দেশহেডলাইন

রাষ্ট্রীয় স্তরে আরও বেশি গুরুত্ব পাক বাংলা

ইন্দ্রানী দাশগুপ্ত, নিউ দিল্লি: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলা ভাষাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত  করার দাবি জানালেন দিল্লির প্রবাসী বাঙালিরা। বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কে বরণ করে নিয়ে বাংলা ভাষার আরো বেশি প্রচার এবং প্রসারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ এবং নব প্রজন্মকে আরও বেশি করে বাংলা ভাষার প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন তাঁরা।

মিনি বেঙ্গল বলে পরিচিত দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের অধিবাসীরা মূলত আয়োজন করেছিলেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। এছাড়াও সমগ্র দিল্লির বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান ভাষা শহীদদের। এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের ব্যারিস্টার কবির শংকর বোস বললেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সকল অভিভাবক অভিভাবিকা দের কাছে আবেদন জানাচ্ছি দয়া করে সবাই তাদের সন্তানদের মাতৃভাষা পড়ান। আমি মানছি যে ইংরেজী মাধ্যমে পড়া বর্তমান যুগে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ।কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মাতৃভাষার চর্চা করা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের কাজে এবং ভবিষ্যতের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমি ছোট থেকে বিভিন্ন দেশে ঘুরেছি ।যখন সিঙ্গাপুরে ছিলাম যখন ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করতে গেছি ,আমাকে কিন্তু আমার বাবা-মা নিয়মিত বাংলা ভাষা চর্চা করাতেন। যার ফল পরবর্তীকালে আমি আমার কর্ম জগতে ভীষণ ভাবে উপকৃত হয়েছি। কারণ ভাষা হল একটা সংস্কৃতির ধারক-বাহক। আমার সংস্কৃতিতে কি আছে সেটা যদি আমি সঠিকভাবে জানতে না পারি তাহলে কখনোই সম্পূর্ণভাবে সঠিক মানুষ হয়ে ওঠা যায় না।

একইভাবে জীবনের মূল্যবোধগুলো বোঝার ক্ষেত্রে ও সংস্কৃতি এবং ভাষার যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। কারণ আমার জীবন সূত্র যেখানকার দিনের শেষে আমি কিন্তু সেখানকার ই। আমি বাঙালি বলতে গর্ববোধ করি, আমি বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে ধুতি-পাঞ্জাবি  পড়তে গর্ববোধ করি ,আমি বাংলায় কথা বলতে গর্ববোধ করি ।বাংলা ভাষা আমার জীবনের ভাষা ।আমি আমার মাতৃভাষায় যেমন সাবলীল তেমনি অন্যান্য অনেক বিদেশি ভাষাতেও সাবলীল ।আমি চাই আমার বাংলা ভাষার প্রচার এবং প্রসারের জন্য সরকার আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবুক এবং আঞ্চলিক ভাষাগুলোর আরো বেশি উন্নয়নের জন্য বিশেষ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।

জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপিকা সুচরিতা সেন এর মতে আমি আমার ভাষাকে ভীষণ ভালোবাসি ।আমি বাংলায় কথা বলতে ভালোবাসি ।এই প্রবাসে যেখানে আমি বাঙালি পাই সে অধ্যাপক কি হন বা ছাত্র-ছাত্রী আমি সবাইকে ঘরোয়া আলোচনার সময় বাংলায় কথা বলতে অনুরোধ করি ।কারণ আমি মনে করি এর ফলে বিশেষত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বাংলায় কথা বলার প্রবণতা বাড়ে। কারণ যদি যুব সমাজকে বা আগামী প্রজন্মকে আমরা মাতৃভাষা এবং মাতৃ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানাতে বোঝাতে না পারি তাহলে একটা সময় ধীরে ধীরে সবটাই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাবে। আমি সকল আঞ্চলিক ভাষা গুলোকে সমানাধিকার দেওয়ার পক্ষে বিশ্বাসী। আমাদের বহু ভাষাভাষীর দেশ ভারত বর্ষ ।সেখানে একটা বিশেষ ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই ।থাকুক না আমার বাংলা ভাষা আমার মনে আমার হৃদয়ে। আমার ভালোলাগার ভাষা বাংলা ,আমার আবেগের ভাষা  বাংলা ,আমার যন্ত্রণার আনন্দের দুঃখের বহিঃপ্রকাশের ভাষা বাংলা ।ঠিক তেমনি একজন তামিল ভাষাভাষী মানুষের বা একজন ওড়িয়া বা  মারাঠি ভাষাভাষী মানুষের জন্য তাদের ভাষা ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই অবশ্যই আমার ভাষা আরও বেশি গুরুত্ব পাক এবং তার থেকেও বেশি চাই নতুন জেনারেশনকে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা সম্বন্ধে জানাতে এবং পড়াতে। আমি যেমন আমার মাতৃভাষাকে সম্মান করি সেরকমই আমি সকল মাতৃভাষাকে সম্মান করি । কিন্তু একই সাথে যদি কেউ আমার মাতৃভাষাকে অপমান করতে চায় সেটাও কিন্তু আমি মেনে নিতে পারিনা এবং সেই জায়গা থেকে যতটা প্রতিবাদ করার দরকার সেটাও কিন্তু আমি করি ।আমি পছন্দ করি না কেউ আমার ভাষাকে অবহেলা করুক। মাতৃভাষা দিবসে আমি সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে একটাই আবেদন করব ,আরও বেশি করে নিজের নিজের মাতৃভাষাকে জানো এবং পড়ো ।

