fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

অশ্বত্থামা ছিলেন অমর…

মৃত্যুঞ্জয় সরদার: তথাকথিত রামায়ণ ও মহাভারতের ঘটনাপ্রবাহ আজকের যুগের মানুষের চিরাচরিত ইতিহাস বহন করে চলছে। বর্তমান যুগের মানব সভ্যতা ও মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহ রাজনীতির সঙ্গে রামায়ণ ও মহাভারতের সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। চোখ কান খুলে রেখে চললে সেই ইতিহাস আমরা  দেখতে  পাব। মহাভারতের গাছগাছালির কথা উল্লেখ ছিল বহু যুদ্ধ-বিগ্রহ ইতিহাসের মধ্যেও। আধুনিক কালের এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা যুগের সূচনার আগে মানুষের জীবন রক্ষায় একমাত্র ভরসা ছিল গাছ-পালা, কাণ্ড, ফল-মূলের নির্যাস দিয়ে তৈরী ওষুধ, চিকিৎসাশাস্ত্রে যা ভেষজ বা আয়ুর্বেদ নামে পরিচিত।

তক্ষশীলা ছিল ভেষজ ও শৈল্য চিকিৎসা বিদ্যার প্রাণ কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন রোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে চলত দিন রাত গবেষণা। রোগ-যন্ত্রণা-নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের দীর্ঘ আয়ু লাভের প্রচেষ্টায় বছরে বছরে তৈরি করা হত প্রচুর চিকিৎসক। তাদের অনেকে নিজ সৃষ্টি কর্মের যোগ্যতা, প্রতিভা ও নিরলস প্রচেষ্টায় স্থান দখল করে উজ্জ্বল হয়ে আছেন প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা ইতিহাসের পাতা জুড়ে।

সেইসময়ে মানব সভ্যতার যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধ্বংসলীলার ইতিহাস ও তার প্রেক্ষাপট কোনও না কোনও লেখক লিখে গেছেন। আর  সেই লেখাকে আজ আমরা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের রূপ দিয়েছি।  রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ সবেতেই বাস্তব সত্য নিয়ে লিখেছেন তৎকালীন লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা। তবে এ নিয়ে সারা বিশ্বে অনেক বিজ্ঞানীরা অনেক রকম ভাবে বিতর্ক করেছিলেন। কেউ বলেছেন এর কোনও তাৎক্ষণিক প্রমাণ নেই। অনেকেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রমাণ পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আমি বহুবার চরিত্র মূলকভাবে গবেষণা করে দেখেছি রামায়ণ ও মহাভারতের বাস্তব সত্য কথাটি তৎকালীন লেখক লিপিবদ্ধ করে গেছেন! নির্ণয় নেওয়ার মুহূর্তে আমরা সর্বদা কোনও অন্য ব্যক্তির উপদেশ, সূচনা বঞ্চনা বা পরামর্শকে আধার করে থাকি। আর আমাদের ভবিষ্যতের আধার হয়ে থাকে আমাদের আজকের নেয়া সিদ্ধান্ত। তাহলে কি আমাদের ভবিষ্যৎ অন্য ব্যক্তির পরামর্শ, অন্য কোনও ব্যক্তির দেওয়া উপদেশের ফল? তবে কি আমাদের সম্পূর্ণ জীবন কোনও অন্য ব্যক্তির বুদ্ধির পরিনাম? আমরা কি কখনও বিচার করেছি? সবাই জানে যে ভিন্ন ভিন্ন লোক একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকে। মন্দিরে দাড়ানো ভক্ত বলে দান করা উচিৎ। আর চোর বলে যদি সুযোগ পাওয়া যায় তবে ঐ মূর্তির গয়না চুরি করা উচিৎ।

ধার্মিক হৃদয় ধার্মিক উপদেশ দিয়ে থাকে আর অধর্ম-ভরা হৃদয় অর্ধামিক পরামর্শ দেয়। এই ধর্মময় উপদেশ পরামর্শ স্বীকার করলে মানুষ সুখের দিকে যায়। কিন্তু এইরকম পরামর্শ স্বীকার করার আগে স্বয়ং নিজের হৃদয়ে ধর্মকে স্থাপন করা কি অনেক বেশি জরুরী নয়? স্বয়ং বিচার করুন। প্রতিনিয়ত স্বয়ংসম্পূর্ণ বুদ্ধিমান মানুষেরা এই বিচার বুদ্ধি বা নিজের জ্ঞানের উপর উপলব্ধি করেছিলেন, তৎকালীন শ্রীকৃষ্ণের বাণীকে আজকের প্রতিটি মানুষ সমান ভাবে প্রাধান্য  দিয়ে চলেছে। তাই মহাকাব্যের ঐতিহাসিকতা নিয়ে বিতর্ক কোনো নতুন বিষয় নয়। ইউরোপে মহাকবি হোমারের লেখা ইলিয়াড, ওডেসি নিয়ে যেমন ইতিহাসবিদ-প্রত্নতাত্ত্বিকরা যুগে যুগে মাথা ঘামিয়েছেন, তেমনই আমাদের দেশের রামায়ণ ও মহাভারত নিয়েও কম গবেষণা হয়নি।

