fbpx
গুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গব্লগহেডলাইন

বাংলায় গেরুয়া উত্থানের পথ দেখাচ্ছে আরামবাগ জেলা বিজেপির সভাপতি বিমান ঘোষ

শংকর দত্ত, আরামবাগ: কলকাতা থেকে জাতীয় সড়ক ধরে যতক্ষণ গাড়িতে ছিলাম তেমনভাবে চোখে পড়েনি কোনও গেরুয়া পতাকা। কোথাও কোথাও চা দোকানে বা মোড়ের মাথায় তৃণমূলের ঝান্ডা দেখলেও আগের মতো পতপত করে উড়তে দেখিনি লাল পতাকা বা কংগ্রেসের জাতীয় পতাকা। যদিও ২০১১ আগে বামেদের একটা স্লোগানই আপ্তবাক্য ছিল আমজনতার মনে। তারা বলতো, ‘এই লাল বাংলার লাল মাটিতে লাল পতাকা উড়ছে উড়বে।’

এখন আর সেদিন নেই। প্রকৃতই প্রকাশ্যে বামেরা উধাও। টিভির পর্দায় সূর্য-সুজন বাবুদের আওয়াজ শুনতে পেলেও গ্রামেগঞ্জে তার সরাসরি প্রভাব নেই। রাজ্যে লোকসভা ভোটে বিজেপি ১৮ আসনে জয়লাভ করলেও সাংগঠনিকভাবে এখনও সেই ঝাঁজ দেখাতে পারছে না। বরং জেলার ছোটখাটো নেতা থেকে রাজ্যের তাবড় নেতারা একাধিক জায়গায় মারধর খাচ্ছেন, আক্রান্ত হচ্ছেন, জেলে যাচ্ছেন আজও।

রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ যতই বলুন, ‘মার কা বদলা মার’ বা যতই কর্মীদের চাঙ্গা করতে মুক্ত ঘোষণা করুন, ‘বদল ও হবে, বদলাও হবে’ আসলে কিন্তু এই মুহূর্তে সবটাই সোনার পাথরবাটি রাজ্য বিজেপির পক্ষে। এখনও পদ্মবাহিনী মার খাচ্ছেন, খেয়েই চলেছে।a

আরও পড়ুন:“America loves India,” আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে মোদির শুভেচ্ছার জবাবে জানালেন ট্রাম্প

তবে হিসেব উল্টে গেছে আরামবাগে এসে। আরামবাগের গৌরহাটি মোড়ের পর বামদিকের রাস্তায় যে জায়গায় হুনুমানজির মন্দির। সেখানেই জেলা বিজেপির সদর দফতর। জেলার সভাপতি বিমান ঘোষ। মধ্য চল্লিশের চাবুক যুবক। পেটানো চেহারা। আর এই পার্টি অফিসের মুখ থেকে গলির মোড় পর্যন্ত যা দেখলাম, সেটা সত্যিই অবাক করবার মতো। এখানে এসে মনে হল রাজ্যে বোধহয় এই একটি জায়গায় বিজেপি তাদের শক্ত ঘাঁটি গাড়তে পেরেছে। যেখানে পালোয়ানের মতো কয়েকশো যুবক আগলে রেখেছে তাদের জেলা কার্যালয়কে। বুক দিয়ে রক্ষা করছে গেরুয়া পতাকার মাহাত্ম্য।

প্রথমে ভুল ভাবছিলাম। কারণ গোটা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে গিয়ে দেখেছি এক মাত্র শাসক দলের ক্ষেত্রে। তৃণমূলের জেলা, শহর বা ব্লক কার্যালয়ের আশেপাশে এই ধরনের ভিড়ভাট্টা দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু চোখ খুলে গেলো গাড়ি থেকে নামবার পরই। অবাক করেছে সংখ্যালঘু মানুষের ভিড় দেখেও। গোটা রাজ্যে বিজেপির কোনও জেলা অফিসের কাছে সংখ্যালঘু মানুষের এতো ভিড় এর আগে চোখে পড়েনি।

