fbpx
একনজরে আজকের যুগশঙ্খগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

বাঙালির পয়লা বৈশাখ 

তসলিমা নাসরিন

পয়লা বৈশাখের উৎসব দুই বাংলায় একই দিনে হোক। হ্যাঁ, একই দিনে হোক। আজ বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ, কাল পশ্চিমবঙ্গে, এর কোনও মানে হয় না।

 

পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের উৎসব বেশি ঘটা করে হয়, কিন্তু উগ্রপন্থী বাঙালি মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে বাঙালি সংস্কৃতি প্রায় ধ্বংস করে দিয়ে আরবীয় সংস্কৃতি আমদানি করছে বলে ভবিষ্যতে আদৌ এই ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি উৎসবটি বাংলাদেশে পালন করা সম্ভব হবে কি না আমার সংশয় হয়। এমনিতে বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের তারিখ বদলে দিয়েছে এরশাদ সরকার। ১৪ই এপ্রিল তারিখটিতে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ পালন করার সরকারি আদেশ জারি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা যা পালন করছে, তা থেকে যেন একটু বদল হলেই মুসলমানিত্বটা ভালো বজায় থাকে। কী আর বলবো, মূর্খতার কোনও কূল কিনারা নেই! পাকিস্তানি শাসকরা চাইতো বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিতে বিভেদ বাড়ুক। ওরা বিভেদ না বাড়াতে পারলেও বাংলাদেশে ওদের যে অনুসারীদের ওরা রেখে গেছে, তারাই বিভেদ বাড়াচ্ছে এখন। তারাই বাংলা ক্যালেণ্ডারকে মুসলমানের ক্যালেণ্ডার বানিয়েছে। বাংলা ক্যালেণ্ডারের পেছনে মোগল সম্রাট আকবরের অবদান ছিল বলে আকবরের ধর্মের কিন্তু কোনও অবদান ছিল না। কেবল কৃষিকাজের, কেবল ফসলের, কেবল খাজনা আদায়ের হিসেব রাখতে হিজরি ক্যালেণ্ডারের বদলে বাংলা ক্যালেণ্ডার সুবিধে বলেই ওই ক্যালেণ্ডারের সূচনা করা হয়েছিল।

 

আমার নানি চৈত্র সংক্রান্তিতে তেতো রাঁধতেন। নানি রাঁধতেন, কারণ নানির মা রাঁধতেন। নানির মা রাঁধতেন, কারণ নানির মা’র মা রাঁধতেন। নানির মা’র মা রাঁধতেন, কারণ নানির মা’র মা’র মা রাঁধতেন। চৈত্র সংক্রান্তিতে আমার খালারা বা মামিরা কিন্তু এখন আর তেতো খাবার রাঁধেন না, তেতো খাবার খানও না। চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামে গ্রামে চড়ক পুজো হত। আমার দাদারা বাঁশবন পার হয়ে চড়ক পুজো দেখতে যেতো। ওখানে বাঁশ – দড়ির খেলা দেখতো হাঁ করে। ওই দিনই লোকনাথ পঞ্জিকা কিনতো সবাই। আমার দাদারাও। বৈশাখের প্রথম দিনে নানারকম মাটির কাজ, বেতের কাজ, কাঠের কাজ, শোলার কাজের মেলা বসতো। পশ্চিমবঙ্গে একই দিনে বৈশাখের উৎসব হত। বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খিস্টান সব বাঙালিই বৈশাখের উৎসবে অংশ নিত। নানারকম খেলা প্রতিযোগিতা হত গ্রামে, নৌকা বাইচ, কুস্তি, লাঠি খেলা, এসব।

 

আমাদের মফস্বল শহরে আমরা ছোটরা সকাল থেকে বাজাতাম বাঁশি-বেলুন। বিকেলে বিন্নি ধানের খই, চিনির হাতি ঘোড়া, মাটির পুতুলের মেলায় যেতাম।

 

সেই সবও কি আর আছে আগের মতো! এখন শুনেছি যা হওয়ার শহরেই হয়, যারা বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, সেই শিল্পী সাহিত্যকদের দলটিই ভোরবেলা গান গায় রমনার অশ্বথ্ব তলায়। সারা দিন গাইতে থাকে ‘’জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক।’’ রমনায় সংস্কৃতমনা, মুক্তমনা বাঙালির ভিড় বাড়ে বৈশাখের ভোর থেকেই। পান্তাভাত, কাঁচালঙ্কা, ইলিশ মাছ খাওয়ার ধুম পড়ে।

