fbpx
অফবিটবিনোদনব্লগহেডলাইন

দ্য ডায়েরিজ, অফ সাম আনটোল্ড স্টোরিজ

স্বর্নার্ক ঘোষ: সুশান্তের মৃত্যুর পর বেশ কয়েকদিন থেকে একটা কথা বেশ প্রচলিত হয়েছে insider’s – আউটসাইডারস। বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ, নেপোটিজম ইত্যাদি। ফিল্ম নিয়ে কাজ করি না কিংবা কাজ করিওনি তাই এ বিষয়ে ভেতরের বাস্তবিক ধারণা ততটা আমার নেই।

কিন্তু হ্যাঁ, বলিউডের নেপোটিজম কিংবা আউটসাইডার insider’s এই তত্বটা আমার কাছে অনেকটা সোসিওলজির ‘ এন্ডোগেমি’ ও ‘এক্সোগামির’ মতো লাগছে। কি এই ‘গেমি’ জুটির অর্থ? সমাজতত্ত্ব সাবজেক্ট থাকার কারণে কিছুটা বলতে পারি এই বিষয়ে। ধরুন যে সমস্ত সম্প্রদায়ে শুধু নিজেদের পারিবারিক আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ কর্ম সম্পাদন ও বংশবৃদ্ধিকে করা হয়, তাকে বলা হয় এন্ডোগ‍্যমী।‌

এক্ষেত্রে বংশ ও পারিবারিক রক্তের বিশুদ্ধতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এবং সেই বিশুদ্ধ রক্তের ধারায় আবহকাল জুড়ে বিরাজমান থাকে। ধরুন এরাই বলিউডের সেই স্টার গ্রুপস বা নেপোটিস্ট প্রোডাক্ট । দুধ না বানিয়েই ক্ষীর খাবো, উপরেরও খাব নিচেরও কুড়োবো‌। যাই হোক,
অন্যদিকে, এক্সো অর্থাৎ এক্সটার্নাল থেকে এক্সোগামি যেখানে পরিবার, রক্ত সম্পর্ক বহির্ভূত বিবাহকর্ম সম্পাদন ও বংশবৃদ্ধি হয়। তাকে বলা হয় এক্সোগ‍্যমী।‌ এই ধরনের বিবাহ সাধারণত আমরা দেখে থাকি।

অর্থাৎ দুয়ে দুয়ে চার।সবকিছুর উপরে মোদ্দা কথা এন্ডোগ‍্যমীস্টিক অ্যাটিটিউড ও রক্তাভিমানই বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আবার রক্তের বিশুদ্ধতা নিয়ে কথা বলতে গেলে নাৎসিদের শুদ্ধ জার্মানবাদ বা ‘হেরেনভক’ তত্ত্বের কথা মনে পড়ে গেল। ইতিহাসটা আমার প্রিয় সাবজেক্ট ছিল। তাই এখনও বারবারই আমি পুরোনো ইউরোপের গলিতে হারিয়ে যাই। কখনো সেখান থেকে ফিরে আসার সময় হাতরে পাই কিছু পুরোনো গল্পের বইও। না তবে বই নয়, আজ একটি ডায়েরির কথা বলব। সুশান্তের ফিফটি ড্রিমসের মতো।

হ্যাঁ যেটা বলছিলাম হেরেনভক তত্ত্ব। আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর যেই তত্বকে ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে হিটলারের নাৎসি সাম্রাজ্য। সেখানে বিশুদ্ধ জার্মান রক্তের অধিকারী না হওয়ায় জার্মান নাগরিকত্ব হারিয়েছিলন আইনস্টাইন। নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল আনা ফ্রাঙ্কদের। কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলতে পারেনি ওই অষ্টাদশীর ডায়েরিতে লেখা স্বপ্নগুলো। ঠিক যেমনটা লেখা রয়েছে সুশান্তের গল্পের পাতায়। মাই ফিফটি ড্রিমস।

জার্মানিতে জন্মালেও নাৎসি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র চার বছর বয়সে জার্মানি ছেড়ে নেদারল্যান্ডে পাড়ি দিতে হয় আনার পরিবারকে। কারণ তাদের একটাই দোষ জন্মসূত্রে তারা ইহুদী। তাই উচ্চবংশীয় নাৎসিদের রাজত্বে তাদের ঠাঁই নাই। সিম্পলি ওরা আউটসাইডার।

যুদ্ধ, কূটনীতির ইউরোপে আউটসাইডার হয়ে সেই স্বপ্নগুলো একদিন মারা যাবে আউৎসইচ কিংবা বার্জনের কোনো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে এটাই ভবিতব্য। হয়তো জানত গুটি গুটি পায়ে বেড়ে ওঠা চঞ্চল কিশোরীটি। কিশোরী মনের চাঞ্চল্য প্রেম বেদনা প্রতিটি মুহূর্তই ধরা পড়েছিল ওই ডাইরির পাতায়। স্বপ্ন ছিল শিক্ষিকা‌ হওয়ার। গরীবদের শিক্ষাদান। যুদ্ধ শেষে আবার জার্মানিতে ফিরে গিয়ে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল বছর ষোলোর কিশোরীটি।

