fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

দঙ্গলবাজ জঙ্গী পঙ্গপালের দাঙ্গা হাঙ্গামায় ‘অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ’ রঙ্গহীন

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : ‘সঙ্গে নিতে হবে কুড়ুল, কোদাল, ঝাঁটা, ঝুড়ি। আর নেব ভিঙ্গি মেথরকে। এবার পঙ্গপাল এসে বড়ো ক্ষতি করেছে। ক্ষিতিবাবুর ক্ষেতে একটি ঘাস নেই। অক্ষয়বাবুর বাগানে কপির পাতাগুলো খেয়ে সাঙ্গ করে দিয়েছে। পঙ্গপাল না তাড়াতে পারলে এবার কাজে ভঙ্গ দিতে হবে। ঈশান বাবু ইঙ্গিতে বলেছেন, তিনি কিছু দান করবেন’- ছোটবেলায় এই লেখা পড়েননি, এমন বাঙালি নেই। কবিগুরুর লেখা দ্বিতীয় শ্রেণীর ‘সহজপাঠ’ এর সেই সহজ সরল ভাষায় লেখা পঙ্গপালের কাহিনী আজ সত্যিকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে খোদ নন্দলাল বসু এঁকেছিলেন পঙ্গপালের ছবি।

পতঙ্গবিশেষের দল বা বড় ফড়িংকে ‘পঙ্গপাল’ বলে। মহাজনতা বা বহু লোক সমাগমকেও বলে ‘পঙ্গপাল’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “ইহারা দল বাঁধিয়া উড়িয়া আসে এবং শষ্যাদি যাহাতে বসে, তাহা খাইয়া নিঃশেষ করে। বস্তুতঃ পঙ্গপাল নাম নহে, দলবদ্ধ থাকে বলিয়া ইহারা ঐ নামে খ্যাত”। রঙ্গলাল বসু লিখেছেন, ‘যেন পঙ্গপালদল, ছাইল সকল স্থল’।

সংস্কৃত শব্দ ‘পতঙ্গ’ থেকে প্রাকৃত ‘পঅংগ’ হয়ে ‘পঙ্গ’ এসেছে। আর সংস্কৃত শব্দ ‘পালি’ অর্থে ‘পঙক্তি’ বোঝায়। দুয়ে মিলে ‘পঙ্গপাল’। সংস্কৃতে একে ‘শলভ’ বলে। ‘শলভী সম্মীল্য যাতি’। আসলে বহু মিলে একসাথে ওড়ে বলে এরকম নাম। ‘অমরকোষ টীকা’তে আছে “অতিবৃষ্টিরনাবৃষ্টিঃ শলভা মূষিকাঃ খগাঃ। প্রত্যাসন্নাশ্চ রাজানঃ ষড়েতে ঈতয়ঃ স্মৃতাঃ”।

Acrididae পরিবারের অন্তর্গত ‘পঙ্গপাল’ হোলো ঋজুপত্রী শষ্যভোজী পতঙ্গ বিশেষ। বাংলাতে ‘চতুষ্পদ পশুর পাল’ বলা যায়। কিন্তু পাখি কিংবা ফড়িংয়ের পাল বলা যায় না। ইংরেজি ‘Locust’ বা ‘পঙ্গপাল’ শব্দটি এসেছে  Vulgar Latin শব্দ  LOCUSTA  (লোকাস্টা) থেকে। যার অর্থ লবস্টার (Lobster) বা লোকাস্ট।

আরও পড়ুন: বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সবুজ স্মরণ কোলাঘাটে