 

তাঁতের শাড়ি আর পাজামা পাঞ্জাবিতে ছেয়ে যায় রমনা। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট নামের বিখ্যাত এক গানের দল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করছে রমনায়। পাকিস্তানি শাসকের অত্যাচার সয়েছে। তার চেয়েও বেশী অত্যাচার সইছে স্বাধীন বাংলাদেশে। মুসলমান মৌলবাদিরা গ্রেনেড ছুঁড়েছে পয়লা বৈশাখে, ছায়নাটের গানের অনুষ্ঠানে। তারা পছন্দ করে না ইসলামি সংস্কৃতির বাইরে অন্য কোনও সংস্কৃতি। বিশেষ করে বাংলা সংস্কৃতি।

 

পয়লা বৈশাখে ছায়ানট ছাড়াও উল্লেখযোগ্য উৎসব ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘোরে। রং-বেরঙের মুখোশ, বিশাল বিশাল কাগজের বাঘ ভালুক হাতি ঘোড়া থাকে শিল্পীদের হাতে হাতে। ঢাক ঢোলক বাজে। আটপৌরে শাড়ি, ধুতি পরে ছেলে মেয়েরা নাচে। রাস্তা আগের রাতেই মুড়ে দেওয়া হয় চমৎকার আল্পনায়। এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দেখার জন্য আজও ভীষণ ভিড়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই নিরাপদ জায়গাটুকুতেই। শুনেছি সোনারগাঁয়ে নাকি বউমেলা হয়। সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো করতেই মূলত লোক আসে।মনের গোপন বাসনা পুরণের আশায় নাকি মেয়েরাই বেশি আসে। পাঁঠাবলির রেওয়াজও নাকি আছে। সোনারগাঁর কাছেই আরেক অঞ্চলে ঘোড়ামেলাও হয়। কোনও এক সময় কোনও এক লোক নাকি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের দিনটিতে সবাইকে প্রসাদ খাওয়াতেন। লোকটি মারা যাওয়ার পর তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়েছে গাঁয়ের লোক। প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে ওই স্মৃতিস্তম্ভে একটি মাটির ঘোড়া রাখা হয়। আর ওটির আশেপাশেই রীতিমত হৈ হৈ করে মেলা বসে যায়। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ যারাই মেলায় আসে, সবাইকে কলাপাতায় খিচুড়ি খাওয়ানো। এক দিনের এ মেলায় হাজারো লোকের সমাগম ঘটে। এই ঘোড়ামেলায় শুনেছি নাগরদোলা, পুতুল নাচ আর সার্কাসও থাকে। কীর্তন হয় মধ্যরাত পর্যন্ত। এখন জানি না কীর্তন আগের মতো হয় কি না বা এখনও আদৌ ওই ঘোড়ামেলাটাই হয় কি না। আর হলেও জানিনা ঠিক কতদিন হতে পারবে এসব মেলা।

বাংলাদেশে দু’ যুগের বেশি হল বাঙালি সংস্কৃতিকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে আরবীয় সংস্কৃতি আনার যে কাজ জীবন –মরণ পণ করে চালাচ্ছে ধর্মান্ধ মূর্খরা, তাতে তারা অবিশ্বাস্য রকম সার্থক। একশয় একশ না পেলেও ষাট সত্তরের কাছাকাছি নম্বর জুটে যাচ্ছে। ধর্মের রীতি টুকু বাদ দিলে, সব ধর্মের বাঙালির আচার অনুষ্ঠান একই ছিল এতকাল। কিন্তু আচার অনুষ্ঠানেও ধর্ম আনা হচ্ছে।একটা অসাধারণ সংস্কৃতিকে, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে, নিজ পরিচয়কে খৎনা করে দেওয়া হচ্ছে চোখের সামনে। আর খৎনা করার হাজমগুলো, হাতে ছুরি নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করছে। মুখ বুজে হাজমদের নাচ দেখছে সবাই। দেশ হাজমে গিজহিজ করছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে হয়তো দেখেইনি হালখাতা, গ্রামে গ্রামে পয়লা বৈশাখের মুড়ি মুড়কির, পিঠেপুলির মেলা।

