fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

বিল্ডিং তৈরি হলেও বসেনি মেশিন, দুর্গাপুর ব্যারেজের ‘স্কাডা’ তৈরির কাজ বিশবাঁও জলে

জয়দেব লাহা, দুর্গাপুর: কন্ট্রোলরুমের বিল্ডিং তৈরি। নজরকাড়ছে নীল আকাশি রং। বসেনি শুধু মেশিন। বছর ঘুরলেও চালুই হল না দুর্গাপুর ব্যারেজের অটোমেশিন পদ্ধতির কাজ। দ্বিতীবার লকগেট বিপর্যয়ে আবারও বড়সড় প্রশ্নের মুখে যখন লকগেটের ম্যানুয়াল কাজকর্মে। তখন বিশ বাঁও জলে দুর্গাপুর ব্যারেজের সুপারভিশন কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশেন অর্থাৎ ‘স্কাডা’র কাজ।

প্রসঙ্গত, ১৯৫৫ সালে দামোদর নদের ওপট দুর্গাপুর ব্যারেজটি তৈরি হয়। মূল উদ্দেশ্য, দুর্গাপুরে শিল্পের জলের চাহিদা মেটানো। তার সঙ্গে সেচের জল। জানা গেছে, ব্যারেজের ওপর নির্ভরশীল ৮ লক্ষ ২০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি। ব্যারেজের মুল সেচখাল দুটি। উত্তরপ্রান্তে রয়েছে ১৩৬. ৬ কিমি, দক্ষিণপ্রান্তে রয়েছে ৮৮.৫ কিমি। প্রধান ও শাখা সেচখাল বা ক্যানেল রয়েছে ২৪৯৪ কিমি।

উল্লেখ্য, দক্ষিণপ্রান্তের সেচক্যানেলে সাইফোনিং সিস্টেম ছিল। তাতে ওই ক্যানেল দিয়ে বর্ষায় যেমন জল ঢুকত ব্যারেজে। তেমনই শীতকালিন চাষে জল ছাড়া হত ওই ক্যানেলে। তবে বর্তমানে ওই সিস্টেম কার্যত অকেজো। কারণ গত ২০ বছর ধরে বর্ষার ধারাবাহিকতা বদলেছে। তার আগে অতিবৃষ্টিপাতের ফলে যেভাবে জল ছাড়া হত। তাতে জলস্রোতের সঙ্গে পলি, নুড়ি, কাঁকর বেরিয়ে পড়ত। কিন্তু সেই বৃষ্টির ধারাবাহিকতা নেই। ফলে, দামোদরের উপরিভাগ থেকে জলস্রোতে পলি, নুড়ি, কাঁকর আসলেও সেসব আটকে পড়ে ব্যারেজে। ফলে জমতে থাকে পলি। বর্তমানে পলি পড়ে নাবত্যা কমেছে ব্যারেজের।

দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে কৃষিকাজে সেচের জন্য বছরে জল প্রয়োজন সাড়ে ৪ লক্ষ একরফুট। আগামীদিনে যেভাবে নগরায়ণ বাড়ছে, তাতে আরও জলের প্রয়োজন। এছাড়াও রয়েছে শিল্পায়ন। আসানসোল-দুর্গাপুর, রানীগঞ্জ, জামুড়িয়া, কাঁকসা, পানাগড় ও বড়াজোড়া শিল্পতালুক ব্যারেজের জলের ওপর নীর্ভরশীল। এছাড়াও রয়েছে ওইসব শিল্পাঞ্চলের মেজিয়া, অন্ডাল, ডিটিপিএস, ডিপিএলসহ ৫ টি গুরুত্বপুর্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেগুলি ব্যারেজের জল না পেলে মুখ থুবড়ে পড়বে। ব্যারেজের পলি সংস্কারের জন্য একাধিকবার লোকসভার স্ট্যান্ডিং কমিটি (নদী বিষয়ক) পরিদর্শনে এসেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। ৯০ দশকে গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানে দামোদরের পলি সংস্কার ধরা হয়েছিল। এমনকী তাতে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। তার জন্য ক্রেন ও বার্জও আনা হয়। কিন্তু সেই টাকা মাঝ পথে ফিরে যায়। ২০০৮ সালে ডিভিসি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছিল। তাতে ড্রেজিং হওয়া পলি বালি রাখার জমির জন্য আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের(এডিডিএ) কাছে আবেদন করেছিল। ওইসমস্ত পলি, বালি ইসিএলের পরিত্যাক্ত খনি ভরাটের জন্য চিন্তাভাবনা নেওয়া হয়েছিল। সেটাও মাঝ পথে থমকে যায়। যতদিন যায় ততই সঙ্কটে পড়ে দামোদর। একদিকে যেমন দামোদর উপকুলবর্তী এলাকায় বর্ষায় বৃষ্টিপাত কমতে থাকে। তেমনই জমতে থাকে পলি। আর অন্যদিকে পলি সংস্কার নিয়ে শুরু হয় কেন্দ্র রাজ্য চাপান-উতোর। মাঝপথে দুর্ভোগে পড়ে রাজ্যের কৃষকরা।