অনেক ধরনের পঙ্গপাল রয়েছে। যেমন ডেজার্ট লোকাস্ট বা স্কিসটোসেরসা গ্রেগরিয়া, গার্ডেন লোকাস্ট বা অ্যাকান্থাক্রিস রুফিকরনিস ( এঁদের বাসস্থান ঘানা ), মাইগ্রেটরি লোকাস্ট বা লোকাস্টা মাইগ্রেটোরিয়া বা ঘাস ফড়িং ইত্যাদি। এছাড়াও আছে স্কিসটোসেরসা প্যারানেনসিস, লোকাস্টানা পারডালিনা, মেলানোপ্লু স্প্রিটাস, লোকাস্টা ড্যানিকা ইত্যাদি। প্রত্যেকের আকৃতি প্রকৃতি ভিন্ন রকম।

মহাভারত, ইলিয়ড, বাইবেল এবং কোরানেও পঙ্গপালের উল্লেখ রয়েছে। পঙ্গপালের দল ফসল ধ্বংস করে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছে, যার ফলে মানুষ পরিযায়ী হয়েছে। প্রাচীন মিশরীয়রা তাঁদের কবরে এই পঙ্গপালদের ছবি এঁকেছিল। পঙ্গপালের এহেন উৎপাত বিষয়ে প্রাচীন মিশরের একটি বর্ণনায় মেলে – ‘ঈশ্বর আমাদের দেশের ওপর দিয়ে সারাদিন সারারাত পূর্ব দিক থেকে হু হু করে বাতাস পাঠালেন। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব দিকে দেখা মিললো অসংখ্য পঙ্গপালের। তাঁরা দেশের সর্বত্র ঘিরে ফেললো। যেন সারা পৃথিবী ঢাকা পড়লো। গোটা দেশ অন্ধকারে আচ্ছন্ন তখন। দেশের যেখানে যেখানে লতাপাতা, শাক-সব্জি, গাছপালা ছিল, তার সবই খেয়ে শেষ করে ফেললো পঙ্গপালের দল। মিশর জুড়ে আর কোথাও একটুও সবুজের লেশমাত্র থাকলোনা’।

পঙ্গপালের আক্রমনের ইতিহাস বেশ ভয়ঙ্কর। ১৯২৫ সালে মিশরে পঙ্গপালের আক্রমণ হয়। কিন্তু উদ্ভিদবিদ ও কীটতত্ত্ববিদদের সমবেত প্রচেষ্টায় মিশর সে যাত্রায় অনেকটা বেঁচে গিয়েছিল। ১৯২৬ সালে একমাত্র উত্তর ককেশাস প্রদেশেই প্রায় ৮০ হাজার একর জমির গম, ভুট্টা, বজরা ইত্যাদি শস্য পঙ্গপাল খেয়ে ফাঁকা করে দিয়েছিলো। তেমনি বাঁচতে পারেনি প্যালেস্টাইনও। ১৯২৮ সালে ডানাশূন্য অপরিণত বয়স্ক পঙ্গপালের আক্রমণে দেশটা প্রায় শ্মশানের রূপ নিয়েছিল।

এঁরা সাধারণত একা একাই থাকে। সেই সময় এঁরা খুব নিরীহ। কিন্তু বিশেষ অবস্থায় তাঁরা একত্রে জড়ো হয়। তখন তাঁদের আচরণ ও অভ্যাস পরিবর্তিত হয়ে সঙ্গমে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানিদের মতে, এঁদের মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া ‘সেরোটোনিন’ নামে একপ্রকার নিউরোট্রান্সমিটার এঁদের স্বভাব বদলে দেয়। আর তখনই শুরু হয় এঁদের প্রজনন। তখন পুরুষ পঙ্গপাল প্রথমে তিনবার ‘চিড়িক চিড়িক’ শব্দ করে। তা শুনে স্ত্রী পঙ্গপালও ঐ রকম শব্দ করে। এভাবে কিছুক্ষন চলার পর তাঁরা বিশেষ উপায়ে মিলিত হয়। পঙ্গপাল এবং ঘাস ফড়িংয়ের মধ্যে কোন পার্থক্যগত শ্রেণীবিভাগ নেই। বিশেষ অবস্থায় তাঁদের প্রজাতিরা একত্র হওয়ার যে প্রবণতা দেখায়, সেটাই মূল পার্থক্য। এক একটি পঙ্গপাল ১০০ টি সন্তানের জন্ম দিতে পারে। যেন মহাভারতের ‘গান্ধারী জননী’! মাত্র তিনমাসের মধ্যে এঁদের দলের সংখ্যা ২০ গুন বেড়ে যায়। তবে কিন্তু দলবদ্ধ হলেই ভয়ঙ্কর। তখন এঁরা মানবজাতির মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে।