আরও পড়ুন : ভাষা দিবসের অনুপ্রেরণা দিতে এগিয়ে যেতে চাইছে ত্রিপুরা

নাট্যকর্মী রত্না কর এর মতে আমার প্রতিবাদের ভাষা বাংলা ,আমার অভিনয়ের ভাষা বাংলা। আমি বাংলা ভাষাতে বেঁচে থাকতে ভালোবাসি ।আমি আমার সংস্কৃতিকে ভালোবাসি আমি চাই আরো বেশি করে বাংলা বই এবং বাংলা সাহিত্য রচনা করা হোক। দিল্লির স্কুলগুলোতে হিন্দির সাথে সাথে বাংলাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হোক ।প্রত্যেকটা স্কুলে অন্তত যেসব জায়গায় বাঙালি ছাত্রছাত্রীরা বেশি পড়েন সেখানে বাংলা সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে বাৎসরিক অনুষ্ঠান করা হোক। প্রতি বছরের বাংলা সংস্কৃতির বিকাশের জন্য বাংলা নাটকের প্রতিযোগিতা করা হোক এবং সবথেকে বেশি ঘরে ঘরে রবীন্দ্রনাথ নজরুল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের চর্চা করা হোক। যাতে ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি একটা আবেগ তৈরি হয়। কারণ ভাষা-সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক ।যদি কেউ বাংলা সংস্কৃতিকে জানতে চান তবে তাকে বাংলা ভাষা সম্বন্ধে জানতেই হবে ভাষা না জানলে সংস্কৃতিকেও বোঝা যাবে না। তাই মাতৃভাষা ও মাতৃ সংঘ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে তার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও এই ব্যাপারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে আমি মনে করি।

বঙ্গীয় সমাজ দিল্লি প্রান্তর কর্ণধার সুব্রত বিশ্বাস এর মতে প্রতিবছরই আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে নানান ভাবে পালন করি। তার মধ্যে যেমন থাকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বাংলা ভাষা চর্চার জন্য বিভিন্ন ছোট ছোট কর্মশালা। চিত্তরঞ্জন পার্কের বাঙালি তো আছেনই তাছাড়াও দিল্লিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন প্রায় সাড়ে ১৪ লক্ষ বাঙালি ।তারা বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের মতো করে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে উদযাপন করেন। আমাদের দাবি হল বাংলা ভাষাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক এবং আঞ্চলিক ভাষা গুলো কে তাদের নিজেদের অঞ্চলের গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বভারতীয় স্তরে একটা বিশেষ পরিচয় দেওয়া হোক। যেমন দিল্লিতে হাতে গোনা কয়েকটা স্কুল আছে যেখানে বাংলা ভাষা পড়ানো হয় ।আমরা চাই বাংলা ভাষাভাষী লোকেরা যেসব অঞ্চলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বসবাস করেন যেমন চিত্তরঞ্জন পার্ক, লক্ষ্মীনগর ,করোল বাগ গান্ধীনগর এর সমস্ত জায়গায় স্কুলগুলোতে বাংলা ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে পড়ানো হোক।

