fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

দলে কোনও ব্যক্তিবিরোধ নেই, প্রশাসক নির্বাচন হওয়ার পরও কল্যাণীর উন্নয়ন থেমে থাকবে না: অরূপ মুখোপাধ্যায়

অভিষেক আচার্য, কল্যাণী: বামপন্থী ঘরের ছেলে আজ তৃণমূলের দাপুটে নেতা। কল্যানীর যে কোনো সমস্যার পরিত্রাতা তিনি। কল্যাণী শহর তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি অরূপ মুখোপাধ্যায় ওরফে টিঙ্কু। তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ থেকে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন নিজস্ব ঘরানায়।

প্রশ্ন: রাজনীতিতে প্রবেশ কিভাবে? গডফাদার কে? কার হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: আমার বাবা ছিলেন বামপন্থী নেতা। সেই সুবাদে স্কুল জীবনে এসএফআই করতাম। কিন্তু স্কুলে নবম ও দশম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনীতিতে প্রবেশ ঠিক নয় বলে মনে হত আমার। তাঁর প্রতিবাদ করেছিলাম। সেই প্রতিবাদই গায়ে কংগ্রেসের তকমা লাগিয়ে দিয়েছিল। ১৯৯২ সালে কংগ্রেস নেতা নিখিল গোস্বামীর হাত ধরে ছাত্র পরিষদে যোগদান করি। তারপরই বিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি পুরোপুরি ভাবে বাতিল করেছিলাম।
বাবার সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। কংগ্রেস করায় বাবা প্রতিবাদ করেছিলেন। করেছিলেন শাসনও। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বাবা আর প্রতিবাদ করেননি। তা সত্ত্বেও সততার জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার বাবা আমার আদর্শ। বাবা ছিলেন বলেই রাজনীতি শিখতে পেরেছি। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে লেনিনের ছবি দেখতাম। আমি লেনিন, দাস ক্যাপিটাল সবই পড়েছি। তাই রাজনীতি ছিল আমার রক্তে। আর, রাজনৈতিক আন্দোলনের আদর্শ আমার নেত্রী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৩ সালে নেত্রীর আন্দোলন আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। কি সহজ মেলামেশা ওনার। তবে এটা ঠিক বামপন্থী ভাবনা মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে পাওয়া যায়। সিপিএম পার্টি থেকে বেরোনোর পর আমাকে এক সিপিএম নেতা ডেকে বলেছিলেন, ভুল হচ্ছে। তাঁর উত্তরে আমি বলেছিলাম, সিপিএম পার্টিটা চলে যাবে। ভিতরটা ফাঁপা। ধসে পড়বে একদিন। এই উত্তরে ওই নেতা আমায় বলেছিলেন, বেশি বুঝিস। কিন্তু আজ সেই সিপিএম পার্টি কোথায়?

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন কল্যাণী শহর তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতির পদ সামলাচ্ছেন দায়িত্বের সঙ্গে। কোনো বাধা ছাড়াই। আপনার usp টা কি?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: ১৯৯৯ সালে যুব কংগ্রেসের সভাপতি হই। টানা ১৭ বছর যুব কংগ্রেসের সভাপতি ছিলাম। ২০১৫ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি পদে রয়েছি। মুকুল রায় যখন তৃণমূল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বলা ভালো, দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন মুকুল রায়। সেই সময় দলের অনেকেই ভেবেছিলেন এবং বলেছিলেন, আমিও হয়তো মুকুল রায়ের সঙ্গে দল ছেড়ে বেরিয়ে যাবো। কিন্তু সেটা হয়নি। কারণ, আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে দল করি। মুখ্যমন্ত্রীকে আমি মানি। আমি পার্টি বুঝি, দল ও সংগঠন বুঝি। দলনেত্রী যাঁকে দায়িত্ব দেবেন তাঁকে মেনেই আমাকে কাজ করতে হবে। এবং সেটাই করি আমি। ফলে পার্টির আনুগত্য প্রকাশ, পার্টির ভাবনায় নিজেকে নিয়োজিত করে পার্টি কি চাইছে সেই ভাবনাকে কল্যাণী শহরে প্রতিষ্ঠিত করাই আমার কাজ। কারণ, আজ আমি আছি, কাল অন্য কেউ আসবে। কিন্তু সম্মান দিতে হবে চেয়ারটাকে। আমি সকলের মতকেই গুরুত্ব দেই। আগামী দিনেও এইভাবে চলতে হবে।

