fbpx
অসমএকনজরে আজকের যুগশঙ্খগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

বাঙালিরা বাংলাদেশি! মেঘালয়ে অস্তিত্ব সংকটে বঙ্গভাষীরা মুখ্যমন্ত্রী কনরাডকে স্মারকপত্র

বীরেশ্বর দাস , গুয়াহাটি: মেঘালয়ের বাসিন্দা ভারতীয় নাগরিকত্ব বাঙালিদের ‘বাংলাদেশি’ অভিহিত করে হঠাৎ যেভাবে নির্যাতন শুরু হয়েছে, সেটা প্রতিহত করতে এগিয়ে এল রাজ্যের বাঙালি সমাজ। বাঙালি বিদ্বজ্জনেরা সংঘবদ্ধভাবে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার কাছে স্মারকপত্র দিয়ে বাঙালিদের সুরক্ষা, অস্তিত্ব রক্ষা, অধিকার রক্ষার আর্জি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, মেঘালয়ের বসবাসকারী সব জাতি, জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত করতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতি, জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত করতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতি, জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন বন্ধে প্রতিষ্ঠা করতে হবে আইনের শাসন। ধর্মীয়, ভাষিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সাংবাদিক অধিকার নিশ্চিত করতে একটি পরিষ্কার নীতি প্রণনয় করতে হবে সরকারকে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইছামতী এলাকায় এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো মেঘালয় জুড়েই শুরু হয়েছে বাঙালি নির্যাতন। ইছামতী, ভোলাগঞ্জ এলাকায় গত নয় মাস ধরে বাঙালিরা ঘরবন্দি, একপ্রকার ভাতে মারার চক্রান্ত করা হচ্ছে তাদের। সেই ঘটনাকে টেনে আনা হয়েছে শিলং শহরে। গত ২০-২১ অক্টোবর মেঘালয়ের সব বাঙালি ‘বাংলাদেশি’ অভিহিতি করে খাসি ছাত্র সংস্থার নামে পোস্টার পড়েছে শিলংয়ের নানা স্থানে। পুলিশ পরে সেই পোস্টার সরিয়ে নিলেও পরিস্থিতি দেখে মেঘালয়ের বাঙালিরা এখন আতঙ্কিত। ফলে সংঘবদ্ধভাবে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ, এগিয়ে এসেছে বাঙালি সমাজ।

ব্রিটিশ শাসনে যারা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনার ঠাকুরকে সংবর্ধনা জানাতে এগিয়ে আসতে পারেনি, গত কয়েক দশক জুড়ে খাসি ছাত্র সংস্থার দাপটে যারা তটস্থ, সেই বাঙালি সমাজ দ্বারস্থ হয়েছে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার। স্মারকপত্রে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন মেঘালয়ের প্রাক্তন মন্ত্রী মানস চৌধুরী, প্রাক্তন সাংসদ বিবি দত্ত, প্রাক্তন উপাচার্য জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্য, অবসারপ্রাপ্ত আইএফএস নবব্রত ভট্টাচার্য, গভ. গার্লস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের প্রাক্তন অধ্যক্ষ উমা পুরকায়স্থ।আছেন বিভিন্ন স্কুল, কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, শিলংয়ের বিভিন্ন বাঙালি সংগঠনের প্রতিনিধি, সমাজকর্মী, ব্যবসায়ীরা।

গত ১৩ নভেম্বর কনরাড সাংমাকে দেওয়া স্মারকপত্রে মেঘালয়ের বাঙালিদের দেড়শো বছরের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। দশকের পর দশক ধরে বাঙালিরা কীভাবে পাহাড়ি লোকদের সঙ্গে মিলেমিশে ছিলেন, সেটা জানানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী। স্মারকপত্রে বলা হয়েছে, মেঘালয়ের বাসিন্দা ভারতীয় নাগরিক বাঙালিদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দেওয়ায় তারা অত্যন্ত ব্যথিত, দুঃখিত। ব্রিটিশ রাজত্বের আগে থেকে মেঘালয়ের পাহাড়ি লোকদের সঙ্গে বাঙালিদের সখ্য রয়েছে। মেঘালয়ের আদি বাসিন্দা খাসি, গারো, জয়ন্তিয়া লোকদের সঙ্গে আগে থেকেই এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে বাঙালিদের। ওইসব এলাকার উপজাতিদের সিলেট, ময়মনসিংহ-সহ আশেপাশের এলাকার সঙ্গে আগে থেকেই ব্যবসা বাণিজ্যের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন সহাবস্থানের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বাঙালিদের বিরুদ্ধে এখন যেভাবে প্রচার চলছে, তাতে তাঁরা মর্মাহত বলেও বাঙালিদের বিরুদ্ধে এখন যেভাবে প্রচার চলছে, তাতে তাঁরা মর্মাহত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মেঘালয়ে ১৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বাঙালিদের বসবাসের ইতিহাস রয়েছে।