কারণ স্কুল পাঠ্যতে যদি বাংলা ভাষা থাকে তাহলে ছাত্রছাত্রীরা আবশ্যিকভাবে বাংলা শিখবে এবং বাংলা পড়তে ও লিখতে জানবে ।তার ফলে ভাষার সাথে সাথে বাংলা সংস্কৃতির যথেষ্ট বিকাশ ঘটবে বলে আমরা মনে করি। একই মত পোষণ করেন জেনারেশন ওয়াই এর প্রতিনিধি রুচিরা ভট্টাচার্য্য ও।পেশায় ইঞ্জিনিয়ার রুচিরা বলেন ইউনেস্কোর মতে পৃথিবীর সব থেকে মিষ্টি ভাষার নাম বাংলা। আমরা এই কঠিন এবং মিষ্টি ভাষাতে কথা বলতে পড়তে এবং লিখতে শিখেছি। দিল্লিতে ইদানিং একটা ট্রেন্ড দেখছি ,মাতৃভাষা ভুলে গিয়ে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলার। এটাকে অনেকেই খুব স্মার্টনেস বা আধুনিকতা বলে ভাবছেন ।এবং একইসাথে অনেকেই বাংলা ভাষায় কথা বলাকে একটু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখছেন। আমি ছোটবেলা থেকেই প্রচুর বাংলা সাহিত্য পড়ে বড় হয়েছি ।আমি বাড়িতে সবসময় বাংলাতে কথা বলি। এই নতুন ট্রেন্ড এর জন্য যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা আমার কাছে পড়াশোনা করতে আসেন তারা বাংলা বলতে বা বাংলায় পড়তে একটু অস্বচ্ছন্দবোধ করে দেখছি সম্প্রতি। সমাজের কাছে মাতৃভাষা দিবসে আমার দাবী হল জন্মের পর যে ভাষাতে আমি প্রথম কথা বলি যে ভাষাতে আমি মাকে মা বলে ডাকি যে ভাষাতে আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি সেই ভাষাটাকে অবহেলা না করে আগামী জেনারেশনকে বলতে এবং পড়তে শেখান এবং একই সঙ্গে মাতৃভাষার প্রতি আবেগ ,ভালোলাগা এবং ভালোবাসা জাগিয়ে তুলুন।

আরও পড়ুন : লাল ঝাণ্ডার ভরসা একমাত্র তরুণরাই: গৌতম দেব

সুপ্রিমকোর্টের বরিষ্ঠ আইনজীবী দেবাশীষ সুরের কথায় বাংলার মত সুন্দর আর মিষ্টি ভাষা একটাও নেই ।দিল্লিতে সব ভাষা মিলে গিয়ে একটা হিন্দি ভাষা তৈরি হয়েছে ।দিল্লিতে যারা বসবাস করেন তাদের কারোরই মাতৃভাষা কিন্তু এই প্রচলিত হিন্দি ভাষা টা নয়। যেমন ধরো বিহার থেকে যারা আসে তারা ভোজপুরি ভাষায় কথা বলেন বা  উত্তর প্রদেশের বা মধ্য প্রদেশের ভাষা ও কিন্তু আলাদা। এর ফলে কি হচ্ছে যারা বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসে দিল্লিতে বসবাস শুরু হচ্ছে তারা তাদের নিজস্ব মাতৃভাষাকে আঁকড়ে ধরে থাকছেন যেমন ঠিক ই কিন্তু তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এক নতুন পাঁচমিশালী  ভাষা শিখে বড় হচ্ছে। এবং তারা ধীরে ধীরে মাতৃভাষার প্রতি আবেগ হারিয়ে ফেলছে ।এক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্ব নিতে হবে নিজেদের মাতৃভাষাকে সম্মান জানানোর এবং পরবর্তী প্রজন্মকে মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলার। আমি দিল্লি সরকারের কাছে আবেদন জানাব আরো বেশি করে লাইব্রেরী গুলোতে বাংলা ভাষার বই রাখুন এবং বাংলা ভাষাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিন কারণ  জনসংখ্যার বিচারেদিল্লির তৃতীয় বৃহত্তম ভাষা কিন্তু বাংলাই।

রাজনীতিবিদ লক্ষী সাউ  কিন্তু আবার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান ।তার মতে আমি মনে করি সকল বৃহত্তম আঞ্চলিক ভাষা গুলোকেই রাষ্ট্রভাষা করা উচিত। ভারতের মতো বহু ভাষাভাষীর দেশে কখনই একটা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া যাবে না ।তাহলে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষরা আঘাত প্রাপ্ত হবেন এবং সমস্যা তৈরি হবে ।সেই জায়গা থেকে যদি পাঁচটা ভাষাকেও রাষ্ট্রীয় ভাষার সম্মান দেওয়া হয় তাহলে বাংলা কে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবি জানাচ্ছি আমি ।কারণ পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে ওখানকার বর্তমান সরকারের মদতে বাংলার জায়গায় স্কুলের পাঠ্য বইতে উর্দু বা হিন্দি ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে সেই জায়গা থেকে মনে হয়  একটা সময় হয়তো বাংলা ভাষাটাকে সুপরিকল্পিতভাবে হটিয়ে দিয়ে অন্য কোন ভাষাকে ভোটের রাজনীতির জন্য ব্যবহার করা শুরু  করবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পশ্চিমবঙ্গের যেভাবে স্কুলে স্কুলে বঙ্গ সংস্কৃতি বাঁচানোর জন্য ছাত্রীদের আন্দোলন করতে হচ্ছে ,বাংলা ভাষার শিক্ষকের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে ছাত্রদের পুলিশের গুলিতে মরতে হচ্ছে সেই জায়গা থেকে প্রবাসে বসেও বাংলা সংস্কৃতি এবং সাহিত্য নিয়ে আমি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আমার আবেদন, যদি কোন ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার গুরুত্ব দেওয়াই হয় সেই ক্ষেত্রে যেন বাংলা ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় ।

Related Articles

Back to top button
Close