fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

ভবঘুরেদের পাশে অ্যাম্বুলেন্স, ছোটো গাড়ির চালক ও মালিকরা

অমিত দাস, নদিয়া: বিপদের সময় আমরা নিজেদেরকে নিয়েই বেশি ভাবি। বিপদ কিভাবে কাটিয়ে উঠব সেকথা ভেবেই আমরা প্রত্যেকে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু এমন মানুষও আছে যারা বিপদের সময় নিজেদের পাশাপাশি অসহায় মানুষের কথাও ভাবে। কোভিড ১৯ এর সংক্রমণে লকডাউন দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। একইভাবে বেড়ে চলেছে সংক্রমণের হার। জনজীবন কবে স্বাভাবিক হবে তা কেউ জানে না। এই অবস্থায় কমবেশি প্রায় সকলেই সরকারি সাহায্য পাচ্ছে। চাল , গম , আলু বিতরণ করছে বেশকিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। কিন্তু সেইসব মানুষদের কথা কি কেউ ভাবে , যারা ভবঘুরে , দুঃস্থ , যাদের খাবার জোগাড় হয় অন্য কারোর দয়া দাক্ষিণ্যে। এদের তেমন কোনও ঘর নেই , নেই বাসস্থান। সারাদিন এর ওর দোকানে ঘুরে ঘুরে যা পায় তাই দিয়েই পেট ভরায়। রাত কাটে ফুটপাতে , দোকানের বারান্দায়।

এদের কথা ভেবেই এগিয়ে এসেছে কিছু সহৃদয় মানুষ। এরা কেউ অ্যাম্বুলেন্সের চালক , কেউ ছোটো গাড়ির চালক , কেউ গাড়ির মালিক। করিমপুর গ্রামীন হাসপাতালের এক পাশে গেলেই দেখা যাবে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স , ছোটো গাড়ি। তার পাশেই রয়েছে সরকারি বিশুদ্ধ জলের প্লান্ট। এখান থেকেই শুরু হয় এই সহৃদয় মানুষগুলোর অভিযান। হঠাৎ মাথায় আসে এলাকার ভবঘুরে অসহায় দুঃস্থ মানুষদের কথা। এদের না আছে চাল না আছে চুলো। লকডাউনের অবস্থায় কিভাবে থাকবে এরা ? কারন কদিন বাজার ঘাট বন্ধ থাকলেই তো এরা না খেয়ে থাকে। এতদিন লকডাউন হলে এরা না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

সিদ্ধান্ত হয় এই অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর। সবাই বেরিয়ে পড়ে যে যার মতো ব্যবস্থা করতে। লকডাউনে গাড়িঘোড়া সব বন্ধ। হাসপাতালে অন্য রোগীও আসছে কম। তাই এমতাবস্থায় নিজেদের রোজগারও প্রায় বন্ধ। তবুও কোথাও একটা মানবিকতা বোধ , দায়িত্ববোধ টেনে আনে এসব মানুষদের। নিজেদের মতো সাহায্য করেন। তারপর এলাকায় ঘুরে ঘুরে যেখানে যেটুকু সাহায্য জোগাড় করা যায় , তাই দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন এমন ভবঘুরে ও দুঃস্থ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন খাবারের প্যাকেট ও জলের বোতল।

আরও পড়ুন: মুখ্যমন্ত্রীর নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিকর মন্তব্য, তদন্তে গিয়ে আক্রান্ত ২ পুলিশকর্মী

হাসপাতালের পাশেই জলের প্লান্টের কাছেই রান্না করা হয় প্রতিদিনের খাবার। সেখানেই তৈরি হয় অস্থায়ী রান্নার জায়গা। ত্রিপল টাঙিয়ে শুরু হয়ে যায় রোজকার রান্নাবান্না। তারপর সবাই মিলে হাতে হাতে খাবার প্যাকেট করা। প্যাকেট করা শেষ হলে প্রত্যেকে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বেরিয়ে পড়েন সেগুলো বিতরণ করতে। এখানে যে যার মতো কাজ সামলান। প্রত্যেকে গাড়িতে প্যাকেট ভর্তি খাবার নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এলাকার মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে এই কাজ তারা করে চলেছেন রোজ। লকডাউন যতদিন চলবে ততদিন চলবে তাদের খাবার বিতরণ।

এই দলে রয়েছে যেমন গাড়ির চালক , তেমনই রয়েছে গাড়ির মালিকও। এদের মধ্যে রয়েছেন সৌরভ পাল , অভিজিৎ অধিকারী , শ্যামা প্রসাদ সরকার , সুব্রত শীল (ছোটন) , শ্যামল মন্ডল ও আরও অনেকে। এলাকার মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন ভবঘুরে ও দুঃস্থ মানুষদের খাওয়ানোর যে গুরু দায়িত্ব এই মানুষগুলো নিজেদের কাঁধে নিয়েছেন তার জন্য এরা সত্যিই প্রশংসা পাবার যোগ্য। এই দলের অন্যতম সদস্য সৌরভ পাল বলেন , ‘ এলাকায় এমন কিছু ভবঘুরে , দুঃস্থ মানুষজন রয়েছে তারা এই লকডাউনে সত্যিই কষ্টে আছে। এদের তো সংস্থান নেই। দিলে খাবার পায় , না দিলে পায় না। তাই আমরা যতটুকু পারি সাহায্যের জন্য চেষ্টা করছি। তবে এলাকার মানুষের সাহায্য পাচ্ছি। এত দায়িত্বপূর্ণ কাজ করতে পেরে ভালো লাগছে ‘।

লকডাউনে যখন নিজের সংস্থানের ঠিক বেহাল অবস্থা , তখন এই মানুষগুলোর দায়িত্ববোধ প্রমান করেছে বর্তমান জটিল রাজনৈতিক , সামাজিক আবহে সত্যিই মানবিকতা বেঁচে আছে। বেঁচে আছে বুকের মধ্যে বাসা বেঁধে থাকা নতুন আলোকময় জগতের হাতছানি। এই অসুস্থ পৃথিবী কবে সুস্থ সতেজ হয়ে নিজের প্রাণ ফিরে পাবে তা আমরা কেউই জানি না। তবে এই মানুষগুলোর মানবিক সাহায্য , দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস আমাদের জানিয়ে দিয়ে যায় আজও মানুষ মানুষের জন্য।

Related Articles

Back to top button
Close