অবিভক্ত অসমের সরকারি ভাষা হিসেবে অসমিয়া বসবাসের ভাষা চাপানোর বিরুদ্ধে ষাটের দশকে পাহাড়ি রাজ্যের জন্য আন্দোলনে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংগ্রাম করেছেন বাঙালিরাও। কিন্তু দীর্ঘ এত বছর ধরে বাঙালিরা মেঘালয়ে বসবাস করলেও কোথাও উপজাতিরদের জমি বাঙালিরা মেঘালয়ে বসবাস করলেও কোথাও উপজাতিদের জমি বাঙালিরা দখল করেছেন কিংবা পাহাড়ি লোকেদের কোনও ভাবে শোষণের নজির নেই আজ অবধি।

উল্টোদিকে, বাঙালিরা মেঘালয়ে শিক্ষার প্রসারে ব্রতী ছিলেন। খাসিদের সঙ্গে বাংলা লিপি মেলানো ছাড়া শুধু শিলং শহরেই ব্রতী ছিলেন।
খাসিদের সঙ্গে বাংলা লিপি মেলানো ছাড়া শুধু শিলং শহরেই দু’ডজন স্কুল এবং আধা ডজন কলেজ স্থাপন করেন বাঙালিদের পূর্বপুরুষরা।
আইন প্রণয়ন, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, ব্যবসা বাণিজ্য- সব দিকে বাঙালিরা সেবা করেছেন মেঘালয়ের। কিন্তু এত কিছুর পরেও ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বাঙালিদের বহিরাগত ও এবং বাংলাদেশি বলাটা দুঃখজনক বলে অভিহিত করা হয়েছে স্মারকপত্রে। বাঙালিদের ‘বাংলাদেশি’ বলে অভিহিত করে একাংশের প্ররোচনায় ভারতীয় নাগরিক বাঙালিদের অপমান করা হয়েছে এবং রাজ্যে বাঙালিদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকিও এসে পড়েছে বলে মনে করে বাঙালি সমাজ। এতে ১৯৭১ সালে উত্তর-পূর্বের রাজ্য পুনর্গঠনের সময় মেঘালয়ের পাহাড়ি নেতারা অ-উপজাতিদের সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটা লঙ্ঘিত হচ্ছে। তাই বাঙালিদের মধ্যে সুরক্ষার ভাব ফিরিয়ে আনা এবং তাদেরও মেঘালয় গড়ার সহযাত্রী করতে বেশ কিছু দাবিও পেশ করা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, মেঘালয়ে বসবাসকারী সব জাতি, জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত করতে সরকারকে শীঘ্রই কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। সংবিধানের ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২১, ২৯, ৩০ এবং ৩০০ এ দফা অনুযায়ী তাঁদের মৌলক, সাংবিধানিক এবং আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন: আল কায়দার কুখ্যাত জঙ্গি আয়মান আল জওয়াহিরির মৃত্যু! দাবি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের

তাছাড়া জাতি, জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবিও করা হয়েছে। মেঘালয়ের সব জাতি, জনগোষ্ঠীর, ধর্মীয় ভাষিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে সরকারকে একটি স্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অসম এবং দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো মেঘালয়ের ভাষিক ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার সুরক্ষিত করতে একটি সরকারি সংস্থা গঠনের দাবিও করা হয়েছে। তাছাড়া স্বশাসিত জেলা পরিষদগুলিতে অ-উপজাতিদের ট্রেড লাইসেন্স প্রদানে ষষ্ঠ তফশিল এলাকার জন্য থাকা আইন যাতে কঠোর ভাবে মেনে চলা হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। মেঘালয়ের বসবাসকারী জাতিগত এবং ভাষিক ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। মেঘালয়ের বসবাসকারী জাতিগত এবং ভাষিক সংখ্যালঘুদের জন্য সরকারি চাকরিতে বিশেষ করে স্টেট সিলিভ সার্ভিস এবং পুলিশ সাভির্সে জন্য সরকারি চাকরিতে বিশেষ করে স্টেট সিভিল সার্ভিস এবং পুলিশ সার্ভিসে সংরক্ষণ চালু করার দাবিও করা হয়েছে। বৈদ্যুতিন এবং ছাপা পুলিশ সার্ভিস সংরক্ষণ চালু করার দাবিও করা হয়েছে। বৈদ্যুতিন এবং ছাপা মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্য লাগাম টানতে প্রণয়ন করা কিংবা প্রচলিত আইন কঠোরভাবে লাগু করার দাবিও করা হয়েছে বাঙালি সমাজে স্মারকপত্রে।

Related Articles

Back to top button
Close