fbpx
গুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

লকডাউনের পর কেমন থাকব আমরা?

অমিত দাস , নদিয়া (করিমপুর) : কিছু কিছু মুহূর্ত চলে গেলেও রেখে যায় তার রেষ , রেখে যায় আতঙ্ক। বেশ কয়েকদিনের জন্য লকডাউন হয়েছে সমস্ত কিছু। প্রায় তা ৩ রা মে পর্যন্ত। কিন্তু এরপর? কেমন ভাবে থাকব আমরা? যদি আরও বাড়ে লকডাউনের মেয়াদ , তাহলে তার পরের অবস্থা কি হবে? লকডাউন উঠে গেলেই কি করোনা সংক্রমণের হাত থেকে বেঁচে যাব আমরা? এই ভাইরাস কি সহজেই বিদায় নেবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে? লকডাউন উঠে গেলেই কি সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আমাদের সকলেরই এমুহূর্তে অজানা।

হঠাৎই বদলে গেছে আমাদের রোজকার জীবন। দূরত্ব বেড়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের। খুব প্রয়োজনে বাইরে বেরলেও আতঙ্ক থাকছে মনের ভেতর। বাইরের সমস্ত পোশাক আশাক কেচে উঠতে হচ্ছে ঘরে। পাল্টে গেছে বেশ কিছু অভ্যাস। ক্লাসরুম বন্ধ , মাঠে খেলা বন্ধ , বড়োদের আড্ডা বন্ধ। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গেলেও রাখতে হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। বন্ধু বান্ধব , আত্মীয় স্বজনদের মুখ দেখা বন্ধ , সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ।এসমস্ত পটপরিবর্তন সব কিছুই কিন্তু লকডাউনের জন্য।

দিন যতই যাচ্ছে লকডাউনের মেয়াদের দিনও প্রায় শেষ হয়ে আসছে। প্রত্যেকে অপেক্ষা করে আছে সেই দিনটার। লকডাউন শেষ হলেই মানুষ বেরিয়ে পড়বে কাজের তাগিদে। চলতে শুরু করবে ট্রেন , বাস , ট্যাক্সি , টোটো। খুলে যাবে সমস্ত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। ঘরে ফিরবে বাড়ির বাইরে থাকা মানুষগুলো। সবার দুশ্চিন্তা দুর হবে। আবদ্ধ মনগুলো হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই হবে? এত সহজেই মুক্তি পাব আমরা এই ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে? কতটুকু জীবাণুমুক্ত হবে এই সমস্ত যানবাহনগুলো? পাবলিক ট্রান্সপোর্টগুলো? গভীরে গিয়ে ভাবলে সমস্যা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

লকডাউন উঠে গেলেই যে আমরা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাব , তা ভাবাটা কিন্তু সমীচীন নয়। লকডাউন চলাকালে আমরা যতটা সুরক্ষিত আছি বলে মনে করছি , লকডাউন উঠে গেলে আমরা নিজেদের ততটা সুরক্ষিত ভাবতে পারব না। তাই এনিয়ে ভাবনার যথেষ্ট কারন রয়েছে। লকডাউনের জন্য যার যার যেসমস্ত কাজ আটকে রয়েছে , তারা প্রত্যেকেই তার জন্য বাড়ির বাইরে হবেন। ভিড় জমবে বাজার থেকে শুরু করে অফিস কাচারিতেও।

কিন্তু সতর্কীকরণের কি হবে? কি হবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয় অভ্যাসগুলোর? যেমন- মাস্ক ব্যবহার করা , বারবার হাত ধোয়া , স্যানিটাইজ করা , সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা এসবগুলোর। লকডাউন শিথিল হলেও কতখানি কঠোর থাকবে এইসমস্ত সতর্কতামূলক বিধিগুলো?

