fbpx
অন্যান্যকলকাতাহেডলাইন

তরঙ্গ কথা……

পর্ব-৬

মনীষা ভট্টাচার্য: চক্রবৎ ঘুরছে এই দুনিয়া। দিন, মাস, বছর এভাবেই কেটে যাচ্ছে যুগের পরে যুগ। পাল্টাচ্ছে পরিবেশ, প্রেক্ষাপট, প্রসঙ্গ। এই পরিবর্তনের মধ্যে যা স্থায়ী, যা অতি পরিচিত, তার অনেক কিছুরই রূপ বদল হয়েছে, স্থান বদল হয়েছে, বদল হয়েছে নামও। রাস্তা-ঘাটের নাম বদলের কথা তো আমরা জানিই, রেলস্টেশন-তার নামও বদল হয়েছে অনেক, কিন্তু জানেন কি আমাদের কলকাতা আকাশবাণীর নাম পাল্টেছে? ‘আকাশবাণী কলকাতা’ শৈশবের সেই নস্টালজিয়ার নাম সম্প্রতি বদলে হয়েছে ‘আকাশবাণী গীতাঞ্জলি’ ও ‘আকাশবাণী সঞ্চয়িতা’।  ভ্রূকুটিতে খুব একটা কাজ হবে না, এই তথ্যটি সত্য। কলকাতা ‘ক’ প্রচার তরঙ্গের নাম হয়েছে ‘আকাশবাণী গীতাঞ্জলি’ ও কলকাতা ‘খ’ প্রচার তরঙ্গের নাম হয়েছে ‘আকাশবাণী সঞ্চয়িতা’।

আকাশবাণীর মহিলামহল ও বেলা দে সমার্থক।

নতুন তথ্যের পাশাপাশি এবার সেই স্মৃতির পাতা ওল্টাই যেগুলি আজ ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি  মাসে বেতারের বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানসূচীর পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘মহিলামহল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি শ্রোতাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ওই বছর ১৫ অগাস্ট ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আগে ১৯৪৩ সালের ১৫ অগাস্ট বাঙালি শ্রোতার জীবনে এক অন্য স্বাধীনতার ছোঁওয়া দিয়েছিলেন ইন্দিরা দেবী। কলকাতা বেতারের প্রথম মহিলা ঘোষিকার পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি।  ইন্দিরাদি মানেই ‘শিশুমহল’, কিন্তু নাহ, আজ শিশুমহল নয়, আজ স্মৃতিচারণ করব মহিলামহলের।  এই অনুষ্ঠান পরিচালনায় পর্যায়ক্রমে এসেছেন মল্লিকা ঘোষ, নূরজাহান বেগম, মাধুরী বসু, রেখা দেবী (মেডন), বেলা দে এঁদের মতো ব্যক্তিত্ব। এই বেলা দে মহিলামহল বিভাগ সামলেছেন প্রায় তিরিশ বছর। বেলা দে-র স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়, ‘সে যুগে উত্তর কলকাতার এক বনেদি বাড়ির মেয়ে ও বনেদি পরিবারের বধূর বেতারে চাকরি করা পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনেরা ভালো মনে মেনে নিতে পারেননি, আড়ালে আবডালে সবাই ছি ছি করে উঠেছিল।…আমার আগে থেকেই বেতারে কাজ করতেন ইন্দিরা দেবী। আবার সমসাময়িক ছিলেন নীলিমা সান্যাল।  সেই সময় ‘‘মহিলামহল’’ পরিচালনা করতেন রেখা দেবী।  দেশ বিভাগের পর রেখা দেবী দিল্লি চলে গেলেন। তারপর আমি ‘‘মহিলামহল’’ পরিচালনার ভার পেলাম।’

রান্নাবান্না, কেনাকাটা, রূপচর্চা, সাহিত্য সভা, নানা হাতের কাজের শিল্প, গ্রামে-গঞ্জে মহিলাদের উত্তরণের কথা, বিশেষ বিশেষ দিনে বিশিষ্ট মহিলা অতিথিদের স্টুডিওতে নিয়ে আসা – অর্থাৎ রাধা থেকে চুল বাধা, সব বিষয়ই আলোচিত হত এই মহিলামহলে।  বেলা দে লিখছেন, ‘মনে পড়ে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অগাস্টের অনুষ্ঠানটি।  সেদিন স্টেশনে অধিকর্তার নির্দেশে আমরা দেশবন্ধু জায়া বাসন্তী দেবীর লাইভ ব্রডকাস্ট করেছিলাম। মনে আছে স্বামীর কথা বলতে গিয়ে বাসন্তী দেবীর কান্নার আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল। তবে খণ্ড বিচ্ছিন্ন ভারতের স্বাধীনতা বাসন্তী দেবীকে খুশি করেনি।’ শুধু বাসন্তী দেবী কেন, দেশভাগের মধ্য দিয়ে আসা স্বাধীনতায় কেউই খুশি হতে পারেনি।  স্বাধীনতার খবর, স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ, উদ্বাস্তুদের হাহাকার, এসব খবরই সময়ে সময়ে কলকাতা বেতার দিয়েছে।  সে কথা অন্য কোনওদিন বলা যাবে।