প্রশ্ন: কল্যানীর বুকে আপনার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। নিন্দুকেরা বলে, টিঙ্কুর অনুমতি ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। কথাটা কতটা সত্যি?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: কথাটা ঠিক নয়, এটা সম্পূর্ণ বাজে কথা। কল্যাণী শহরে রাজনীতি করতে হলে শহরের মানুষের ভাবনাটাকে বুঝতে হবে। এই শহরের দুটি ভাবনা রয়েছে। রেল লাইনের ওপারের একটি ভাবনা লাইনের এপারে একটি ভাবনা। এই দুটি ভাবনাকে মাথায় রাখতে হবে। আমি এই শহরেই জন্মেছি। ভালোবাসি শহরটাকে। ভালো হোক শহরের এটাই চেয়েছি। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, বদলা নয়, বদল চাই। আমি সেই ভাবনার শরিক। দল আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছে। সেই দায়িত্ব পালন করছি। ২৪ ঘন্টা কাজ করি আমি। লোকসভা নির্বাচনের আগে, কল্যাণী শহরে আমাদের পার্টি অফিস পোড়ানো হয়েছে। গাড়ি ভাঙ্গচুর করা হয়েছে। কই এরপর তো কাউকে মারতে যায়নি, বিরোধীদের পার্টি অফিসও ভাঙতে যায়নি। আমি কিংবা আমার দলের কেউ হিংসার পথও বেছে নেয়নি। কারণ, দীর্ঘদিন কাজ করায় মানুষের আস্থা,বিশ্বাস রয়েছে আমাদের প্রতি। এটা ঠিক, লোকসভা নির্বাচনের পর মানুষ বিরোধীদের সন্ত্রাস দেখেছে। তান্ডব দেখেছে। এই শহরের মানুষ এটাকে মেনে নেয়নি আর মেনে নেবেও না। এটা ঠিক লোকসভা নির্বাচনে আমাদের হার হয়েছে। তাঁর ভুল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নয়। ভুল আমাদের মত স্থানীয় নেতাদের। আমরা মানুষকে বোঝাতে পারিনি। রাগ ও অভিমান ছিল মানুষের। তাই প্রতিটা বাড়িতে যাচ্ছি। হাতজোড় করে নিজেদের ভুল স্বীকার করে নিচ্ছি। ফলে ফের মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছি।

প্রশ্ন: কঠিন অসুখে ভুগছে বিশ্ব। এই অবস্থায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, ত্রাণ দিয়েছেন। দুঃস্থদের তুলে দিয়েছেন খাবার। কিন্তু আপনি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে দান করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: হ্যাঁ, আমি মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে ৫ হাজার টাকা দান করেছি। আমার সাধ্যমতো আমি সেটা করেছি। এছাড়া আমাদের যে দুর্গাপুজো হয় সেই পুজোর ফান্ড থেকে এক লাখ টাকা মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন: কল্যানীর সার্বিক উন্নয়ন দেখে হিংসে করে প্রতিবেশী পুরসভার বাসিন্দারা। এর নেপথ্যের নায়ক নাকি আপনি। কি বলবেন?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: কল্যানীর যা উন্নয়ন হয়েছে তা মুখ্যমন্ত্রীর জন্য সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া একা কেউ কিছু করতে পারে না। কল্যানীর সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পুরসভার কাউন্সিলরদের ভূমিকা রয়েছে। ভূমিকা রয়েছে পুরসভার চেয়ারম্যানদেরও। কিছু ভালো ব্যক্তিত্ব পেয়েছি যাঁরা কল্যানীর উন্নয়নের কথা ভাবেন। এছাড়া বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে যেখানে অন্যান্য দলের সমর্থক বন্ধুরা রয়েছেন। সার্বিক উন্নয়নের দিকটা তাঁরা দেখেন। এখানে একক ভাবে কিছু নেই। উন্নয়নের ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেস যেটা বলবে সেটা করে দেখাবে। আর সেটাই করা হয়েছে। আর সবটাই হয়েছে সবাই মিলে, আমি তে নয়। আমার দায়িত্ব হচ্ছে, উন্নয়নে সহযোগিতা করা।

প্রশ্ন: ভোট হওয়ার সুযোগ নেই। পুরসভাগুলিতে প্রশাসক নিয়োগ হচ্ছে। বাকি কাজগুলো কি এভাবে সম্পূর্ণ করা সম্ভব?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: অবশ্যই সম্ভব। উন্নয়ন থেমে থাকবে না। কল্যানীর রাস্তাঘাটের কাজ সম্পূর্ণ। কিছু কাজ বাকি রয়েছে সেগুলো লকডাউন উঠলেই হবে। মানুষ ভালো চায়, উন্নয়ন চায়। আর সেটা হবেই। এছাড়া কিছু সমস্যা রয়েছে। যেমন, কল্যাণী শহরে কোনো ভ্যাট নেই। জমি পেয়েছি। সেটা দ্রুত হয়ে যাবে। কল্যানীতে কোনো শপিং মল নেই। জায়গা দেখা আছে। সেটারও কাজ দ্রুত শুরু হবে। এটা আমার ভাবনা নয়, শহরের মানুষের ভাবনা। কাজের মাধ্যমে তাঁদের সেই ইচ্ছেপূরণ হবে।