আমি বাংলাদেশের হাজমের নাচ বন্ধ করতে পারবো না। ও দেশ থেকে আজ আঠাশ বছর হল আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পয়লা বৈশাখের উৎসব আরও বর্ণাঢ্য করতেও আমি পারবো না। ও রাজ্য থেকেও আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। দু’ অঞ্চলেই মূর্খদের সংখ্যা প্রচুর। ওই মূর্খদের খুশি করতেই নাকি আমার উপস্থিতি বাংলায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূর্খরাই মূর্খদের খুশি রাখে। আমি আজ শুধু একটি আবেদনই করছি– দুই বাংলায় দুটো ভিন্ন দিনে নয়, একই দিনে, একই তারিখে, পয়লা বৈশাখটা অন্তত করা হোক। বাঙলা ক্যালেণ্ডারের পয়লা বৈশাখ গ্রেগরীয় ক্যালেণ্ডারে কখনও তেরো, কখনও চৌদ্দ, কখনও পনেরো। কিন্তু বাংলাদেশে চৌদ্দ তারিখকে পয়লা বৈশাখের জন্য শেকল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

ঈদ রোজাগুলোর তারিখ কিন্তু বাঁধা হয়নি। হিজরি ক্যালেণ্ডার অনুযায়ীই সেসব পালন করা হয়। তবে বুড়ো হাজম ডেকে বাংলা ক্যালেণ্ডারের মুসলমানি করাটার দরকার কী ছিল! হিন্দু থেকে পৃথক হওয়ার জন্য ভিনদেশি সংস্কৃতি আনা, বাঙালি সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা, আরব না হয়েও জোর করে আরব হওয়ার চেষ্টা –এসবই কি সত্যিকারের মুসলমান হওয়ার রাস্তা! নিজেদের ঐতিহ্যের সবটুকু বিসর্জন দিয়ে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি বলে বরণ করায় কোনও গৌরব নেই। ওই আরব দেশে বসে কোনও এক কালে কোনও এক লোক ধর্ম রচনা করেছিল, যে ধর্মের তুমি অনুসারি কারণ ওই অঞ্চলের কিছু লোক তোমার অঞ্চলে তাদের ধর্মকথা শোনাতে ঢুকেছিল, হয় তোমার পূর্বপুরুষ বা পূর্বনারী ওদের কথায় ও কাজে মুগ্ধ হয়ে ভিনদেশি মরুভূমির ধর্ম বরণ করেছে, নয় নিচু জাত বলে বা গরিব বলে তাদের নিজেদের ধর্মের কতিপয় দুষ্ট লোক দ্বারা উপেক্ষিত আর শোষিত হতে হতে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আরব দেশেও কিন্তু ‘ভিক্ষুক, মিসকিন’ বলে তোমাকে ঘেন্না ছিটোচ্ছে আরবরা।কবে যেন আট জন বাঙালি মুসলমানকে জনসমক্ষে জবাই করলো! কারা জবাই করলো মুসলমানদের? মুসলমানরা। যা তোমার বাপ দাদার সংস্কৃতি নয়, তাকেই তোমার বাপ দাদার সংস্কৃতি হিসেবে লুফে নিচ্ছ আজ। এমন নয় যে ভালোবেসে নিচ্ছ, ভয়ে নিচ্ছ, বিভ্রান্তিতে নিচ্ছ। আর পরিণত হচ্ছ নামহীন, ঠিকানাহীন, পরিচয়হীন একটা ধর্মের পিণ্ডে। ময়ুরপুচ্ছে কাকের লেজ লাগাচ্ছো মুসলমান হওয়ার জন্য। না, এই অসততা করে তুখোড় মুসলমান হয়তো হওয়া যায়, ভালো মানুষ হওয়া যায় না।

 

