fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাহেডলাইন

তরঙ্গ কথা

পর্ব-৮

মনীষা ভট্টাচার্য: বাইরে কড়কড়ে রোদ।  নভেম্বরের  পনেরোতেও পাখা লাগছে। ঘোর অমাবস্যায় গতকাল হয়ে গেল দীপান্বিতা কালীপুজো। বাজি নিষিদ্ধ হয়েও কিছু শব্দ অবশ্য শোনা গেল। যাই হোক, কালকের নির্জলা উপোসের পর আজ ঠাকুমার শরীরটা তেমন ভালো না।  রেডিওটাও ঠিক মতো চলছে না।  মনটা খারাপ লাগছে ঠাকুমার।  আসলে রেডিওর জন্মলগ্ন থেকে না হলেও সেই ১৯৪৪ সাল থেকে ওই একটিমাত্র বস্তু যা ঠাকুমাকে ছেড়ে যায়নি। আজ ৭৫ বছরেও, আধুনিক শৈলীর রেডিও অনুষ্ঠানও তাঁকে টানে।  ঠাকুমার কাছেই শুনেছি এক সময় রেডিও বন্ধের আভাস, লাইসেন্স ফি, বেতার জগৎ এমনই আরও কত কী! আজকের বেতার কথায় সেই সব কথা।

১৯২৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জন্ম নিল বেতার জগৎ। মূলত বেতারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানসূচী জানাতেই এই পত্রিকার জন্ম। পা্ক্ষিক এই পত্রিকার প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় দেখা গেল একটি ছোট বিজ্ঞাপন। ‘বিনা লাইসেন্সে রেডিও সেট ব্যবহার করার অর্থদণ্ড দিতে হয়েছে, এ সংবাদ আমরা গত সংখ্যা বেতার জগৎ মারফত সাধারণকে জানিয়েছি।…যাঁরা এখনও বিনা লাইসেন্সে সেট ব্যবহার করেন, তাঁরা অনুগ্রহ করে এই বেলা লাইসেন্স নিয়ে ফেলুন। নচেৎ তাঁদের  ভবিষ্যতে দুঃখিত হতে হবে…’।  এই বিজ্ঞাপন থেকে বোঝা যায় সেই সময় বেতারের শ্রোতাদের থেকে বার্ষিক লাইসেন্স ফি নেওয়া হত। আসলে বেতার সম্প্রচারের ব্যয়ভার এই টাকা থেকে কিছুটা সুরাহা হত।  তার থেকেও যে ব্যাপারটিতে সাহায্য হত, সেটি হল সরাসরি শ্রোতাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট  অনুষ্ঠানের অভিমত পাওয়া যেত।  বর্তমানে যদিও এই প্রথা আর নেই।

১৯৩০ সালের প্রথমদিকে, (তখন বেতারের নাম ছিল ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি) বেতার বিপুল অর্থসংকটের মুখে পড়ে।  কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন, বেতার বন্ধ করে দেওয়া হবে।  অথচ তখন সাধারণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হিসাবে বেতার একটি জায়গা করে নিয়েছে।  কিন্তু মুশকিল হল, কর্তৃপক্ষের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত শ্রোতাদের কাছে ফাঁস হয়ে পড়ে। ওই বছর ফেব্রুয়ারির বেতার জগৎ সংখ্যায় প্রকাশিত সম্পাদকের উদ্দেশে লেখা শ্রী বাঞ্ছারাম চট্টোপাধ্যায়ের লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, বেতার বন্ধ করে দেওয়া হবে।  ফলত যাঁরা সদ্য লাইসেন্স করিয়েছেন, তাদের খুব লোকসান হল।  চিঠিটি কিছুটা উদ্ধৃত করছি, ‘মশাই, শুনলাম নাকি আপনাদের বেতার উঠে যাচ্ছে।  খুব লোকসান যা হোক, মশাই।  এই সবে দিন পনেরো লাইসেন্স করেছি।…ভাবলুম বাড়িতে ফিরে এসে সন্ধেবেলাটা একটু আরাম করব, পাঁচজন বন্ধু-বান্ধবকে ডেকে বেতার শোনাব….এখন কী হবে মশাই?’ এই চিঠিতে ‘মহিলা মজলিশ’, ‘গল্পদাদা’ এই অনুষ্ঠানের নামও পাওয়া যায়।  এই অনুষ্ঠানগুলির জন্য বাড়ির লোকজনেরা অপেক্ষা করে বসে থাকেন। তার কী হবে? তবে শেষমেষ, বেতার বন্ধ হয়নি। এই খবরও বেরিয়েছিল বেতার জগৎ পত্রিকায়। ‘গভর্ণমেন্টের তরফ থেকে আামাদের জানানো হয়েছে যে কলিকাতা ও বোম্বাই-এর স্টেশন থেকে প্রত্যহ নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠানগুলি প্রচারিত হবে।  একদিনের জন্যও বন্ধ হবে না’।  আমরা জানি ১৯৩০ সালের ১ এপ্রিল থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে বেতার সম্প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করে ভারত সরকার। নাম হয় ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস।

