fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

লকডাউনে বিপন্ন সবংয়ের খড়িয়ালরা, অন্ধকারের কবলে তাঁদের শিল্পীসত্তা

শান্তনু অধিকারী, সবং: ছিলেন খড়িশিল্পী। পেটের দায়ে হয়েছিলেন বাঁশের শিল্পী। লকডাউনের জেরে সেই রূপান্তরিত শিল্পীসত্তাও আজ প্রবল সংকটে। সবংয়ের ১০নং অঞ্চলের শ্যামসুন্দরপুর, ৪নং অঞ্চলের দশগ্রাম, মশাগ্রাম, খাউখাণ্ডার শ’দুয়েক খড়িশিল্পী পরিবার আজ দিন কাটাচ্ছেন কার্যত অনিশ্চয়তায়। লকডাউন-উত্তর পর্বে কীভাবে কাটবে জীবন, কীভাবে টিকবে তাঁদের শিল্পের ঐতিহ্য, তা ভেবেই আজ তাঁরা রীতিমতো দিশাহারা। তাঁদের কোণঠাসা জীবনে আজ কেবলই ঠাসা অন্ধকার।

আসলে সৌভাগ্য কোনও কালেই ওঁদের সঙ্গে ছিল না। চিরদিনই অপুষ্টি, অনুন্নয়ন আর অশিক্ষাকে সঙ্গে নিয়েই তাঁদের পথচলা। ঘরে ঘরে স্কুলছুট। আর অল্পবয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার রীতি। তবুও ওঁরা শিল্পী। জাতিতে খড়িয়াল। যদিও সরকারের খাতায় এঁরা ‘খায়রা’ হিসেবে স্বীকৃত। ‘শিল্পী-গোষ্ঠী’ হিসেবে এঁদের আখ্যায়িত করেছিলেন স্বয়ং তারাপদ সাঁতরা। এই অখ্যাত, অজ্ঞাত জাতিটিকে তিনি প্রথম পেয়েছিলেন সবংয়ের দশগ্রাম ও শ্যামসুন্দরপুর এলাকায়। পরবর্তীকালে মশাগ্রাম, খাউখাণ্ডাতেও ছড়িয়ে পড়ে এঁদের বসবাস। বর্তমানে সবংয়ে এই জাতির প্রায় এক হাজার মানুষের বসবাস।

একসময় এঁদের জীবন ও জীবিকা ছিল পুরোপুরি খড়ি-কেন্দ্রিক। খড়ি কাঠি দিয়ে বানাতেন ঝুড়ি, টুলা, গরুর মুখ-পালি, লক্ষ্মী-পালি প্রভৃতি। শিল্পের দিক থেকে যেগুলি ছিল সৌখিন ও খুবই উৎকৃষ্ট মানের। খড়িয়ালদের বানানো দ্রব্য নিয়ে যেত পাইকাররা। কখনও কখনও শিল্পীরা নিজেরাই বেচার জন্য পাড়ি দিতেন ভিন্ জেলায়। কিন্তু ক্রমশ মাত্রা ছাড়াল কাঁচামালের সংকট। রুটিরুজিতে পড়ল প্রবল ভাঁটার টান। আসলে পূর্বে এঁরা খড়ির জোগান পেতেন মূলত পটাশপুর ব্লকের আড়গোড়া, অযোধ্যাপুর প্রভৃতি এলাকা থেকে। কিন্তু ওই সকল এলাকার খড়িচাষীরা অধিক লাভের আশায় ক্রমশ মেতে ওঠেন বিকল্প চাষে। দু’একজন খড়িচাষ ধরে রাখলেও খড়ির যে দর হাঁকতেন, তাতে এখানকার খড়ি শিল্পীদের সম্ভব ছিল না খড়ি কেনার।

