fbpx
অন্যান্যকলকাতাবিনোদনহেডলাইন

নভনীল মেঘে জন্ম যায় অখিলবন্ধুর

অরিজিৎ মৈত্র: বাংলা গানে মেলোডির সম্রাটদের মধ্যে অন্যতম শিল্পী ছিলেন অখিলবন্ধু ঘোষ। অগণিত গান গেয়েছেন এমন কিন্তু নয়, তবে যতটুকু গেয়েছেন, তার মধ্যে বেশিরভাগ গানই শ্রোতাদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। নিয়মিত জলসায় বা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারতেন না কারণ আগেকার কালে নিয়ম ছিল যে সরকারি কর্মীরা নিজেদের বেতন ছাড়া আর অন্য কোনও মাধ্যমকে ব্যবহার করে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন না। অখিলবন্ধু ঘোষ সম্ভবত সেই সময় কলকাতা পৌরসভার কর্মী ছিলেন। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাও অসংখ্য ছিল না।

শিল্পীর জন্ম ১৯২০ সালে। তাঁর শৈশব কেটেছিল মামা কালীদাস গুহর বাড়িতে। সেখানে ছিল সাংগীতিক পরিবেশ। হয়তো সেখানকার সেই সুরমণ্ডলীই তাঁকে সাহায্য করেছিল পরবর্তীকালে একজন গুণী সংগীতশিল্পী হয়ে উঠতে। তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় যে মামা তাঁকে গান গাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। ছোট থেকেই যেকোনও ধরনের গান একবার শুনেই গলায় তুলে নিতেন। দশ বছর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের ‘আমি ভয় করব না, ভয় করব না’- গানটি গেয়ে প্রভূত প্রশংসা অর্জন করেন। সেই সময় শিশুশিল্পী অখিলবন্ধুর রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এই ঘটনার আরও কিছু পরে অখিলবন্ধু ঘোষ তাঁর প্রথাগত সংগীতশিক্ষা শুরু করেন নীরাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। মূলত শাস্ত্রীয়সংগীতশিক্ষার মাধ্যমেই তিনি গান শেখা শুরু করেন। এরপর নীরাপদবাবুর ইচ্ছেতেই তিনি শিল্পী তারাপদ চক্রবর্তী এবং চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে পরবর্তীকালে ভারতীয় মার্গসংগীতের তালিম নেন।

১৯৪৭ সাল অর্থাৎ স্বাধীনতার বছরের জানুয়ারি মাসে কলকাতার মেগাফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গানের রেকর্ড। তাঁর গানের মধ্যে বেশিরভাগ সময় প্রাধান্য পেত রাগাশ্রয়ী বাংলা আধুনিক গান এবং নজরুলগীতি। ভবানীপুরের টার্ফ রোডে থাকার ফলে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, বন্ধু সমরেশ রায়ের সঙ্গে। নিজের কণ্ঠকে গানের উপযোগী করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় শাস্ত্রীয়সংগীতের অনুশীলন করতেন। সেই কারণে নিজের গানে রাগভিত্তিক সুরারোপও করতেন। বাংলা গানের পাশাপাশি তিনি মাঝে-মধ্যে মার্গসংগীত ও ঠুমরী পরিবেশন করতেন অনুষ্ঠানে। তাঁর জনপ্রিয় গানগুলির মধ্যে রয়েছে ‘মায়ামৃগ সম’, ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা’, ‘যেন কিছু মনে কোরোনা’, ‘ওই যে আকাশের গায়’, ‘কেন তুমি বদলে গেছ’, ‘ সারাটা জীবন কী যে পেলাম’, বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজাওনা’ ইত্যাদি।

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘আজি চাঁদনী রাতি গো’- গানটিতে শিল্পী অদ্ভুত মুন্সীয়ানার সঙ্গে রাগসংগীতকে যুক্ত করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তাঁর বেশিরভাগ গানেই শিল্পী নিজেই সুরারোপ করেছিলেন। কয়েকটি গানে অখিলবন্ধু ঘোষের স্ত্রীও সুরারোপ করেন। বিখ্যাত সুরকার অনুপম ঘটকের সুরে আরও একটি রাগাশ্রয়ী আধুনিক গান ‘এই চৈতি গোধুলী যায় ফিরে যায়’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল । এক সাক্ষাৎকারে অখিলবন্ধু জানিয়েছিলেন তাঁর গানের অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা মনিবালা ঘোষ। মায়ের স্মরণে তিনি গেয়েছিলেন, ‘এমনি দিনে মা যে আমার হারিয়ে গেছে ধরার পরে’।

আজকের দিনে কিন্তু ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল বর্তমান প্রজন্মের মানুষেরা তাঁর গানের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানেন না। দোষটা তাঁদের নয় কারণ বর্তমানে আকাশবাণী ছাড়া আর কোথাও তাঁর গান প্রায় একদম শোনা যায় না বললেই হয়। এক সময় আকাশবাণীতেও তিনি আধুনিক বাংলা গান ছাড়াও খেয়াল এবং ঠুমরীর অনেক অনুষ্ঠান করেছেন।

আরও দুঃখের বিষয় হল যে এমন একজন শিল্পীর জন্মশতবর্ষেও সবাই নীরব। শুধু স্যোশাল মিডিয়াতে কয়েকটি ব্যক্তিগত পোস্টে বাংলা গানের অন্যতম এই শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পীকে স্মরণ করা হয়েছে । এছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। সরকারি উদ্যোগও নেই। আগামী বছরে শিল্পীর জন্মদিনের আগে যদি সংগীতপ্রেমীরা তাঁকে মনে রেখে কিছু আয়োজন করেন, তবে শ্রোতা এবং বর্তমান প্রজন্ম অখিলবন্ধুর শিল্পীসত্ত্বার বিষয়ে কিছু জানতে পারবেন। অবশ্য এখন সবটাই নির্ভর করছে প্যান্ডামিকের গতিবিধির ওপর।

Related Articles

Back to top button
Close