কিন্তু এর রেসিপিটা ঠিক কী? জানতে চাইলাম খোদ আরামবাগ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি বিমানবাবুকেই। তাঁর উত্তর, ‘আমাদের রাজ্যের সর্বত্র সংখ্যালঘুদের উন্নতিটা ঘুরে দেখুন। দেখবেন শুধুই বঞ্চনা। এই সরকার মুসলমানদের উন্নতির নাম করে তাঁদের ঠকাচ্ছে। আর এটা আরামবাগের মানুষ অনেক আগেই বুঝে গেছেন। তাঁরা বুঝেছেন একমাত্র নরেন্দ্র মোদির হাত শক্ত করলেই এই দেশে তাদের নিরাপত্তা বেশি, তাদের উন্নতি অনেক বেশি হবে আগামী দিনে। মোটকথা গ্রামের মানুষকে আর ভুল বুঝিয়ে রাখা যাবে না। সে সংখ্যালঘু শ্রেণীর মানুষই হোক কিংবা পিছিয়ে পড়া কোনও জনজাতি হোক। আর ঠিক এই কারণেই আমাদের এখানে সংখ্যালঘু মানুষেরও এককাট্টা হয়ে বিজেপির হাতকে শক্ত করছে।’

আরও পড়ুন:নবান্ন দখলে বিজেপির ম্যাজিক ফিগার ২৭!

এখানকার সাংসদ তৃণমূলের। প্রথমবার ২০১৪ সালে তিনি প্রায় ৪ লাখের বেশি ভোটে জিতেছিলেন। এইরকম একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে বিজেপি এখানে শক্তিশালী, এটা দাবি করছেন কীভাবে? বিমান বাবুর স্পষ্ট উত্তর, ‘হ্যাঁ একদম ঠিক বলেছেন , প্রথমবার উনি অনেক ভোটে লিড করেছেন। কিন্তু গত আড়াই বছরের চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বলতে পারেন ১০১৬ সলের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকেই এই জেলার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। পঞ্চায়েত ভোটে মানুষকে ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। আর তার এফেক্ট-টা পড়েছে ২০১৯-এর লোকসভায়।

মানুষ যে আর তৃনমূলকে চাইছে না সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে এবারের লোকসভার ফলাফলেই। চুরি-জোচ্চুরি করে এবারে ওরা আরামবাগ লোকসভায় জিতেছে মাত্র এক হাজারের কিছু বেশি ভোটে। ন্যায্যভাবে ভোট হলে এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী অন্তত ২৫ হাজারের বেশি ভোটে লিড করত।’ তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘ তবে চিন্তা নেই। সব কিছুর জবাব মিলে যাবে আগামী বিধানসভা ভোটেই। আমরা ইতিমধ্যেই তৈরি ছিলাম পৌরসভা ভোটের জন্য। সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতিতে সেটা আটকে আছে। যদি পুরভোট হয়, তখনই বুঝে যাবেন এখানে আমাদের শক্তি কতটা আছে।

আর বিধানসভা ভোটে এই লোকসভার অন্তর্গত ছয়টি কেন্দ্রেই আমরা বিপুল ভোটে জিতব।’
এতোই যখন শক্তিশালী আপনারা , বিজেপির লোকজন এতো মার খাচ্ছে কেন? আপনারাই তো অভিযোগ করেন প্রশাসন আপনাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করে? এ বিষয়ে বিমান ঘোষের জোরালো হুঙ্কার, ‘রাজ্যের সর্বত্র যেটা চলছে, এখানে কিন্তু তার উল্টো চিত্র। একমাত্র আরামবাগ সাংগঠনিক জেলাতেই আমাদের ছেলেদের গায়ে কেউ হাত তুলতে পারছে না। প্রশাসন এখানে নিরীহ লোকেদের কেস দিয়ে ফাঁসাচ্ছে। তাঁদের গোপনে সাহায্য করছেন মিডিয়ার একটা অংশ। কিছু তলাবাজি মিডিয়া পার্সন আমাদের লোকজনকে ভয় দেখিয়ে টাকা খাওয়ার চেষ্টা করছে। সব আমরা নজরে রেখেছি। তাছাড়া এখানে আমরা পুরোদমে প্রস্তুত আছি। আমাদের একজনকে মারলে আমরা ওদের দশজনকে মারব এটা লিখে দিন।’