‘ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন’ (ফাও) এর মতে এক বর্গকিলোমিটার আকারের পঙ্গপাল একসঙ্গে যে খাবার খায়, তা দিয়ে ৩৫ হাজার মানুষকে এক বছর ধরে খাওয়ানো সম্ভব! এক একটি ঝাঁকে থাকা ৮ কোটি পঙ্গপাল একদিনেই ৩৫ হাজার মানুষের খাবার সাবাড় করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই পঙ্গপালের ঝাঁকের একদিনে ১২০ মাইল পথ পাড়ি দেওয়া কোনো ব্যাপারই নয়।

আফ্রিকার ইথিওপিয়া, কেনিয়া ও সোমালিয়ার পর পাকিস্তানেও আক্রমন চালিয়েছে পঙ্গপালের দল। এবার ভারতকে বেছে নিয়েছে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। ইতিমধ্যেই এঁরা দাপট দেখিয়েছে পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট রাজ্যের বিভিন্ন শহরে। ক্রমশঃ এগিয়ে আসছে। পূর্ব ভারতে এবং বাংলাদেশে আক্রমনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে অভিমত কৃষি দপ্তরের। অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ তাই কাঁপতে শুরু করেছে পঙ্গপালের আগামী দাঙ্গা হাঙ্গামার চিন্তায়। যেখানেই পঙ্গপালের দল এসেছে, সেখানেই রমরমা ফসলের দফারফা। নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে চাষিদের। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী পশ্চিম আফ্রিকায় ২০০৩ – ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের ফসলের ক্ষতি করেছে পঙ্গপাল।

আলজিরিয়া, পারস্য, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও রাশিয়ার বহু স্থানে কয়েক বছর পর পর পঙ্গপালের উপদ্রব হয়। তার ফলে সেখানে খাদ্য, রেশনের ব্যবস্থা করতে হয়। এ থেকেই পঙ্গপালের উপদ্রবের প্রবলতা বোঝা যায়।

সম্প্রতি ‘ফাও’ একটি নির্দেশে জানিয়েছে যে, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি কৃষি প্রধান দেশকে সতর্ক থাকতে হবে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অর্থাৎ পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় বছর খানেক ধরে পঙ্গপালের ব্যাপক বংশবিস্তার হবে। যা অত্যন্ত ভয়ানক বিষয় হতে পারে।

আজ থেকে ৪০ বছর আগে ১৯৬১ সালে খোদ কলকাতা সংলগ্ন এলাকায় একবার পঙ্গপালের আক্রমন ঘটেছিল। হাওড়ার বর্ষীয়ান চিকিৎসক ডাঃ সৌরেন্দ্রশেখর বিশ্বাস স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘বেশ মনে পড়ে, ১৯৬১ সাল। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। কয়েকদিন ধরে আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল উড়তে দেখেছি। সেগুলোর রঙ ছিল জলপাইয়ের ওপর খয়েরি ছিট দাগ’।

এই বঙ্গে আবারও কি আসবে পঙ্গপালের দল? একদিকে কোরোনা ভাইরাস এবং অন্যদিকে আমফানের আক্রমন। এবার শুধু পঙ্গপাল এলেই বিপদের ত্রহ্যস্পর্শ পূর্ণতা পাবে!

Related Articles

Back to top button
Close