fbpx
অন্যান্যকলকাতাহেডলাইন

স্বয়ংসিদ্ধা নারী শক্তির বোধনে গর্বিত বাংলা

শুক্লা সিকদার, দমদম: চিকিৎসক এবং শিক্ষাবিদদের পরিবারে তার জন্ম I তিনি হতে পারতেন তার পারিবারিক পেশাদারিত্বের ধারক ও বাহক কিংবা বেছে নিতে পারতেন স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ সাংসারিক জীবনI পারিবারিক আভিজাত্যের উপর ভর করে গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতেন অনায়াসে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে।

কিন্তু তা হওয়ার নয় কারণ তিনি ব্যতিক্রমী। চার দেওয়ালের স্বাচ্ছেন্দ্যে তিনি সুখ খুঁজে নিতে চাননিI তার সুখ নিজেকে প্রমাণ করার মধ্য দিয়েI তার অহংকার গতানুগতিকতার প্রাচীর ভেঙে নারীর জন্য নব দিগন্তের উন্মোচনেI তিনি বাংলার নারী শক্তির প্রতিভূ, ভারতের অন্যতম ফ্যাশন আইকন, স্বনামধন্যা, স্বয়ংসিদ্ধা, তিনি অগ্নিমিত্রা পল।

ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের মতো একটি মূল ধারার থেকে আলাদা পেশাকে পাথেয় করে সাফল্য বয়ে আনা গর্বিত নারী তিনিI বলিউড এবং টলিউডে তিনি সুপরিচিত তার ব্যতিক্রমী ও মনোমুগ্ধকর ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের জন্য। ভারতের এই ফ্যাশন আইকন, বাংলার এই নারীর পথ চলা শুরু বলিউডের জনপ্রিয় নায়িকা ও পরিচালিকা শ্রীদেবীর হাত ধরেI অগ্নিমিত্রা শ্রীদেবীর কথা অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে মনে করেন, কারণ একজন নারী হয়ে শ্রীদেবীই অগ্নিমিত্রাকে প্রথম সুযোগ দিয়েছিলেন শ্রীদেবীর পরিচালিত সিনেমার জন্য পোশাক ডিজাইনিং করতে। শ্রীদেবীর পরিচালিত ছবি “কই মেরে দিল সে পুছে” তে অগ্নিমিত্রা হেমা মালিনীর কন্যা এশা দেওলের জন্য পোশাক ডিজাইন করেছিলেনI শ্রীদেবীর ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্যও তিনি পোশাক ডিজাইন করতেনI তাই বলা যায় আরেক ভারতীয় নারীর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল আজকের এই সফল ভারতীয় তথা বাংলার নারী অগ্নিমিত্রার জয়যাত্রাI
পরবর্তীকালে অগ্নিমিত্রা ডিজাইন করেছেন আরেক সুপ্রসিদ্ধা বলিউড অভিনেত্রী, এক সময়ে বলিউডের প্রথম সারির নায়িকা মনীষা কৈরালার জন্য। বলিউডের নতুন জেনারেশনের উঠতি তারকাদের মধ্যেও অগ্নিমিত্রার ডিজাইন করা পোশাকের যথেষ্ট সমাদর রয়েছে।

তিনি ডিজাইন করেছেন বলিউডের “ডিসকো ড্যান্সার” সিনেমা খ্যাত বাংলার নায়ক মিঠুন চক্রবর্তীর জন্য আর কলকাতার বাসিন্দা হয়ে কলকাতার প্রায় প্রত্যেক তারকার জন্যই তিনি পোশাক ডিজাইন করেছেন।

অগ্নিমিত্রার পোশাক ডিজাইনিংয়েও পাওয়া যায় তার ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণাময় জীবনের ছোঁয়া। কারণ তিনি শুধু নিজের প্রচার কিংবা ব্যাবসায়িক সাফল্যের জন্য পোশাক ডিজাইনিং করেননিI অনেক সময়ই অগ্নিমিত্রাকে দেখা গেছে অনেক বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ফ্যাশন শো করতে। যার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরতেন ভারতের সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধনের চিত্রটি কিংবা কখনও আবার তার ফ্যাশন শোয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হতো দুঃস্থ, বিপর্যস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো।

আসানসোলে জন্ম হলেও কলকাতা শহরে দীর্ঘদিন থাকার সূত্রে কলকাতার সঙ্গে অগ্নিমিত্রার যে একাত্মতা তৈরি হয়েছে তাও ফুটে উঠেছে তার ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে I কলকাতার ডাবল ডেকার বাস, কালীঘাট মন্দির রিক্সা সব কিছুই উঠে এসেছে তার ডিজাইন করা টি-শার্ট ব্র্যান্ডে।

আরও পড়ুন: তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়তেও ছিল নান্দনিকতা

যখন পৃথিবীর প্রায় সকল ফ্যাশন ডিজাইনারদের জন্য স্বপ্ন হলো নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইক, প্যারিস ফ্যাশন উইক, মিলান ফ্যাশন উইক এগুলোতে অংশগ্রহণ করা সেখানে অগ্নিমিত্রা পল আবার ব্যতিক্রমী তিনি চান নিজের ফ্যাশন ব্রান্ডকে ভারতের প্রত্যেকটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে, যাতে ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংস্কৃতি, কৃষ্টি. জীবনযাত্রার রূপরেখা তার ফ্যাশন ডিজাইনের মধ্যে উঠে আসে এবং তার ডিজাইন করা পোশাক ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়I সেই জন্য তিনি তার ডিজাইন করা পোশাকের দামও সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখেনI ঐতিহ্য আর ব্যক্তিত্বের মেলবন্ধনই অগ্নিমিত্রার ডিজাইন করা পোশাকগুলিকে অনন্য করে তোলেI ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি ও কৃষ্টির প্রতি গভীর মমতাবোধ ও আন্তরিকতার ছোঁয়াই তার ডিজাইন করা পোশাকগুলোকে বিদেশি বাজারেও করে তোলে নজরকাড়া, প্রসারিত করে ভারতীয় সংস্কৃতির মাধুর্য্য।

