলে গণ্য হচ্ছে। সমাজে বা শিশুমনে খারাপ প্রভাব ফেলার আশঙ্কা আছে, এমন ধরনের বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে কড়া পদক্ষেপ নিতে চলেছে রাজ্য সরকার। শহরের বেআইনি ও দৃশ্য দূষণ ঘটায় এমন বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে আগেই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছিল কলকাতা পুরসভা। সেই অভিযানে বন্ধও হয়েছিলো এধরনের বিজ্ঞাপন। এবার সাধারণ মানুষের ওপর কুপ্রভাব পড়ে এমন বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে পথে নামছে রাজ্যের ক্রেতা সুরক্ষা দফতর।  বেশ কিছু দিন আগে মন্ত্রী সাধন পান্ডে বলেন, যে বিজ্ঞাপন মানুষকে আতঙ্কিত করে, অসুবিধায় ফেলে বা বিপথে চালিত করে সেই ধরনের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলি যাতে ঠিকঠাক চলে তাই এতদিন অনেক বিজ্ঞাপন নিয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কিন্তু, এবার নেওয়া হবে। শেষে এটা বলা যায় এই যেন একই কয়েনের দুটো পিট।

Related Articles

Back to top button
Close