fbpx
কলকাতাহেডলাইন

সাত সাগরের জল বোতলবন্দি করে রেড ইন্ডিয়ানদের স্মৃতিতে বুঁদ বৃদ্ধ নাবিক

শরণানন্দ দাস, কলকাতা: আজব শহর কলকাতা, আনাচে কানাচে ঠিকভাবে খোঁজা গেলে হয়তো বাঘের দুধও পাওয়া যাবে। কেউ বিশ্বাস করবেন সাত সমুদ্রের জল রয়েছে এই শহরেই! চোখ কপালে উঠলেও ঘটনাটা সত্যি। গড়িয়ায় আশি বছরের তরুণ প্রাক্তন নাবিক মিহির সেন বোতলবন্দি করে রেখেছেন সাত মহাসমুদ্রের জল, আর কমপক্ষে ২৫ টি সাগর, খাঁড়ির জল। আর তাঁর স্মৃতি জুড়ে রেড ইন্ডিয়ানদের রোজ নামচা।

বৃহস্পতিবার সকালে স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন মিহির সেন। বৃদ্ধ বলেন, ‘ ১৯৫৯ সালে ফিটারের ট্রেনিং নিয়ে যোগ দিলাম ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানি ব্যাঙ্ক লাইনে। প্রথম ট্রিপ ছিল কলোম্বো থেকে ইংলণ্ড। প্রথম ট্রিপ শেষ করে ফিরলাম ১৪ মাস পরে। এরপর যখন দ্বিতীয় ট্রিপে গেলাম মাথায় অদ্ভুত একটা নেশা চাপলো। ভাবলাম পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরের জল সংগ্রহ করবো। ক্যাপ্টেনকে বলতেই তিনি সদ‌্য শেষ করা ভদকার একটি বোতল দিলেন। বোতলটা ভালো করে পরিষ্কার করে শুরু করলাম কাজ। আটলান্টিক দিয়ে শুরু করলাম, তারপর প্যাসিফিক, ইণ্ডিয়ান ওশান, আর্কটিক, আর সবশেষে আন্টার্ক্টিক ওশান। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত চললো এই সংগ্রহ। আরও যেসব সাগর, চ্যানেলের জল সংগ্রহ করেছি সেগুলো হল – বে অফ বেঙ্গল, আরাবিয়ান সি, রেড সি, ক্যারাবিয়ান সি, ব্ল্যাক সি, ডেভিল সি,,, আর কতো বলবো।’

পরম যত্নে এতোবছর ধরে যত্নে রাখা বোতলটিতে হাত বোলাতে বোলাতে তিনি বলেন, ‘ সমুদ্রে যখন হ্যারিকেন বা সাইক্লোন হতো জাহাজটা দেশলাইয়ের বাক্সের মতো নাচতো। আমি তখন এই বোতলটাকে কম্বলে পেঁচিয়ে বুকে জড়িয়ে রাখতাম।’ তারপর স্মিত হেসে বলেন, ‘ সমুদ্র কখনও ভয়ঙ্কর হয় না যদি না হাওয়া বা ঝড় তাকে সঙ্গ দেয়। তবে ঈশ্বরের নাম জপতাম ডেভিলস সি পেরোবার সময় । আকাশের বিমান বা বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু জাহাজের সলিল সমাধি ঘটেছে এখানে। শান্ত আবহাওয়াতেই এইসব কাণ্ড ঘটতো। কারণ একটা অবশ্য রয়েছে, এই মৃত্যু সমুদ্রের নিচে তৈরি হতো মিথাইল হাইড্রেট যা বড়ো জাহাজকে গিলে নিতে পারে। আর ভয় ছিল ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির।’

আরও পড়ুন: নেই প্রিয়দা, এবার চলে গেলেন সোমেনও…’প্রিয় বন্ধু’র স্মৃতিচারণায় সুব্রত মুখার্জি

একটু থেমে বৃদ্ধ বলেন, ‘ এখনও রাত গভীর হলে রেড ইন্ডিয়ানদের কথা খুব মনে পড়ে। কলম্বো থেকে যখন আমরা দক্ষিণ আমেরিকার বালকাইসু বন্দরে যেতাম তখন আইস চ্যানেল পার হতে হতো।রাতের অন্ধকারে আইস চ্যানেলে জাহাজ নোঙর করা হতো। তখন ওই রেড ইন্ডিয়ানরা নৌকো করে জাহাজের কাছে আসতো। আমরা ওদের খাবার দিতাম। আমরা কেউ কারও ভাষা না বুঝলেও অসুবিধা হতো না। আকার ইঙ্গিতে ভাব বিনিময় হতো। প্রতিবারই দেখা হতো, একটা অদ্ভুত বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। আর পাপুয়া নিউগিনিতে যখন যেতাম সেখানকার উপজাতিরাও আসতো। ওদের পরনে থাকতো গাছের পাতার পোশাক। ওদেরও আমরা খাবার দাবার দিতাম। আশ্চর্য এক মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম। প্রতিবার যখন যেতাম মনে হতো দেখা হবে আবার। এখনও মনে পড়ে ওদের। মনে মনে বলি ভালো থেকো তোমরা।’ গুপি বাঘা সত্যি কথাই বলেছিল, কতো কি শেখার, কত কি জানার। আর বিলম্ব নয়, নয়, আর বিলম্ব নয়। এখনও আছে সময়।

Related Articles

Back to top button
Close