লকডাউন পিরিয়ডে প্রশাসন যথেষ্ট কঠোরভাবেই মানুষের বাইরে বেরোনো বন্ধ ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু লকডাউন শিথিল হবার পর সেভাবে পারবে সেগুলো একইভাবে দেখভাল করতে , সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে লকডাউন শিথিল হলেও বেশকিছু সতর্কতামূলক নিয়মগুলো আমাদের বেশ কিছুদিন মেনে চলতে হবে। কারন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এতো সহজে বিদায় নেবে না।

WHO ও কিন্তু সেরকমটাই বলছে। এর উপর আরেকটা বিষয়, প্রত্যেকটি মানুষের শরীরে করোনা সংক্রমণের টেস্ট কিন্তু নেওয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও আমরা কি নিশ্চিত হতে পারছি যে , লকডাউন উঠে গেলেও আর সংক্রমিত হবো না।

অন্যদিক দিয়ে ভাবলে বিষয়টি অন্যরকম। বেশকিছু মানুষের কথা ভাবলে লকডাউন শিথিল হওয়া দরকার। যেসব মানুষগুলো দিন আনে দিন খায় , প্রতিদিন যাদের পেট চলে রোজকার খাটুনির পয়সায় , দিন মজুর মানুষগুলো। এরা কিন্তু সত্যিই কষ্টে রয়েছে। ঘরে একটাও পয়সা নেই। সরকারি সাহায্য পাচ্ছে অনেকেই। পাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ত্রাণও। কিন্তু তা কতদিন? তাতে করে কি তাদের সব অভাব মিটবে? লকডাউন যদি আরও কয়েকদিন বেড়ে যায় , তাতে করে এই মানুষগুলোর কিহবে?

এদিকে লকডাউনের জেরে বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকছে। শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা। লকডাউনের ফলে দেশের ৭০ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র অত্যাবশ্যক পণ্য ছাড়া সমস্ত ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। অর্থনীতি গবেষণা সংস্থার হিসেব বলছে , লকডাউনের কারনে প্রতিদিনকার হিসেবে ভারতীয় অর্থনীতির একেক দিন ৩৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। তাহলে লকডাউনের মেয়াদ বৃদ্ধি পেলে এই ক্ষতির পরিমাণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে সে হিসেব পরিস্কার। অর্থনীতিবিদদের মতে এঅবস্থায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভারতের অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিক ও কর্মচারীরা , যারা কাজের অনুপাতে পারিশ্রমিক পান।

একইভাবে ধাক্কা লেগেছে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতেও। লকডাউনের জন্য এরাজ্যে বিপুল টাকার ব্যবসা মার খাওয়ায় , স্বাভাবিকভাবেই জি এস টি খাতে রাজ্য সরকারের আদায় তলানিতে পৌঁছেছে। আরও বড়ো আশঙ্কা হল লকডাউন উঠে যাওয়ার পরেও গোটা রাজ্যে ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে এই ২০২০-২১ অর্থবর্ষের প্রায় গোটাটাই লেগে যাবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীদের বড়ো অংশ।

কিছু মানুষের কথা ভেবে এবং দেশের বেহাল অর্থনীতির কথা ভেবে লকডাউন শিথিল হওয়া প্রয়োজন ঠিকই কিন্তু তার পরবর্তীতে আমাদের জীবন সংশয় থেকেই যাচ্ছে। থেকে যাচ্ছে সংক্রমিত হবার ভয়। কারন লকডাউন উঠে গেলেই ভিড় জমবে বাজারে , নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকানগুলিতে। জমায়েত বাড়বে ধর্ম প্রতিষ্ঠানগুলিতে। এসময় কেউ কেউ নিশ্চিন্ত মনে মাস্ক না পরে বেরতেই পারেন। সবসময় লিকুইড সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত নাও ধুতে পারেন , মানতে নাই পারেন সামাজিক দূরত্ব। এতো মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব কে নেব? আর করলেই বা সবাই কি সচেতনভাবে মেনে চলবে এই অভ্যাসগুলি? এতো ভিড় কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? কতজন মানুষকে মাস্ক ব্যবহার করার কথা বলা হবে? কিভাবে তা সম্ভব হবে?

লকডাউনে অবশ্যই আমরা সকলেই অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছি ঠিকই। আবার এই লকডাউনের জন্যই কিন্তু আমাদের দেশ বহুল পরিমাণে সংক্রমিত দেশগুলির থেকে অনেকটাই দূরে রাখতে পেরেছে। কিন্তু লকডাউন উঠে যাওয়ার পর সেই সংক্রমণের হাত থেকে আমরা কতটা বাঁচতে পারব , সে আশঙ্কাই এখন বড়ো করে দেখা দিচ্ছে। লকডাউন উঠে গেলেও কি সত্যিই আমরা নিরাপদে থাকতে পারব?

Related Articles

Back to top button
Close