fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

অসুস্থ বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকলে প্রাপ্য ভাতা পাবেন না, ঘোষণায় ক্ষোভে ফুঁসছেন আশা কর্মীরা

তারক হরি, পশ্চিম মেদিনীপুর: সারা দেশ জুড়ে গ্রামীণ স্তরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিরাট অংশ টিকিয়ে রেখেছেন আশা কর্মীরা। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্যের রাজ্য সরকার তাঁদের উপর ভর করেই গর্বের সঙ্গে কৃতিত্ব জাহির করছেন মা ও শিশু মৃত্যুর হার কমে যাওয়ার জন্য। পোলিও মুক্ত ভারত ঘোষণা করার পিছনে সিংহভাগ অবদান এই আশা কর্মীদের। অথচ যে আশা কর্মীরা অন্তরালে থেকে নিরলসভাবে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করে চলেছেন তাঁদের প্রকৃত অবস্থা শুনলে চমকে উঠবেন সবাই!

 

তাঁরা যখন অন্যান্য পরিবারের মা, শিশুসহ সবাই যাতে সুস্থ থাকে তার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন তখন তাঁদের নিজের সন্তান এবং মা হিসাবে তাঁর নিজের স্বাস্থ্যের যে করুণ অবস্থা সেদিকে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই! পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়নের ডেবরা ব্লকের সম্পাদিকা কাজল চক্রবর্তী বলেন, “আমরা মা এবং শিশুদের স্বাস্থ্য পরিষেবা ছাড়াও কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সমস্ত রকমের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছি। অনেক আন্দোলনের পর অক্টোবর মাস থেকে ১০০০ টাকা বাড়িয়ে রাজ্য সরকার মাসে ৪৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া শুরু করেছে। এর সঙ্গে দেওয়া হয় ফরমেটের ভিত্তিতে সামান্য কিছু অর্থ। এবার এই সামান্য অর্থের বিনিময়ে আমাদের কী কী করিয়ে নেওয়া হয় সেটা আপনি দেখে চমকে যেতে পারেন কিন্তু সরকার চমকায় না!

নিয়মে বলা হয়েছে, আশাকর্মীদের কাজ দিনে পুরো ২৪ ঘন্টাই। ৩৬৫ দিনে তাঁদের যে কোনো সময় কাজ দেওয়া যাবে। প্রতি সপ্তাহে একদিন সাব-সেন্টারে পূর্ণ সময়ের জন্য ডিউটি, অন্যান্য দিন এলাকায় এলাকায় মা ও শিশুদের বিভিন্ন বিষয়ে খবরা খবর, ঔষধপত্র বিতরণ, গর্ভবতী মহিলাদের প্রসবের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া সহ নিত্যনতুন কাজের নির্দেশ পালন করতে হয়। সাব সেন্টারে ডিউটি ছাড়াও একাধিক ভিএইচএনডি ক্যাম্পে (অন্যান্য গ্রামীণ এলাকায়) পূর্ণ সময়ের জন্য ডিউটি পালন করতে হয়। এছাড়া নিজের অঞ্চলে, গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়মিত মিটিং-এ উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ গ্রহণ ও সেখানে সংগৃহীত বিভিন্ন তথ্যের যোগান দিতে হয়। গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নার্সদের মতো এক মাস দিবারাত্রি ডিউটি দিতে হয় আশা কর্মীদের মাত্র ২০০০ টাকার বিনিময়ে, যা দিশা ডিউটি নামে পরিচিত। উল্লেখ্য ওই সময়ে তাঁদের ফরমেটের টাকা দেওয়া হয় না। এরপরও প্রায় প্রতি বছরই ঘর সংসার ছেড়ে ৮ দিন অথবা ১৫ দিনের জন্য বাইরে ট্রেনিংয়ে যেতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। নিয়মিত কাজ ছাড়াও যে কোনো সময় কাজের হুকুম আসতে পারে। সারা বছরে কোনো ছুটি নেই। একদিনও যদি বাড়ির বাইরে চিকিৎসা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যেতে হয় তাহলে লিখিত দরখাস্ত দিয়ে অনুমতি নিয়ে তবেই যেতে হয়। দায়িত্ব-কর্তব্য, কাজ সর্বক্ষণের জন্য।”

সম্প্রতি ডেবরার এক আশা কর্মী অনিতা কর করোনাই আক্রান্ত হয়েছিলেন। করোনা মুক্ত হবার পর তার পারিপার্শ্বিক শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় তাকে জটিল অপারেশন করাতে হয়। গত অক্টোবরের ৭ তারিখ থেকে পাঁচই ডিসেম্বর অবধি তিনি ছুটি নিয়েছেন। তার অভিযোগ তাকে বলা হয়েছে যে এক মাস বা তার বেশি ছুটি থাকলে তার প্রাপ্য মাসিক ভাতা ও ইন্সেন্টিভ এর টাকা তিনি পাবেন না। যা নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে অন্যান্য আশা কর্মীদের মধ্যে। চিকিৎসার জন্য ছুটি নিলে বেতন কেটে নেওয়া চূড়ান্ত অমানবিক বলে তারা মনে করে ন।

দিনের-পর-দিন হাজার কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার পর অধিকাংশ আশা কর্মী আজ নিজেরাই অসুস্থ রোগীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তাঁদের নিজেদের চিকিৎসা পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। এর জন্য নেই কোনো ছুটি। আর অন্য কাজ তো দূরের কথা, চিকিৎসার কারণে ছুটি নিলেও কেটে নেওয়া হচ্ছে প্রাপ্য অর্থ। শুধু আমানবিক নয়, সামান্য নৈতিকতায় কি এই কাজ করা যায়?

মা ও শিশুর মৃত্যু হ্রাস এবং বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হিসেবে সরকারি তরফ থেকে বহু সম্মান প্রদর্শন এবং প্রশংসা   কুড়িয়েছেন তাঁরা। কিন্তু বাস্তবে তাদের এই করুণ দুর্দশার চিত্রে পরিষ্কার যে আজ তারা কতটা অবহেলিত! এই ব্যাপারে রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইছেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই “দিদিকে বল” তে অভিযোগ জানিয়েছেন শ্রাবন্তী দাস, জ্যোৎস্না জানা মাইতি সহ ডেবরা ইউনিটের অন্যান্য আশা কর্মীরা।

Related Articles

Back to top button
Close