কিন্তু হায়! সেই ফিফটি ড্রিমসের আগেই নেদারল্যান্ড নিজেদের আয়ত্তে করে নাৎসিরা। রাস্তায় জার্মানদের বুট আর বোমারু বিমানের আওয়াজে আনার ডায়েরি লেখার হাত কাঁপতে শুরু করে রোজ রাতে।

না, আগের মত যেন লিখতেই পারছিল না সে, লেখাই হচ্ছিল না আর। জার্মানিতে ফেরা, ফিরে উচ্চশিক্ষা, শিক্ষিকা হওয়া আর গরিব শিশুদের শিক্ষাদান, ফ্রাঙ্কফুর্টের বাগান ঘেরা রাস্তায় প্রিয় বন্ধুদের সাথে ভেসে বেড়ানো সব স্বপ্ন গুলো কেমন আবছায়া হয়ে আসছিল রাতের বেলা সার্চলাইট জার্মান লুফৎওয়াফ বিমানের গুমগুম আওয়াজে।‌ মাত্র কিছুদিন পর এই পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হয়ে উঠলো প্রতিবেশী পরিজন সকলের ঠিকানা হল কুখ্যাত নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। ক্রমেই ফাঁকা হতে থাকলো আনাদের এলাকা।‌

এরপর কুখ্যাত গেস্টাপোর হাতে একদিন ধরা পড়ে গেল আনার পরিবার। বাবা মা দিদিকে নিয়ে তাঁর স্থান হল দক্ষিণ স‍্যক্সন প্রদেশের বেলসেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে।

বলিউডে এই ‘এন্ডোগামী’ শ্রেণীর এই ‘এক্সো’গামির প্রতি দ্বেষই বারবার গ্যাস চেম্বারের দিকে ঠেলে দেয় সুশান্তদের মতো প্রতিভাকে।‌ কিছুদিন আগে যেমনটা জর্জ ফ্লয়েড বলেছিলেন “আই কান্ট বৃদ”। জানিনা এই শব্দ শুনে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির চোখ আদৌ কতটা ভিজেছিল।

“ইয়েস হি কুডন’ট ব্রিদ”। বলিউডি নাৎসিদের দাপটে যেন বান্দ্রার নিজের ফ্ল্যাটটি তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল ওই স‍্যক্সন প্রদেশের কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্প। আর ঘরগুলো যেন একেকটা গ্যাসচেম্বার। তাঁর ফিফটি ড্রিমস ছিল অনেক। চাঁদের বাড়ি সফর থেকে‌ ছবি নির্মাণ। বিজ্ঞান থেকে নারী স্বনির্ভরতার স্বপ্নগুলো পড়ে রইলো অধরা। সাদা পাতা হলুদ হয়ে হওয়ার অপেক্ষায়।

১৯৪৫ বেলসেন বার্জন ক্যাম্পে টাইপাস রোগে আক্রান্ত হয় মৃত্যু হয় অষ্টাদশী আনার। সেদিন প্রবল বৃষ্টিতে পড়ে ভিজতে হয়েছিল ন্যাড়া মাথার স্ট্রাইপ ছেঁড়া পাজামার সেই দেহটিকে।‌ অদূরে জিভ বার করে কিশোরী দেহের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জার্মান শেফার্ডের দল। আনার নয়, সেদিন মৃত হয়ে পড়েছিল ইউরোপীয় নেপোটিজমে ঢুকে পড়া ‘আউটসাইডার’ এক অষ্টাদশীর ইচ্ছে গুলো।

তাঁর স্বপ্ন ইচ্ছেগুলো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের কাদামাটিতে ডুবে গেলেও কিন্তু মেয়ের ইচ্ছাকে রাইন নদী কিংবা টেমসের জলে ভাসতে দেননি অটো ফ্রাঙ্ক।

পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডে আনার লেখা ছেঁড়া ডাইরির পাতাগুলো একে একে জুড়ে প্রকাশিত হয় ‘দা ডায়রি অফ আ ইয়ং গার্ল’।‌ পৃথিবীর বেস্টসেলার্স বইগুলোর মধ্যে অন্যতম এই বইটি।

আনা না থাকলেও বহু ঝড় সামলে ওঠা অতলান্তিকের গভীর জলে কিন্তু তলিয়ে যায় নি অষ্টাদশীর স্বপ্নগুলো। ভিজে যায় নি জার্মান রক্তের ছোপে। তাহলে সরফরাজের ফিফটি ড্রিমস হয়ত নিঃশব্দেই তলিয়ে যাবে আরব সাগরের গভীরে। আর চান্দা মামার বাড়ি থেকে দূরবীন দিয়ে সেটা দেখে মুচকি হেসে উঠবে, আর হয়তো বলবে “উস পানহো মেহি তো থি সরফরাজ কি কাহানি,,,পড় নেহি পায় আপ,, কে কেহেদিয়া “সরফরাজ……….”।

 

Related Articles

Back to top button
Close