বহুকাল ধরে চর্চা বহমান রয়েছে মহাভারতের ঐতিহাসিকতা নিয়ে। সত্যিই কি ঘটেছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ? কৃষ্ণ নামে সত্যিই কি কেউ রাজত্ব করতেন দ্বারকায়? কৌরব আর পাণ্ডবদের কথা কি পুরোটাই বানানো? নাকি সত্যই এই দুই কুল পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে ধ্বংস করে ফেলেছিল নিজেদের? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশেষজ্ঞরা কখনও প্রবেশ করেছেন ইতিহাসের আঙিনায়, কখনও প্রমাণ খুঁজেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানে, কখনও বা ভাষাতত্ত্বের সড়ক বয়ে অগ্রসর হয়েছেন। কী বলছে এইসব প্রমাণ? নিচে তার মধ্যে থেকে কয়েকটি উল্লিখিত হল। মৌষল পর্বে দ্বারকা নগরীর সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে। প্রাচীন দ্বারকা আজ সমুদ্রে নিমজ্জিত। এমন ৩৫টিরও বেশি ভারতীয় নগরীর কথা মহাভারতে রয়েছে, যাদের অস্তিত্ব ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে আরও বেশ কিছু জনপদের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

কুরুক্ষেত্রের সেই ঐতিহাসিক পটভূমি

মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে লিখিত রয়েছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর অব্যবহিত পূর্বে কৃষ্ণ হস্তিনাপুরে গমন করেন কার্তিক মাসের সেই তিথিতে, যে দিন চন্দ্র রোহিনী নক্ষত্রে অবস্থান করছিলেন। পথে কৃষ্ণ বৃকস্থল নামে একটি জায়গায় বিশ্রাম নিতে থামেন। চন্দ্র তখন ভরণী নক্ষত্রে বিরাজ করছেন। যেদিন দুর্যোধনের পতন ঘটে, সেদিন চন্দ্র পূষা নক্ষত্রে অবস্থান করছেন। জ্যোতির্বিদরা মহাভারতের আনুমানিক কালের সঙ্গে এইসব উল্লিখিত তিথির সাযুজ্য পেয়েছেন। সেই কারণে সাধারণত বিভিন্ন পূজায় শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে মহাভারত পাঠ ধর্মীয় আচার, তাই বলা যায় মহাভারত ধর্মশাস্ত্র হিসেবে পাঠ্য এবং সাধারণত এর পরিবেশনারীতি হচ্ছে কথকতা।

কারবালার পুঁথি পাঠের সঙ্গে মহাভারত পাঠের মিল দুইভাবে। প্রথমত: দুটি পুরাণের পাঠ ও শ্রবণ পূণ্য নিমিত্ত। দ্বিতীয়ত: পরিবেশনার ধরণগত ঐক্য। কারবালার বিষয় নিয়ে রচিত কাব্যমালা পুঁথি পাঠের আসরে সুরে সুরে উপস্থাপিত হয়। দুটি পরিবেশনাই পাঠ সংশ্লিষ্ট। মহাভারতও পুঁথি পাঠের মত সুরে সুরে করতাল বাদন সহযোগে আসরে পরিবেশনার প্রামাণ্য পাওয়া যায়।এই বিশ্বাসের উপরে উপলব্ধি করে মানুষের মধ্যে ভক্তি, শক্তি আর ভালোবাসার মধ্যে ভগবানের জন্ম। ভগবান শব্দের পিছনে একটা মহা শক্তি আছে। সেই শক্তিকে আমরা বিশ্বাস করি আবার অনেকেই বিশ্বাস করতে পারিনা।