প্রশ্ন: আপনার দলের বিধায়ক রমেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। তাঁর নাম একপ্রকার ভুলেই গিয়েছে এলাকাবাসী। অভিযোগ, তাঁকে নাকি দেখতে পাওয়া যায় না। আপনার মত কি?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: এটা বাস্তব যে লকডাউনে বিধায়ককে দেখা যাচ্ছে না। তার কারণ, আমরাই তাঁকে বেরোতে বারণ করেছি। বয়স হয়েছে তাই করোনা আবহে ওনার না বেরোনোই ভালো। তবে উনি ঘরোয়া কিংবা সরকারি বৈঠকে উপস্থিত থাকছেন। পাশাপাশি, আমাদের বিজেপি সাংসদকে খুঁজেই পায়নি আমরা। কোথায় তিনি? তবে লকডাউন উঠলে আবার আমাদের বিধায়ককে দেখা যাবে।

প্রশ্ন: শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ আপনি। অন্যদিকে, নদীয়া জেলার পর্যবেক্ষক মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। আপনার ব্যক্তিগত কোনো অনুষ্ঠান হোক কিংবা দলের। প্রতিবারই অনুপস্থিত থেকেছেন রাজীববাবু। পর্যবেক্ষকের সঙ্গে দূরত্বের কারণ কি?

প্রশ্ন: কোনো দুরত্ব নেই রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। পার্থবাবু মহাসচিব। তিনি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন কল্যাণী শহরকে। তাই মহাসচিব বারবার আসেন কল্যানীতে। রাজীববাবুও আসেন। তবে কেউই আমার বাড়ির কোনো অনুষ্ঠানেই আসেননি। আমি সবাইকে মেনে নিয়ে কাজ করি। আর পার্টির কাজের সূত্র ধরে যে নীতিতে আমি দল করি তাতে ঘনিষ্ঠতা হবে এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া রাজীববাবুর সঙ্গেও আমি বহুবার বৈঠক করেছি। তাঁর বিভিন্ন কর্মসূচিতে আমি থাকি। আমার সঙ্গে সবার সম্পর্ক ভালো।

প্রশ্ন: দলের তপন মন্ডল vs ব্লক সভাপতি পঙ্কজ সিং। অরূপ মুখোপাধ্যায় vs সজল দে। লড়াই টা কি ব্যক্তিগত? এতে কি আপনার মনে হয় না দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: পঙ্কজ ব্লক সভাপতি আর তপন কর্মাধ্যক্ষ। দল করতে গেলে ভিন্ন ভাবনা থাকে। এমনকি মতপার্থক্যও থাকে। তাই বলে পঙ্কজ আর তপন দুজন দুই মেরুতে চলছে এটা আমি বিশ্বাস করি না। মানিও না। কর্মক্ষেত্রে দুজন একসঙ্গে বৈঠক করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। পাশাপাশি, আমার ও সজলের কোনো মতপার্থক্য নেই। আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। বৈঠকও করেছি। সজল দলে আছে। ফলে দলের যে কোনো কর্মসূচিতে সে অংশগ্রহণ করবে। আমার দলের কোনো কর্মসূচিতে সজল আগেও এসেছে। ভবিষ্যতেও আসবে। আবার সজলের ওয়ার্ডে দলের কর্মসূচিতে আমি যাবো। ব্যক্তিগতভাবে কেউ আমাকে অপছন্দ করতেই পারে। তাই বলে ব্যক্তি বিরোধ আমাদের নেই। আর আমাদের দলে এইসব হয় না।

প্রশ্ন: রেশন দুর্নীতি, করোনা শ্মশান নিয়ে সরগরম কল্যাণী। এমনকি বিরোধীরাও বিষয়গুলি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কি ভাবে সামলাচ্ছেন বিষয়গুলি?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: রেশন নিয়ে কোনো দুর্নীতি কল্যানীতে নেই। বরং বিজেপির কিছু কিছু নেতা রেশন দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। বিজেপি সরকারের খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করছে। আর দুর্নীতি ধরা প্রশাসনের কাজ। দুর্নীতির স্থান আমরা শুধু প্রশাসনকে দেখিয়ে দিচ্ছি। এছাড়া করোনা শ্মশান নিয়ে বিজেপি বিভ্রান্তি তৈরি করে মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করছে। সরকারি জায়গায় জনমানবশূন্য এলাকায় ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে অস্থায়ীভাবে শ্মশানটি করা হয়েছে। আর সবটাই করা হয়েছে সরকারি নিয়ম মেনেই।

প্রশ্ন: আপনার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ভবিষ্যতে বিধায়ক হিসেবে আপনাকে দেখতে পাবে কল্যাণীবাসী?

অরূপ মুখোপাধ্যায়: সংগঠন করতে এসেছি। সংগঠনের মধ্যে দিয়েই কাজ করতে হবে। যাঁরা মানুষের কাজ করবেন তাঁদের সামনে নিয়ে এসে বসানো সংগঠনের দায়িত্ব। আমি সেটাই পালন করছি। তাই বিধায়ক, কাউন্সিলর কোনোটাই হতে চাই না আমি।

Related Articles

Back to top button
Close