fbpx
গুরুত্বপূর্ণবাংলাদেশব্লগহেডলাইন

বাংলাদেশ এবং নব্য গণতন্ত্র

তাপস দাস: বিগত বেশ কিছু মাস যাবৎ বিভিন্ন সুখ্যাতি সম্পন্ন পত্র-পত্রিকা এবং প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা অনুসারে করোনা পরিস্থিতির সময়ে ও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। সকলের অনুমানের উপর ভিত্তি করে বলা যেতে পারে ভবিষ্যতে এশিয়া তথা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচকের কর্ণধার হয়ে উঠতে পারে। এই উন্নয়নের পিছনে সকলে প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের অগ্রগতির করলেও বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক উন্নয়ন অথবা গণতন্ত্র নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করা হয়নি।
শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে কোন দেশের অগ্রগতির মাপকাঠি নির্ণয় করা যায় না। কোন দেশ কতটা সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে তার অন্যতম মাপকাঠি হল সেই দেশের সংখ্যালঘুরা কতটা সুরক্ষিত কিংবা দেশের উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে কিনা?।
বাংলাদেশের বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ একনায়কতান্ত্রিক অথবা আদায় একনায়কতন্ত্র শাসনব্যবস্থা রূপে নামাঙ্কিত করলেও একথা অস্বীকার করা যায় না বর্তমানে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা বিগত যেকোনো শাসনের তুলনায় যথেষ্ট ভালো আছে। বলা যেতে পারে হয়তো পুরোপুরি ভাবে সামগ্রিক সাম্য আসেনি তবে বেশ কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা স্বীকার করতেই হবে বিশ্বের যে কোনও দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থা বর্তমানে ভালো।

বিগত একাদশতম নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসের অন্যতম নির্বাচন কারণ এই নির্বাচনে ৭৯ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নির্বাচন পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন শুধু তাই নয় এই নির্বাচনের আগে এবং পরে সংখ্যালঘুদের ওপর কোনও রকম আক্রমণ কিংবা হামলা হয়নি। বাংলাদেশের বিগত সময়ে সংখ্যালঘু অত্যাচারের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল নির্বাচনী অত্যাচার শারদ উৎসবে হামলা এবং রাষ্ট্রীয় হিংসা সমূহ। সেই দিক থেকে এ বছরের দুর্গা পুজো ছিল বাংলাদেশের দূর্গোৎসবের ইতিহাসে অন্যতম অধ্যায় কারণ এ বছর পুজো চলাকালীন সংখ্যালঘুদের উপর একটিও ঘটনা ছাড়া অন্য কোন রকম হিংসার ঘটনা ঘটার খবর পাওয়া যায়নি আগের বছর যে সংখ্যাটি ছিল ১১।
শুধু তাই নয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা বিশেষ করে হিন্দু জনসংখ্যা বাংলাদেশ বৃদ্ধি পেয়েছে।এই বৃদ্ধির পিছনে যে কারণগুলো অনুমান করা যেতে পারে সেগুলি হল প্রথমত ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি জামাতের শাসনকালে যে তিন লক্ষ সংখ্যালঘু ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয় গত ১০ বছরে তাদের মধ্যে প্রায় আড়াই লক্ষ জনগণ ফিরে এসেছে। উপরন্তু ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালে নতুন ভোটার তালিকায় প্রচুর ভোটারের নাম বাতিল হওয়ার ফলে সংখ্যালঘুদের বৃদ্ধি বর্তমানে চোখে পড়েছে। আরেকটি কারণ হল বাংলাদেশের লক্ষণীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যার ভাগীদার সংখ্যালঘু গোষ্ঠীসহ সকল শ্রেণীর মানুষ। বর্তমানে বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭৩ বছর যা বিশ্বের গড় আয়ু থেকে এক বছর বেশি তদুপরি বাংলাদেশে এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে ২১ শতাংশ মানুষ।এই পরিকাঠামোগত পরিবর্তনের সুফল পাচ্ছে সকলেই। এছাড়াও সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পুলিশ প্রশাসনে সংখ্যালঘুদের হার বৃদ্ধি নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় ও করেছে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রয়োগ দেখা দিয়েছে। বর্তমান সময়ে শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিষয়টিও নিশ্চিহ্ন গিয়েছে।
নবম জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে ঘাতক-দালালদের ফাঁসি, মাদকপাচার সহ সন্ত্রাস দমনে বঙ্গবন্ধুকন্যা যেভাবে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা করেছে তা এককথায় অনবদ্য। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির একটি ডিসকোর্স পরিণত হয়েছে তাই মুক্তিযুদ্ধের আবহকে মাথায় রেখে জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যেক বছরের ন্যায় এবছর ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার ‘স্লোগান’ এর মধ্যে দিয়ে সাম্যের বাণী প্রচার করেছেন অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল মন্তব্য করেছেন ‘দেবী দুর্গার মত অসত্য অসুন্দরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নেয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে ‘এখানেই শেখ হাসিনার জয় এখানেই মুক্তিযুদ্ধের জয়।
গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক সংজ্ঞা অনুসারে গণতন্ত্রের অধিকার দুইভাবে সমাজের ওপর কাজ করতে পারে। প্রথম প্রক্রিয়াটি সমাজের সংস্কৃতিকে নিচের দিকে টেনে নেবে, দ্বিতীয়টি উপরের দিকে তুলে ধরতে চাইবে। দু দিক দিয়েই সাম্য তৈরি হতে পারে প্রথমটা নিচের মানে নিয়ে এসে দ্বিতীয়টি উপরের স্তরে প্লেন নতুন ধরনের সাম্যের অবস্থা সৃষ্টি করে অন্যদিকে তার মনে করেন যে গণতন্ত্রের প্রধান বিশেষত্ব হল রাজনৈতিক হিংসা প্রশমিত এবং নিয়ন্ত্রিত করে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