ফিরে আসি আবারও বেলা দে-র কথায়। উনি এবং নীলিমা সান্যাল মহিলামহলে এক সঙ্গে কাজ করতেন। কথোপকথনের মাধ্যমে নীলিমা সান্যাল ভালোই আসর জমিয়ে দিতেন। একদিন অনুষ্ঠান শেষ হতে বাকি সাড়ে চারমিনিট।  বেলাদি বললেন, ‘নীলিমা এসো এই সময়টা তোমার গান দিয়ে অনুষ্ঠানটা ভরিয়ে দিই।’ কোনও বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই নীলিমা গান ধরলেন, ‘আমার মন চেয়ে রয়, মনে মনে হেরে মাধুরী’। যাঁরা কাজ করতে ভালোবাসেন, তাঁরা ঝড়, জল, রোদ, বৃষ্টি সব কিছুকেই উপেক্ষা করতে পারেন। আসলে কাজের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা এই দুই থাকলেই কৃতকর্মের মান উন্নত হয়। তাই সেই সময় প্রায় সবাই বেতারে খুব মজা করে, আনন্দ করে নানা প্রতিকূলতাকে উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে সমাধান করে যা উপস্থান করতেন, তাই হত উৎকৃষ্ট।

আরও পড়ুন:রাজ্যপাল সাংবিধানিক সীমানার বাইরে যাচ্ছেন: সুজন চক্রবর্তী

লাইভ ব্রডকাস্টের সব থেকে বড় সমস্যা হল, সঠিক সময়ে স্টুডিওতে উপস্থিত হওয়া। মহিলামহল মূলত লাইভ ব্রডকাস্ট হত। একবার মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ ভিজে স্টুডিতে এসে উপস্থিত হন বেলাদি। ওই অবস্থায় ঠান্ডা স্টুডিওতে লাইভ করেন আশাপূর্ণা দেবী, বাণী রায়, রাধারাণী দেবী, ড. উমা রায়- এর মতো সাহিত্যিকরা।  সেদিন ছিল মহিলামহলে সাহিত্য সভা।  লাইভ শেষে আশাপূর্ণা দেবী বেলা দে-কে বলেন, ‘বেলা সত্যিই তুমি রেডিওকে ভালবাস, আশীর্বাদ করি আরও বড় হও।’ শুধু নিজের দেরি হওয়া নয়, অতিথিদের দেরিতেও ব্রডকাস্টে সমস্যা হয়।  একবার কানন দেবী নির্ধারিত সময়ের অল্প কিছু আগে এসে উপস্থিত হন। চিন্তায় চিন্তায় বেলা দে অস্থির হয়ে উঠেছেন। এমন সময় হাসি মুখে এক গোলাপের তোড়া হাতে নিয়ে স্টুডিওতে ঢোকেন শিল্পী। তারপর তো সবই যে খুব সহজে উতরে যাওয়া তা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে এমনও হয়েছে, অতিথি এসে পৌঁছতে পারেননি, তখন বেতারের স্টাফেদের মধ্যেই কাউকে নিয়ে শুরু করেছেন মহিলামহল।  বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এসব ব্যাপারে ছিলেন খুবই সাবলীল।  নানা মজার মজার গল্পে ভরিয়ে তুলতেন নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে মহিলামহল।

ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সংগীতশিল্পী পঙ্কজকুমার মল্লিক।

নানা বৈচিত্র ছিল এই অনুষ্ঠানে। ‘কবির মানসী প্রিয়া’ নামের এক ধারাবাহিক উপস্থাপন করেছিলেন বেলাদি। প্রতি মাসে দু’দিন ‘ঘরে বাইরে’ শীর্ষক অনুষ্ঠান সম্প্রচার হত।  দেশ-বিদেশের মেয়েদের কথা, বিশেষ করে গ্রামের মেয়েদের কথা এই অনুষ্ঠানে বারে বারে আলোচিত হয়েছে।  নারী প্রগতির কথা মাথায় রেখেই এই অনুষ্ঠান সাজানো হত বলে জানিয়েছেন বেলা দে।  ইন্দিরা গান্ধী তখন তথ্য ও বেতার মন্ত্রী। এক বিশেষ কারণে তাঁর সঙ্গে আলাপ হতে, তিনি বেলা দে-কে সস্নেহে বলেছিলেন, ‘তুমি তো নেপথ্য সমাজ সেবিকা’।

সমাজকে সুন্দরভাবে এগিয়ে যেতে হলে নারী-পুরুষ দু’জনকেই হাতে হাত রেখে চলতে হবে। সমাজ যদি পাখি হয়, তাহলে তার একটি ডানা স্বাধীন হলে চলবে না। এমন কথার প্রতিফলন আশাপূর্ণা দেবীর ‘সুবর্ণলতা’-য় বারে বারে দেখা গেছে। সেই অর্ধেক আকাশ নিয়ে মহিলামহল আজও আকাশবাণীর প্রচারতরঙ্গে তরঙ্গায়িত হয়। আজকের সাম্প্রতিকতম বহু ঘটনাও উঠে আসে সেই তরঙ্গে। আজও নেপথ্যে থেকে, নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কলকাতা বেতার।  আছে তার মহিলামহল।

ক্রমশ চলবে…

Related Articles

Back to top button
Close