fbpx
কলকাতাহেডলাইন

প্রথমবার নির্বাচনে জেতার পর ভোর রাতেও সমর্থকদের ভিড়, ঢাকুরিয়ার সেই বাড়ি শোকে পাথর

শরণানন্দ দাস, কলকাতা: মুকুটখানা পড়েই আছে, রাজাই শুধু নেই। ঢাকুরিয়ার ‘ বাতায়ণ’ বাড়ির বাসিন্দা দেশের প্রাক্তন একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় নেই। সোমবার দিল্লির সেনা হাসপাতালে থেমে গিয়েছে তাঁর পথচলা। অথচ প্রথমবার লোকসভা নির্বাচনে জেতার পর প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কলকাতার এই বাড়ির সামনে ভোর পৌনে ৪ টেয় ঢল নেমেছিল সমর্থকদের। ‘দ্য কোয়ালিশনস ইয়ার্স’ বইয়ের পাতায় নিজেই লিখেছেন সেই অভিজ্ঞতার কথা।

মঙ্গলবার দুপুরে  দিল্লির লোদিরোড মহাশ্মশানে যখন প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পার্থিব শরীর  পঞ্চভূতে বিলীন হচ্ছে তখন  ঢাকুরিয়ার বাড়িতে পিন ফেলার শব্দ শোনা যাবে। আড়াই দশকের বেশি সময় ঢাকুরিয়ার এই বাড়িতে কলকাতায় এলে কাটিয়েছেন। দেয়ালে সহাস্য প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ছবি এখন থেকে ফ্রেমবন্দিই থাকবে। বাড়িজুড়ে শুধুই স্মৃতির ওড়াওড়ি। ঢুকেই বৈঠকখানার ঘর, শূন্য চেয়ার, টেবিল, দর্শনার্থীদের জন্য সোফা। ওই চেয়ারে আর প্রণব মুখোপাধ্যায় কোনদিন বসবেন না। বসার ঘরে সোফায়, চেয়ার টেবিল, দেয়ালে ইন্দিরা গান্ধীর ছবি। এই ঘরে প্রণব মুখোপাধ্যায় বৈঠক করতেন।

ঘরের অন্যদিকে আরএক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ছবি। ভিতরে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির শোয়ার ঘর। ছিমছাম বিছানা, পুরোনো মডেলের খাট। আর এ ঘরেই ঠাকুর ঘর। চরম দুঃসংবাদ আসার আগে পর্যন্ত এ বাড়ির দীর্ঘদিনের  কর্মী ছায়াদেবী, আর এক দীর্ঘ দিনের সহচর দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই ঠাকুরঘরে দেবতার কাছে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সূস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছেন।  দেবপ্রসাদবাবূ স্বগতোক্তির ঢংয়ে বললেন, ‘একদিন এই বাড়িতে কতো বড়বড় মানুষ দাদার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, একবার পতৌদি এসেছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গেও দাদার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আরও কতোজন রাজেশ খান্না, প্রসেনজিৎ, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, ভেস পেজ, লিয়েন্ডার, পিকে, চুনী গোস্বামী, সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এসেছেন, বাড়িটা গমগম করতো।’ দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন।

আরও পড়ুন: পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পূর্ণ হল আধুনিক রাজনীতির চাণক্যর শেষকৃত্য

ঢাকুরিয়া ব্রিজের নিচে এই সাদামাটা বাড়ির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের লেখাতেও।  ‘ দ্য কোয়ালিশান ইয়ার্স’ বইতে প্রণব মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ২০০৪ সালের মে মাসে প্রথমবার মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর আসনে জিতে কলকাতার বাড়িতে ফেরার কথা। ভোর ৩ টে ৪৫ নাগাদ ঢাকুরিয়ার বাড়ির সামনে অত ভোরে প্রচুর সমর্থক তাঁকে অভিনন্দন জানাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ২০১৭ য় প্রকাশিত বইটিতে লিখেছেন, তিনি জয়লাভ সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। কারণ পাঁচ বারের রাজ্যসভার সদস্য এর আগে ১৯৭৭ এ মালদা ও ১৯৮০তে বোলপুর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন মূলত অধীর চৌধুরীর পীড়াপীড়িতেই তিনি জঙ্গীপুর কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়তে রাজি হন। এছাড়াও আর যে কারণের উল্লেখ বইটিতে তিনি করেছেন তা হলো  জওহরলাল নেহরুর  আদর্শ মেনে চলা। নেহরু মনে করতেন কোন রাজ্যসভার সদস্য যিনি মন্ত্রী হয়েছেন তাঁর উচিত প্রথম সুযোগেই লোকসভা থেকে নির্বাচিত হওয়া। বইতে লিখেছেন জয়ের পর সার্টিফিকেট নিয়ে ওই রাতেই কলকাতা রওনা হন। কারণ সোনিয়া গান্ধী তাঁকে পরদিন সকালেই দিল্লি পৌঁছতে বলেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘ আমার সঙ্গী ছিলেন সোমেন মিত্র।  আমরা কলকাতা পৌঁছই রাত ৩ টেয়। ঢাকুরিয়ার বাড়িতে পৌঁছই ৩ টে ৪৫ নাগাদ। অতভোরেও প্রচুর মানুষ আমাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য অপেক্ষা করছেন।’ বইতে লিখেছেন সমর্থকদের সঙ্গে দেখা করে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে ভোরের বিমান ধরতে বেরিয়ে পড়েন। বিমান টেকঅফ করার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। দিল্লি পৌঁছনোর পর বিমানসেবিকা তাঁর ঘুম ভাঙান। প্রণব মুখোপাধ্যায় এখন  অতীতের, স্মৃতির মানুষ। ঢাকুরিয়ার ‘ বাতায়ণ’ এখন থেকে নিঃসঙ্গ, স্মৃতিরা শুধু বাতাসের সঙ্গে কাটাকুটি খেলবে।

 

Related Articles

Back to top button
Close