বহু গবেষকরা তাদের নিজেদের গবেষণায় মহাভারতের কথাকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় যেভাবে উল্লেখ করেছে ,সেই কথাগুলো আজ পুনরায় আমি লেখার মধ্যে পূর্ণ রূপ দিতে চাই। গবেষকদের অনুমাণ মহাভারত প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরনো। সেই তত্ত্বকে মাইলস্টোন করে চললে অশ্বত্থামা ৫ হাজার বছর ধরে বেঁচে রয়েছেন! বিজ্ঞানী বা ‌যুক্তিবাদীরা এই তত্ত্বকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু স্থানীয়রা কী বলছেন? সবাই কি একই ভ্রমের শিকার। ‌যে জায়গায় অশ্বত্থামাকে প্রায় দেখা ‌যায় সেই জায়গায় ‌যাব, তার আগে একটু স্মৃতিচারণ করেনি অশ্বত্থামার অভিশাপ পর্ব।

কুরুক্ষেত্রের ‌যুদ্ধে কৌরবদের দলে ছিলেন দ্রোণাচা‌র্য পুত্র অশ্বত্থামা। পাণ্ডবদের নির্মূল করতে তিনি পণ নিয়েছিলেন। পাণ্ডবদের হত্যা করতে না পেরে তিনি প্রায় জ্ঞান শূণ্য হয়ে ব্রহ্মাস্ত্র তুলে নেন। তিনি জানতেন অর্জুনও ব্রহ্মাস্ত্র পেয়েছেন, কিন্তু অশ্বত্থামার বিশ্বাস ছিল তিনি ব্রহ্মাস্ত্রেও মারা ‌যাবেন না, কারণ তিনি মহাদেবের বর পেয়েছিলেন। অশ্বত্থামা ছিলেন অমর। তাঁকে স্বয়ং মহাদেবতো বটেই স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল কারও মারার ক্ষমতা নেই। সেই অহং বলেই ব্রহ্মাস্ত্র তুলে নেন পাণ্ডবদের সমূলে ধ্বংস করতে। বাসুদেব কৃষ্ণ আন্দাজ করেছিলেন অর্জুন এবং অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রের লড়াই হলে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হবে। তাই অর্জুনকে ব্রহ্মাস্ত্র ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন। অর্জুন তাই করেন। একই কথা বলা হয়েছিলো অশ্বত্থামাকে, কিন্তু তা শোনেননি তিনি। অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্র গিয়ে পড়ে গর্ভবতী উত্তরার গর্ভে। সেই সময় ভ্রুণ অবস্থায় ছিলেন অভিমন্যুর পুত্র পরিক্ষীত। গর্ভেই মৃত্যু হয় পরিক্ষীতের। এরপরেই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন বাসুদেব কৃষ্ণ।

তিনি অশ্বত্থামাকে বলেন তুমি এমন বীরত্বের প্রমাণ দিয়েছো ‌যা লজ্জাজনক। ‌যে শিশু মায়ের গর্ভে রয়েছে তাকেও হত্যা করতেও ছাড়োনি। তোমার এই ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য তোমাকে ক্ষমা করা হবে না। তুমি অমর হতে চেয়েছিলে তাই থাকবে। এই সংসারের প্রত্যেকটি জীবন, পদার্থ নশ্বর, সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে ‌যাবে কিন্তু তুমি থাকবে। কারণ মহাদেবের বরপুত্র তুমি। তাই মহাদেবকে অসম্মান করব না। তুমি বেঁচে থাকবে। কিন্তু তোমার বেঁচে থাকাটা এতটা ‌যন্ত্রণাদায়ক হবে ‌যে, তুমি মৃত্যু চাইবে প্রতি পদে, কিম্তু তোমার মৃত্যু আসবে না। তোমার সারা শরীর গলে পচে ‌যাবে, নরকের কীট তোমায় কুরে কুরে খাবে অথচ মৃত্যু আসবে না। ‌যে বর পেয়ে তোমার অহংকার চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে, সেই বরই তোমার মুক্তির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

