fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

দুদিনেই শেষ সরকারের দু’কেজি চাল, খাবারের জন্য কাঁদছে শিমুরালির আদিবাসীরা

অভিষেক আচার্য, কল্যাণী: অজানা আশঙ্কায় ১০ বছরের রোহিত সর্দার। বাড়ি নদীয়ার চাকদা ব্লকের তাঁতিগাছি সর্দারপাড়া। দুবেলা জুটছে না ভাত। আধপেটা খেয়েই চলছে নিত্যদিন। লকডাউনের পর এই আদিবাসী উপজাতিদের পরিস্থিতি কী সেই চিত্রই তুলে ধরা হল এখানে।

 

৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে শিমুরালী এলাকায় বসবাস ২৫টি আদিবাসী পরিবারের। বাড়ির এক কোনে ছুটে বেড়াচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় মেতে রয়েছে একরত্তি ছেলে রোহিত। বাবা স্বপন সর্দার। পেশা কান পরিষ্কার করা। লকডাউনের পর থেকেই তালাচাবি দিয়ে রেখেছেন কান পরিষ্কার করার বাক্সটি। বাড়ির সদস্য সংখ্যা চমকে যাওয়ার মত। চার ছেলে ও এক মেয়ে সহ মোট আট জন। বেকার হয়ে আটটি পেট ভরাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বপনকে।

এ বিষয়ে স্বপন বলেন, সরকারের দু কেজি চাল কী হবে? ও তো দুদিনেই শেষ। কয়েক জন চাল, ডাল দিয়ে গেছে। কিন্তু তাতেও কুলোয়নি। এখন তাই আধপেটা অবস্থায় থাকি। যে দিন চাল থাকে সেদিন উনুন জ্বলে যেদিন থাকে না সেদিন…বলেই থেমে গেলেন স্বপন। বাকিটা বুঝতে আর অসুবিধা হলো না। অন্যদিকে, আপনমনে কচিকাঁচা বন্ধুদের সাথে খেলায় মত্ত রোহিত।

১৫-২০ হাত লম্বা, চওড়া প্রায় ৭-৮ হাত। চারদিকে কালো পলিথিন দিয়ে ঘেরা। পলিথিনের ছাদ। মেঝে মাটির। ২৫টি পরিবারের বাড়ির ছবি এটাই। আদুরি সর্দার, রোহিতের পাড়ার কাকিমা। তিনি জানান, ছেলেমেয়ে অনেক কিছুই চায় যা এখন দিতে পারছি না। স্বামী বেকার। রাস্তার ধারের কচু বাজারে বিক্রি করে প্রতিদিন ৭০-৮০ টাকা পাওয়া যায়। সেই টাকা নুন, তেল কিনতেই শেষ। ছেলে মেয়েদের ভালো খাবার দেব কি করে? অনেকেই আসেন। চাল, ডাল দিয়ে যান। কিন্তু সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই তলানিতে দু-চারটে চাল-ডাল পড়ে থাকে। তখন অনাহারে থাকতে হয় সবাইকে। এতক্ষনে খেলাধুলো করে ক্লান্ত রোহিত। দৌড়ে এসে দাঁড়ালো তার মায়ের সামনে। চোখমুখ, নানান অঙ্গভঙ্গি দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না প্রচন্ড খিদে পেয়েছে ছেলেটির।

নীলা সর্দার, ষাটোর্ধ মহিলা। বাড়িতে বৃদ্ধ স্বামী ও তিনি। ছোট সংসার। সন্তান থাকা সত্ত্বেও ভাঁড়ারে টান পড়েছে। তিনি জানান, বুড়ো অচল। খাবারের জন্য কাঁদছে। নুনভাত, ফ্যান ভাত একটা কিছু হলেই চলবে। দুদিন খাবার পড়েনি পেটে। ছেলে মেয়ে নেই? প্রশ্ন করতেই বৃদ্ধা কেঁদে ফেললেন। বলেন, সব আছে। কিন্তু আলাদা থাকে। পয়সা চাইলেই বলে আমাদের চলছে না। তোমাদের দেখবো কি করে।

এতক্ষনে চোখের আড়ালে চলে গেছে সে। খোঁজ পড়লো রোহিতের। কোথায় দস্যি ছেলেটি। তার মা বললেন, খেতে বসেছে। ঘরে যেতেই চোখে পড়লো, রোহিত বসে মাটির মেঝেতে। থালায় এক মুঠোরও কম শুকনো ভাত। সাথে অল্প নুন পাশে এক ঘটি জল। পরম তৃপ্তিতে সেটাই আহার করছে সে। প্রশ্ন জাগলো আগামীকাল, পরশু এইটুকু অন্নও কি জুটবে রোহিতদের? শুধু তাঁতীগাছী কেন? এই সমস্যা বিশ্বের। রোহিতের খিদের জ্বালা মেটাবে কে? ওই মূঢ় ম্লান মুখে কে তুলে দেবে একটু রুটি, মুড়ি কিংবা ফ্যান একবাটি। আর কতদিন? ক্ষুদা যে ক্রমশ গ্রাস করছে। উত্তর জানা নেই। কারণ, অসুখটা যে গোটা পৃথিবীর।

Related Articles

Back to top button
Close