কিন্তু যেখানেই যায়, দিকে দিকে বিজেপির গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসছে। বহু জায়গায় বিজেপিতে গিয়েও আবার শাসক শিবিরে লোকজন ফিরে আসছে। কী বলবেন?

আরও পড়ুন:চতুর্দিকে শুধুই মৃত্যুর মিছিল… বন্যায় বিপর্যস্ত জাপান, মৃত কমপক্ষে ১৫

এই দাপুটে জেলা সভাপতির স্পষ্টবার্তা, ‘দেখুন একটা বড় দলে যখন সুবিধাবাদী লোকজন ভিড় করে তখন আগে থেকে কিছু বোঝা যায় না। যারা এসেই ভাবে কমিয়ে নেব, তাদের জন্য বিজেপি নয়। এখানে অনেক শৃঙ্খলা মেনে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে থাকতে হয়। ধান্দাবাজরা নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করতে থাকে। তবে বিজেপির মধ্যে কোনও গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব নেই। এ রাজ্যে কিছু তৃণমূলের লোকজন বিজেপির চাদর গায়ে চাপিয়ে আমাদের বদনাম করতে আসছে। তাদের দল চিহ্নিত করছে। তবে আমাদের জেলায় এই ছবি কোথাও খুঁজে পাবেন না। সবাই দলীয় অনুশাসন মেনেই এখনে কাজ করেন।’

তাহলে একজন সভাপতি হয়ে জোর গলায় কয়েকজন নেতার নাম বলতে পারবেন, যারা অপনার জেলায় সাংগঠনিক স্তরে খুব ভালো কাজ করছেন। নাকি সেইসব নাম বললে এখানেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসে যাবে ভবিষ্যতে? একটু ঢোঁক গিললেও বিমানবাবু দ্বিধাহীন ভাবে বলে দিলেন, ‘কোনও সমস্যা নেই। আমর জেলায় যুবশক্তি প্রচণ্ড চাঙ্গা আছে। ভবিষ্যতে কে বা কারা জন প্রতিনিধি হয়ে কাজ করবে সেটা সময় বলবে। তবে সংগঠনকে মজবুত করতে এখনই যারা কাজ করছে তাদের আমি চিনি। সবার নাম বলা মুশকিল।

আরও পড়ুন:ফের বিহার ও উত্তরপ্রদেশে বজ্রাঘাতে একাধিক মৃত্যু, ক্ষতিপূরণের আশ্বাস যোগী ও নীতিশের

আগামী দিনে বিধানসভা ভোটকে লক্ষ্য রেখে আমরা প্রতিটা বিধানসভায় ১০ জন করে নেতা তৈরি রেখেছি। আমরা বিজেপির সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে জাতীয়তাবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত করে সবাইকে দেশ সেবার জন্য গড়ে তুলছি। ইতিমধ্যেই আমাদের জেলায় আমরা প্রায় সাড়ে আট হাজার কর্মী-নেতার ডেটা বেস রেডি রেখেছি। যেখানে কোনও ভেজাল নেই।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এখানে প্রতিদিনই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন বসে করে এসে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, এই সাংগঠনিক জেলায় মহিলা মোর্চা ও সংখ্যালঘু মোর্চা একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যা ভবিষ্যতে তাদের সব কটি বিধানসভা ছিনিয়ে নিতে রীতিমতো আশ্বাস জোগাচ্ছে। এখন সময়ই বলবে, রাজ্য বিজেপিকে আরামবাগই পথ দেখাবে কিনা।

Related Articles

Back to top button
Close