কৃষ্ণের এই অভিশাপের ফলে লোকবিশ্বাসে অশ্বত্থামা এখনও বেঁচে আছেন, থাকবেন অনাদি অনন্তকাল ধরে। কিন্তু কোথায় আছেন অশ্বত্থামা? কোনও পাতাল লোকে? নাকি মর্ত্যেই আছেন মুক্তির অপেক্ষায়? অসিরগড় কেল্লা, বুরহানপুর, মধ্যপ্রদেশ। এখানেই রয়েছেন অশ্বত্থামা। না গল্প কথা নয়, স্থানীয়দের দৃঢ় বিশ্বাস নির্জন পাহাড়ের পাশে প্রাচীন কেল্লার আশে পাশে ‌যে ছায়ামানব ঘুরে বেড়ায় তিনি অশ্বত্থামা। বিজ্ঞান ও ‌যুক্তিবাদী স্থানীয় কিছু ‌যুবকও চিরাচরিত এই বিশ্বাসকে সমূলে উৎখাত করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরাও ‌যা অনুভব করেছেন, তাতে তাঁদের ধ্যান ধারণা বদলে গিয়েছে। পারতপক্ষে ওই অঞ্চলটাকে এড়িয়েই চলেন তাঁরা। ঠিক কী দেখেছেন স্থানীয়রা? লম্বা চওড়া বীরসেনার মতো এক চেহারার মানুষ, সারা শরীর ক্ষত বিক্ষত। চোখে মুখে ‌যন্ত্রণার ছাপ, প্রত্যেকের কাছেই একটাই আর্তি জানান তিনি,ওষুধ দেওয়ায় সারা শরীর তাঁর জ্বলে পুড়ে ‌যাচ্ছে, কপালে দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে। অনেকটাই পুরাণে বর্ণিত গল্পের মতো। কিন্তু এখানেই কেন অশ্বত্থামার বাস? মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রে অধুনা হরিয়ানায় রয়েছে। ‌যুদ্ধের পর, অশ্বত্থামা চলে আসেন মধ্যপ্রদেশের দিকে। সেইসময় এই অঞ্চল আরও ঘন জঙ্গল ছিল, আরও একটা কারণ ছিল এই জঙ্গলের মধ্যে ছিল প্রাচীন ঋষিদের তপোভূমি। হয়তো শাপমোচনের জন্যই অশ্বত্থামা এই পথ ধরেছিলেন।

মহাভারতের অন্যতম চরিত্র অশ্বত্থামা

লোককথায় বলছে, ‌যেহেতু মহাদেব তাঁকে অমরের বর দিয়েছিলেন তাই সেই বর ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ফের মহাদেব আরাধনা শুরু করেন। মহাদেবের কৃপাদৃষ্টিতেই তাঁর অভিশপ্ত জীবন মুক্তি পেতে পারে। বুরহানপুরে এই অসিরগড় কেল্লার কাছেই একটি প্রাচীন শিবমন্দির আছে। সেখানেই প্রায় দেখা ‌যায় এই ‌যুদ্ধবিধ্বস্ত ছায়া মানব অশ্বত্থামাকে। ওই ছায়ামানব কি কখনও কারও ক্ষতি করেছে? স্থানীয়দের মত, না কোনও ক্ষতি করেনি, কিন্তু ‌যাঁর জীবন অভিশপ্ত, তাঁর সঙ্গে থাকাটা উচিত নয়। পাহাড়ে ঘেরা এই নিস্তব্ধ, নির্জন এলাকা অশ্বত্থামার এলাকা বলে পরিচিত। তাই স্থানীয়রা এড়িয়ে চলেন এলাকাটিকে। আর ‌যাঁরা সহস্রাব্দ ধরে চলা প্রাচীন বিশ্বাস ভাঙতে ‌যান, তাঁদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে ‌যায় এক লহমায়। আপনি বিশ্বাস করুন বা অবিশ্বাস, কিন্তু অশ্বত্থামা ‌বিশ্বাসে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন।