একইভাবে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলা যেতে পারে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র সংবিধানে পুনরায় ফিরে এলেও বর্তমান বাংলাদেশের ইসলামীকরণের পিছনে সরকারি মদত আছে। যদিও একথা অস্বীকার করা যাবে না জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গৃহহীনদের গৃহদান বিদ্যুৎ সরবরাহ দারিদ্রতা মোচন মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে যে প্রক্রিয়ায় একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে বা হয়েছে সেটি বিগত যেকোনও গণতন্ত্রের সংজ্ঞার থেকে নতুন এক প্রকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্ম দিয়েছ যাকে নব্য গণতন্ত্র বলে যথার্থ হবে বলে আমার মনে হয়।

আসলে এদের পরিসংখ্যান লক্ষ করা যায় তবে দেখা যাবে বাংলাদেশের ৪৯ বছরের ইতিহাসে মাত্র ২০ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছে ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থ বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশে ছিল সামরিক শাসন বা সামরিক বাহিনী সমর্থিত মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর দলীয় শাসনের অধীনে স্বভাবতই যে দেশ এত বছর মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সামরিক শাসনের অধীনে থাকে সেখানে গণতন্ত্র হত্যা হয় শুধু তাই নয় সেই সময় সংবিধানের মৌল নীতির পরিবর্তন এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার স্থগিত করার ফলে শুধু যে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়েছে তা নয় লাঞ্চিত হয়েছে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন।

তবে দেশত্যাগ এবং জমি দখলের ঘটনা এখনও ঘটছে দেখা যাচ্ছে বর্তমানে যারা জমি দখলের সঙ্গে জড়িত তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সদস্যদের মূল কারণ হল অনেক জামাতপন্থী আওয়ামী লীগ দলে প্রবেশ করেছে যারা এই ঘটনাগুলো ঘটছে। তবে সর্বোপরি এ কথা মনে রেখ নিতেই হবে যদি সত্যিই বর্তমান সময়ে অত্যাচারের মাত্রা চরমে পৌঁছেছে তবে আগের বছরের মতো এ বছরও ৩০, ০০০ এর বেশি দুর্গাপুজো করা সম্ভব হত না।

 তাপস দাস-গবেষক প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close