আগেই বলেছি, এই বেতার জগতের জন্ম ১৯২৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, আর সেই অর্থে এর মৃত্যু ১৯৮৬ সালের ১৫ জানুয়ারি। অর্থাৎ এর জীবনকাল ৫৬ বছর ৩মাস ১৯ দিন। এই সময়সীমায় তার কত না লড়াই, কত না সুখস্মৃতি। এবার একটু চোখ রাখি সেইদিকে। মূলত বেতারের অনুষ্ঠানের আগাম খবর জানানো হত এই পাক্ষিক পত্রিকায়। এছাড়াও থাকত বেতারে প্রচারিত কথিকা, গল্প, সাক্ষাৎকার, সমীক্ষা।

জানা যাচ্ছে, বেতার অনুষ্ঠানের প্রোপাগন্ডার জন্যই এই পত্রিকার ভাবনা।  প্রতি মাসের ১ ও ১৬ তারিখে এই পত্রিকা প্রকাশিত হত।  দাম ছিল দুই আনা।  বার্ষিক গ্রাহকদের ‘ম্যানেজার, বেতার জগৎ’ এই নামে ২ টাকা মূল্য পাঠাতে হত। বিশেষ সংখ্যার দাম বেশি হলে, বার্ষিক গ্রাহকদের অধিক মূল্য দিতে হত না। সঠিক সময়ে পত্রিকাটি না পেলে ডাকবিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ থাকত। ডাকবিভাগের অনুসন্ধান বেতার কেন্দ্রে জানালে পুনরায় সেই সংখ্যাটি গ্রাহককে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হত।  সাহিত্যিক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী বেতার জগৎ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক হন।  বেতন পেতেন মাসিক ৫০টাকা। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, কার্যত প্রেমাঙ্কুরবাবু সম্পাদক হলেও ছাপা হত নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদারের নাম। পরবর্তীতে যখন সিদ্ধান্ত হয় স্টেশন ডিরেক্টরের নামেই সম্পাদকের নাম ছাপতে হবে, তখন সম্পাদকের নাম মুদ্রিত হত জে.আর স্টেপলটন।  স্বাধীনতার পর, যিনি সম্পাদক ছিলেন তাঁর নামই যেত।

১৯২৯ সালে বেতার জগৎ-এর প্রথম সংখ্যা ছাপা হয় সাহিত্যিক মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের কান্তিক প্রেস থেকে।  প্রেমাঙ্কুর আতর্থী নিউ থিয়েটার্সে যুক্ত হলে সেই স্থানে আসেন নলিনীকান্ত সরকার। অনুষ্ঠানসূচীর পাশাপাশি থাকত বিশেষ প্রবন্ধও। প্রকাশিত হত বিশেষ সংখ্যাও।  যেমন, রবীন্দ্র সংখ্যা, নেতাজী সংখ্যা, শারদীয়া সংখ্যা। আজকের মতো প্রিন্টিং টেকনোলজি না থাকায় হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত বদলালে সমস্যা হত।  ১৯৩৬ সালের জানুয়ারি মাসে এমনই এক সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল।  সম্রাট পঞ্চম জর্জের দেহাবসান হয়েছে ২৬ তারিখ।  সেই সময় ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম পক্ষের বেতার জগৎ প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।  হাতে মাত্র ৪-৫দিন।