আমার দৃঢ় বিশ্বাসের মধ্যে নিজের মতো করে এই লেখাতে মানব সভ্যতার যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছি সে কথাগুলো তুলে ধরছি। মহাভারত একটি বিশাল যুগের জনমানুষের জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অতি উজ্জ্বল বর্ণে চিত্রিত কথকতা। কারবালা পুরাণের মতো এর ঘটনাপ্রবাহ একমুখী নয়, বিস্তারিত। পঞ্চপাণ্ডবের কীর্তি কথা, কৃষ্ণের মাহাত্ম্য, কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে দুর্যোধনের শত ভ্রাতার বিনাশ, পরিশেষে পঞ্চপাণ্ডবের উত্থান ও প্রতিষ্ঠা মহাভারতের প্রতিপাদ্য। বংশীয় প্রতাপ ও আধিপত্য, রাজ্যবিস্তার, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এর মূল বিষয় হলেও- এতে বহু শ্লোকে মূল ঘটনা বহির্ভূত অনেক কাহিনী ও তত্ত্বকথা স্থান পেয়েছে। এদিকে উল্লেখযোগ্য মহাভারত রচনার এই শ্রুতি আছে- শূদ্রদের বেদ চর্চার অধিকার না থাকায় কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদ ব্যাস তাদের পঠন-পাঠন ও ধর্ম সাধনের জন্য মহাভারত লিপিবদ্ধ করেন। এরকম প্রসিদ্ধি আছে মহাভারত রচনার জন্য লেখক নির্ধারণকালে ব্রহ্মা তাকে গণেশের সাহায্য গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। গণেশ বিরামহীনভাবে লেখার শর্ত দিয়ে রাজী হলে দ্বৈপায়নও পরিশর্ত প্রদান করেন যে, গণেশ না বুঝে তার শ্লোক লিপিবদ্ধ করতে পারবেন না। মহাভারত রচনাকালে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন নতুন প্লট সৃজনের সময় আহৃত করার জন্য মাঝে মধ্যে দুর্বোধ্য শ্লোক বলতেন- যা বুঝে লিখতে গণেশকে কালক্ষেপণ করতে হতো। এসময় পরবর্তী শ্লোক রচনা করতেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। মুসলিম মিথে কারবালার ঘটনার প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যায় গ্রীক নিয়তিবাদের মতো করে। একদা শিষ্যমণ্ডলী বেষ্টিত মোহাম্মদের বিষণ্ন মুখমণ্ডল দেখে প্রধান সাহাবী তার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। নবীজী উত্তর করলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কাহারো সন্তান প্রাণাধিক প্রিয় হাসান হোসেনের পরম শত্রু হইবে। হাসানকে বিষপাণ করাইয়া মারিবে এবং হোসেনকে অস্ত্রাঘাতে নিধন করিবে।’

কারবালা প্রান্তর

গ্রীস মিথের মত কারবালার ঘটনা সংঘটনের নেপথ্যে এরকম নিয়তিবাদ সক্রিয় ছিল- প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। এমনকি হোসেন তার ধৃত ও  নিহত হবার স্থান কারবালা পূর্বজ্ঞাত হয়ে-পরিদর্শন করে আসে। মহাভারতের কুরুক্ষেত্র এবং কারবালার ধর্মযুদ্ধ দুটিরই নেপথ্য কারণ-বংশীয় আধিপত্য রক্ষা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, রাজ্যবিস্তার, ক্ষমতালিপ্সা, নারী, সিংহাসন ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব। ক্ষেত্রজ রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর একজন শতপুত্র ও অন্যজন পঞ্চপুত্র নিয়ে স্বরাজ্য শাসন করছিলেন। তদুপরি পাণ্ডুর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে পঞ্চভ্রাতা তাদের ধর্মনিষ্ঠা অশ্বমেধযজ্ঞ সাধনের মাধ্যমে প্রাচুর্য ও রাজ্যব্যাপী খ্যাতি লাভ করে। ধৃতরাষ্ট্র পুত্র ঈর্ষান্বিত দুর্যোধনাদিরা চক্রান্তের জাল বুনে পাণ্ডবদের নানামাত্রায় বিপদগ্রস্ত করে তোলে। কারবালার যুদ্ধ সংঘটনের নেপথ্য মূল কারণ ছিল কুরাইশ ও ঊমাইয়া বংশের বংশীয় আধিপত্য ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিমিত্ত।

মোয়াবিয়া পুত্র এজিদ শাসক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দামেস্ক নগরীতে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও সুসজ্জিত সেনাপূর্ণ নগরে পরিণত করেন। তথাপি হাসান হোসেনের ধর্মনিষ্ঠা, দীনহীন, রাজ্য ধর্মপালন জনসাধারণকে বেশি আর্কষণ করে। রাজ্য বিস্তার ও আরব জাহানের কর্তৃত্বের সঙ্গে কারবালার যুদ্ধ সংঘটনের একটি পূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়ায় জয়নব। জয়নবকে বিয়ে করার জন্য এজিদ নানাবিধ কৌশলের আশ্রয় করলেও জয়নব অনুরক্ত হয় হাসানের প্রতি।

মহাভারতের কৌরব পাণ্ডব যুদ্ধেও একটি শক্তিশালী অন্যতম কারণ দ্রুপদ কন্যা দ্রৌপদী। ধৃতরাষ্ট্রপুত্র দুর্যোধনাদির কূটকৌশলে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির পরাজিত হলে শেষ পণ হিসেবে দ্রৌপদীকে রাজসভায় চরম অপমান করা হয়। দুঃশাসন দ্রৌপদীর চুলের মুঠি ধরে রাজসভায় নিয়ে আসে এবং তার বস্ত্র হরণের প্রচেষ্টা চালায়। এ সময় ভীমের প্রতিজ্ঞা পরবর্তীকালে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে বেগবান করে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।

 

Related Articles

Back to top button
Close