অগ্নিমিত্রার মতে পোশাকের ক্ষেত্রে শালীনতা নারীর আভিজাত্যকে আরো বাড়িয়ে তোলেI তাই তিনি হালফিলের কম কাপড়ের পোশাকের তুলনায় জমকালো আড়ম্বরপূর্ণ পোশাকই ব্যক্তিগতভাবে বেশি পছন্দ করেন এবং তিনি মনে করেন পোশাকে থাকতে হবে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া যা অন্যের চোখে কাউকে আলাদা করে দেখাবে, প্রকাশ করবে ব্যক্তিত্বের নতুন মাত্রা I তবে অনেক সময়ই আবার ব্যক্তিত্বের ওপরে নির্ভর করে ঠিক করতে হয় পোশাকের ধরন এবং পরিহিতার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দও গুরুত্ব পায় পোশাক ডিজাইনিং এর ক্ষেত্রে।

তাই তার ডিজাইন করা পোশাকগুলোকে অনন্য করে তোলে অগ্নিমিত্রার ভারতের তথা বাংলার নারীদের প্রতি, ভারতের সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও বৈচিত্রের প্রতি বিশেষ অনুভূতি।

সমাজসেবায় ও পেশাগতভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও অগ্নিমিত্রা আজও ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে তার কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণে অবিচল, ভারতের গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যাওয়ার পরে তার স্বপ্নের মণিকোঠায় রয়েছে প্যারিস, লন্ডন এবং মিলান ফ্যাশন উইকও I
স্বয়ংসিদ্ধা এই নারী আজ শুধু পেশাগত সাফল্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তার সামাজিক, নৈতিক দায়বদ্ধতা, মাতৃভূমির প্রতি কর্তব্য পরায়নতাই তাকে আকৃষ্ট করেছে রাজনীতিতে। আর রাজনৈতিক পরিসরেও তিনি সাবলীল, অপ্রতিরোধ্য I আজ বাংলার তথা ভারতের নারী শক্তির তিনি আরেক মুখ।

আপোষহীনভাবে গর্জে উঠে নারীদের জন্য তিনি স্বতন্ত্র রাস্তা তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যে রাস্তা নারীদের ঠিক তার মতোই সপ্রতিভ করে তুলবে। যে রাস্তা নারীদের প্রত্যেকটি অবমাননা এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখাবেI যে রাস্তা নারীর সশক্তিকরণ ঘটাবে। যে রাস্তা নারীর প্রতি অত্যাচার অবিচারের প্রত্যুত্তরে নারীকে করে তুলবে স্বাবলম্বী, উদ্যোগী এবং যে রাস্তা নারীকে শেখাবে আত্মরক্ষার উপায়। যে রাস্তা নারীকে সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রশিক্ষিত করবে এবং করে তুলবে জীবন যুদ্ধে আরো বেশি শক্তিশালী। তাই অগ্নিমিত্রার জীবনদর্শনে নারী স্বাবলম্বী এবং নারী সুরক্ষিত I তার জীবন দর্শনে বাংলার নারী হল স্বয়ং দুর্গা তথা উমার প্রতিমূর্তি।

রাজনীতির মঞ্চে তিনি তুলনামূলকভাবে নবাগতা হতে পারেন, কিন্তু নারীর আত্মিক শক্তির প্রতি অগাধ ভরসা এবং নারীর সশক্তিকরণ প্রচেষ্টাই অগ্নিমিত্রার কাছে সম্বল স্বরূপI আজ বাংলার নারীদের কাছে জীবন চলার পাথেয় হতে যাচ্ছে অগ্নিমিত্রার স্বাবলম্বী সেই দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যতিক্রম হয়ে ওঠার দৃঢ়তা এবং নিজের আত্মসম্মানকে প্রতিষ্ঠিত করার সেই তাগিদ, সকলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলার স্পৃহা। অগ্নিমিত্রার মতে বাংলার নারী সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা যেকোনও বাংলার নারীকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে ব্রতী করতে পারে। আর সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার জন্যই আজ কোভিড পজিটিভ হয়েও তিনি ভাষা হারাননি।চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থায়ই সেরে ফেলেছেন প্রশাসনিক কাজের জন্য ভার্চুয়াল বৈঠক। করোনার কবলে পরেও অগ্নিমিত্রার তৎপরতায় পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় মহিলা মোর্চার উদ্যোগে নারীদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ শিবির উমা এর জন্য কার্যকলাপ বজায় থেকেছে। স্থান-কাল-পাত্র ও দলমত নির্বিশেষে ধর্ষণের মত নারকীয় অপরাধে যুক্ত অপরাধীদের সাজার জন্য সরব হয়েছেন অগ্নিমিত্রা।

তাই মাতৃপক্ষের শেষে মা দুর্গার বিসর্জন হতে পারে কিন্তু আক্ষরিক অর্থে নারী শক্তির ক্ষেত্রে তা হওয়ার নয় কারণ অগ্নিমিত্রার আদর্শে অনুপ্রাণিত এ নারীশক্তি গর্বিত বাংলার স্বতন্ত্র, স্বাবলম্বী এবং স্বাধীকার চেতনায় উদ্বুদ্ধ নারীশক্তি।

Related Articles

Back to top button
Close