নলিনীকান্ত সরকার লিখছেন, ‘বন্ধুবর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সঙ্গে পরামর্শ করে এই সংখ্যার বেতার জগৎ বিশেষ সংখ্যারূপে প্রকাশ করবার জন্যে উদ্যোগী হলাম।  বীরেন্দ্র ভদ্র ছুটলেন ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি (এখনকার ন্যাশানাল লাইব্রেরী)।  সেখান থেকে খান দু’ই মোটা মোটা বই নিয়ে এলেন।….বীরেনবাবু লিখতে বসলেন। আমি ছুটলাম ছাপাখানায়। ছুটলাম ব্লকমেকারের কাছে।…উৎসাহ দিলেন তাঁরা।….সকলের সহযোগিতা পাওয়ায় যথাসময়ে ‘পঞ্চম জর্জ সংখ্যা’ বেতার জগৎ বেরিয়ে গেল’।  এইরকমই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬৪ সালের ২৭ মে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মৃত্যুতে।  নির্ধারিত কিছু লেখা বাদ দিয়ে, নেহরু সম্বন্ধীয় লেখায় সমৃদ্ধ ‘জওহরলাল নেহরু সংখ্যা’ যথাসময়ে প্রকাশিত হয়েছিল। আসলে বিষয়ের গুরত্ব বোঝার বোধ, পড়াশোনা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা – এই তিনের সংযোগ প্রকৃত অর্থেই ছিল বলে, বেতার জগৎ এত জনপ্রিয় হয়েছিল।  দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আজ অনেক সম্পাদকেরই সেই বোধ-বুদ্ধি, পড়াশোনা কোনওটাই নেই।

১৯৪৪-এর ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে নলিনীকান্ত সরকার সম্পাদকের পদ পালন করে নিয়মানুযায়ী অবসর গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে  গণেশচন্দ্র চক্রবর্তী, পি বি রায়, অনিলবরণ গঙ্গোপাধ্যায়, বিবেকানন্দ রায়,  সুভাষ বসু, অসীম সোম প্রমুখ নাম উঠে এসেছে বেতার জগৎ – এর সফল সম্পাদক রূপে। ট্রান্সজিস্টার রেডিও বেরোনোর পর দ্রুত বাড়ে রেডিওর শ্রোতা সংখ্যা, আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বারে বেতার জগতের প্রচার সংখ্যা ও বিজ্ঞাপন। একসময় বেতার জগতের মুদ্রণ সংখ্যা সমসাময়িক পত্রসমূহের শীর্ষে পৌঁছয়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে শুধুই কি বাংলা ভাষায় বেতার জগৎ নাকি অন্য ভাষাতেও প্রকাশিত হত ? এর উত্তর যে হ্যাঁ, সে আপনারা সবাই জানেন। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতেই দেখা গেছে ফেলুদাকে বেতার অনুষ্ঠানসূচীর সাপ্তাহিক ইংরেজি পত্রিকা হাতে, যেখান থেকে সে খুঁজে পায় গণেশ রহস্যের অন্যতম এক সূত্র। বেতার জগৎ প্রকাশের আগে মুম্বাই থেকে প্রকাশিত হয় ইন্ডিয়ান রেডিও টাইমস যার পরবর্তীতে নাম হয় ‘দ্য ইন্ডিয়ান লিসনার’।  ১৯৩৮ সালে হিন্দি মুখপত্রের নাম ‘আওয়াজ’ থেকে পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সারঙ’। উর্দু মুখপত্রের নাম ‘আওয়াজ’-ই থাকে।  ১৯৫৮ সালে ‘দ্য ইন্ডিয়ান লিসনার’ ও ‘সারঙ’ এই দু’ইয়ের নাম হয় আকাশবাণী। তবে বেতার জগৎ নামটি কোনওদিন পরিবর্তিত হয়নি। অসমিয়া মুখপত্রটির নাম ছিল ‘আকাশী’।

বেতার নিইয়ে লিখতে শুরু করলে শব্দসংখ্যা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, সম্পাদক রাগও করেন, কিন্তু উপায় নেই। এই বেতার জগৎ থেকে তখনকার বিজ্ঞাপনের ভাষার নানা পরিচয় ও শৈলীর সন্ধান পাওয়া যায়। সেই বিজ্ঞাপন নিয়ে অন্য সংখ্যায় কলম ধরব। সঙ্গে রইল আপনাদের জন্য একটি রবীন্দ্র সংখ্যা, নেতাজী সংখ্যা ও অন্য একটি সংখ্যার কাভার পেজ।

(ক্রমশ চলবে…)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close