তার সঙ্গে গোঁদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মত হয়ে ওঠে লকগেট বিপর্যয়। গত ২০১৭ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে দুর্গাপুর ব্যারেজের ১ নং লকগেট চ্যানেল থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় বিপত্তি ঘটে। তাতে প্রায় ৪-৫ দিন চরম জলসঙ্কটে দুর্ভোগে পড়ে শিল্পাঞ্চলবাসী। তখন, প্রশ্ন ওঠে ব্যারেজের রক্ষণাবেক্ষণে। প্রায় ৬৫ বছরের পুরোনো ব্যারেজ। সিমেন্ট, পাথরের তৈরি যেমন পিলার। তেমনই লোহা-ইস্পাতের তৈরি লকগেট। জলের মধ্যে ডুবে থাকা লকগেট রং, মোবিল তেল দিয়ে যেমন দেখভালের জন্য ফ্লোটিং গেট রয়েছে। কিন্তু লকগেট বিপর্যয়ে দেখভাল নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন ওঠে। বিগত বছরগুলিতে ব্যারেজের ওপর নীলসাদা রং ছাড়া দেখভাল না হওয়ার আরও প্রমাণ করল চলতি বছরের সম্প্রতি লকেগেট বিপর্যয়। তবে এবার ব্যারেজের গভীরতম চ্যানেলের ৩১ নং লকগেট। বিপর্যস্ত লকগেট সিল করে স্বাভাবিক জল পরিষেবা করতে সময় লাগল প্রায় সাতদিন। কার্যত ল্যাজে গোবোরে অবস্থা সেচদফতরের কর্মীদের। আর জলকষ্টে কাতর গোটা শিল্পশহরবাসীর।

কংগ্রেসের পশ্চিম বর্ধমান জেলা সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তী জানান,” সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে আধুনিকীকরণ দরকার ব্যারেজের। তা না হলে আগামীদিনে হয়তো আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে শিল্পাঞ্চলকে।” যদিও ২০১৭ সালে দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যারেজের সার্ভে হয়। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী ১১টি দুর্বল লকগেট বদল ও বাকি গুলো সংস্কার করার জন্য ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। এছাড়াও লকগেট ওঠানামানো জল সঠিক পরিমাপে ছাড়া এসব অটোমেশিন পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ আধুনিকীকরণের। তার জন্য সাড়ে চার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। প্রজেক্টের নাম সুপারভিশন কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশেন অর্থাৎ ‘স্কাডা’।

কি থাকবে ওই স্কাডায়। রাজ্য সেচ দফতরের সচিব গৌতম চট্টোপাধ্যায় বলেন,” কম্পিউটারাইজ মনিটারিং সিস্টেম। জল কতটা ছাড়া হচ্ছে হবে। লকগেট কতটা তোলা হবে সবই ওই কন্ট্রোলরুম থেকে মনিটারিং করা হবে কম্পিউটার মাধ্যমে। সেইমত ওঠানামা হবে লকগেট। তার জন্য লকগেট সেনসার বসানো থাকবে। কাজ শুরু হয়ে গেছে। মেশিনারি কাজ চলছে।” জানা গেছে, ব্যারেজের জলের সমস্ত রকম ডাটা ওই কন্ট্রোলরুম থাকবে।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানে নারীদের সুরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর: মানবাধিকার কর্মী মাসুদ খান

তবে ওই মেশিন অপারেট প্রসঙ্গে গৌতমবাবু বলেন,” মেশিন যে সংস্থা বসানোর বরাত পেয়েছে। ওই সংস্থা ৪-৫ বছর এখানে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবে।’ ২০১৯ সাল থেকে স্কাডার কাজও শুরু হয়। ব্যারেজের একপ্রান্তে তৈরি কন্ট্রোলরুম। প্রশ্ন, স্কাডার কাজের গতি প্রকৃতিতে। বছর ঘুরলেও বিল্ডিং ছাড় কিছুই হয়নি। এখনও স্কাডার কাজই চালু হতে বিশ বাঁও জলে। দুর্গাপুর সেচ দফতরের ইঞ্জিনিয়ার জয়ন্ত দাস বলেন,” কাজ চলছে। আগামী বছর স্কাডা’ র নির্মাণ কাজ শেষ হবে।”

Related Articles

Back to top button
Close