আরও পড়ুন: ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক

এদের পুঁজির সংকটও চিরকালীন। বছর বারো পূর্বে এই সমস্যার সমাধানে একটি সমবায় সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়ে। ব্যাঙ্কও তাঁদের এই শিল্পের জন্য লোন দেয় না। ফলে খড়ি শিল্পের চাহিদা থাকলেও যোগান দেওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ক্রমশ ঝুঁকেছিলেন বাঁশের ঝুড়ি তৈরির কাজে। তবে সেখানেও স্বস্তি মেলেনি তাঁদের। একটি বাঁশ কিনতে পড়ে প্রায় পঞ্চাশ টাকা। সেই বাঁশ থেকে বোনা যায় মাত্র দুটি ঝুড়ি। এক জোড়া ঝুড়ির বাজার মূল্য ৭০-৭৫ টাকা। অর্থাৎ মজুরি ধরলে এখানেও লাভ পান না শিল্পীরা। এঁরা সরকারি, অসরকারি কোনও হস্তশিল্প মেলাতেই ডাক পান না। খবর রাখেন না কারুশিল্প প্রতিযোগিতারও।

কিন্তু লকডাউনের জেরে স্তব্ধ তাঁদের বাঁশের কাজটুকুও। সপ্তাহে তিন-চার জোড়া ঝুড়ি বেচে সংসারের খরচটুকু সামলে নেওয়ার উপায়ও আজ তাঁদের নেই। উপার্জনের চেনা রাস্তাটিতেই তালা মেরেছে লকডাউন। ফলে শিল্পী হয়েও দিনমজুরিই আজ তাঁদের বৃত্তি। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই। কারণ, এবারের বেহাল বোরো চাষে মজুরের চাহিদাও বলতে গেলে তলানিতে। যাঁদের যেটুকু চাষ রয়েছে, প্রায় সকলেই মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। লকডাউনের কারণে এনরেগা প্রকল্পেও এখন আর তেমন কাজ নেই। ফলে রীতিমতো বিপন্ন আজ সবংয়ের খড়িয়ালরা।

শ্যামসুন্দরপুরের দুলাল নায়েক, রাধারানি মাজী, দশগ্রামের গোলক মাজি, অশ্বিনী গিরি, খাউখাণ্ডার অনিমেষ পাত্র, নিরঞ্জন পাত্র প্রমুখ সকল খড়িশিল্পীরাই মানছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাদে সুপ্রাচীন খড়িশিল্পের পুনরুজ্জীবন কখনোই সম্ভব নয়। সেই পৃষ্ঠপোষকতাও যে কোনও দিন মিলতে পারে, তেমন আশাও এঁরা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। ফলে প্রায় বিলুপ্তই সবংয়ের খড়িশিল্প। বর্তমানের বাঁশের শিল্পটিও বাঁচবে কিনা, ঘোরতর সংশয়ের মধ্যেই রয়েছেন এঁরা। কারণ, লকডাউন উঠে গেলেও বাঁশজাত পন্যের চাহিদা কি আর থাকবে? সেই আশঙ্কায় রীতিমতো অস্থির সবংয়ের সমগ্র খড়িয়াল সমাজ।

শিল্পী নিরঞ্জন পাত্র আক্ষেপ করে বললেন, ‘একদিন খড়িশিল্পী ছিলাম। হলাম বাঁশের শিল্পী। পেটের তাগিদে এবার শুধু মজুর হয়েই বোধহয় বাঁচতে হবে।’ অনিমেষ পাত্র বললেন, ‘এমনিতেই নিঃস্ব ছিলাম। এই লকডাউনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হল।’ সম্প্রতি কেন্দ্রসরকার বর্তমান সংকটের মোকাবিলায় অনেক আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ক্ষুদ্র ও কুটীর শিল্পের জন্যও রয়েছে পৃথক ঘোষণা। সবংয়ের খড়িয়ালরা জানেন, এই প্যাকেজের দুনিয়ায় তাঁদের কোনও দেশ নেই! ফলে তারাপদ সাঁতরার চিহ্নিত এই শিল্পীরা আজ কার্যত দুর্ভাগ্যের ‘কোমা’য়! জীবনের সরণীতে ফেরার লড়াইটা আজ তাঁদের কাছে সত্যিই কঠিনতর।

Related Articles

Back to top button
Close