দুই বাংলায় পয়লা বৈশাখের তারিখটা এক হলে অন্তত মনে হবে, উৎসবটা বাঙালির উৎসব। দুই দেশের বাঙলা একাডেমীর কর্তারা অন্তত পয়লা বৈশাখের উৎসবটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কথা বলুন। অন্তত একদিনের জন্য হলেও না হন হিন্দু, না হন মুসলমান। অন্তত একদিনের জন্য একবার একটু বাঙালি হন। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি এবং হাসিনা সরকার, শুনছেন? ক্যালেণ্ডারের কোনও ধর্ম নেই, লিঙ্গ নেই। ধর্মহীন, লিঙ্গহীন ক্যালেণ্ডারকে কুপিয়ে মুসলমান বানিয়েছেন মনে করছেন, আসলে ও মুসলমান হয়নি। ও এখনও আগের সেই ধর্মহীন লিঙ্গহীন বাংলা ক্যালেণ্ডারই রয়ে গেছে। ক্যালেণ্ডারকে মানুন। আল্লাহ জানেন যে আপনারা বাঙালি, এ কোনও লজ্জার কথা নয়। আরবরাও জানে আপনারা বাঙালি, নকল আরব সাজার চেয়ে ভালো বাঙালি হন, এতে আরবদের শ্রদ্ধা পাবেন। তা না হলে যে মিসকিন, সে চালচুলোহীন নাম পরিচয়হীন মিসকিনই জীবনভর রয়ে যাবেন।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মুসলমান এবং ধর্মমুক্ত মানুষ সবাই আমরা পালন করতাম পয়লা বৈশাখ। বাংলা গান গাইতাম, বাঙালি খাবার খেতাম। বৈশাখি মেলায় গিয়ে দা-বটি, শিল নোড়া, বেলান পিঁড়ি, হাঁড়িকুড়ি, মুড়ি-মুড়কি, খই-খেলনা, মাটির পুতুল-টুতুল আর বাঁশি বেলুন কিনে আনতাম। বিকেলে বাবার হাত ধরে জুয়েলারির দোকানে-দোকানে গিয়ে হালখাতার মণ্ডা-মিঠাই খাওয়া ছিল আমাদের পয়লা বৈশাখ।

ঢাকার রমনায় ছায়ানটের গান, ইলিশ-পান্তা খাওয়া বা রাস্তায় মঙ্গল শোভাযাত্রা নিতান্তই নতুন ট্রাডিশান, বাঙালি এলিট শ্রেণি ওভাবেই কয়েক দশক আগে পয়লা বৈশাখের আধুনিকীকরণ করেছে। আমি দুটো উৎসবই দেখেছি, গ্রামের এবং শহরের উৎসব, পুরোনো এবং নতুন উৎসব। দুটোই জরুরি।

বেশ কয়েকবছর যাবৎ খবর পাচ্ছি, বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদীগোষ্ঠী ঘোষণা করেছে তারা পয়লা বৈশাখের কোনও উৎসব অনুষ্ঠান চায় না। ভালো কথা, যারা চায় না তারা উৎযাপন না করুক, যারা চায় তারা করুক। এরপর শুনি, তারা নিজেরা তো উৎযাপন করবেই না, তারা কাউকেই উৎযাপন করতে দেবে না। এ কেমন কথা! বাংলাদেশ তো জানতাম গণতান্ত্রিক দেশ। আমি একা বলে না হয় আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে, পয়লা বৈশাখ পালন করছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। লক্ষ লক্ষ মানুষের সংস্কৃতি গুটিকয় মৌলবাদীর হুমকির সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে? গুটিকতক হয়তো এখন আর গুটিকতক নেই।

ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা বাংলা সংস্কৃতি পছন্দ করে না, তাদের পছন্দ ইসলামি সংস্কৃতি, তারা বাংলা সংস্কৃতিকে বলছে হিন্দু সংস্কৃতি। হিন্দু সংস্কৃতি বলে দোষ দিলে হিন্দু বিদ্বেষী মুসলমানরা পয়লা বৈশাখ ত্যাগ করবে। করছেও হয়তো। তারা আজ যে করেই হোক আরব দেশের কালচার আনবে বাংলাদেশে! সে কারণেই হিজাব পরাচ্ছে মেয়েদের। তারা জানে হিজাব কখনও হিজাবে থেমে থাকবে না। হাঁটিহাঁটি পা-পা করে হিজাব যাবে বোরখার দিকে।

সৌদি আরবে সব মেয়েরই বোরখা পরা বাধ্যতামূলক। আপাদমস্তক বোরখায় ঢাকা মেয়েরাও কিন্তু ধর্মীয় পুলিশের চাবুক থেকে রেহাই পায় না। রাস্তাঘাটে, মাঠে-ময়দানে ধর্মীয় পুলিশরা কোনও মেয়ের কপালে দু’একটা মাথার চুল কোনও ফাঁক-ফোকর দিয়ে অসাবধানে কখনও বেরিয়ে এলো কি না দেখার জন্য টহল দেয়। বেরোলেই চাবুক।

তাহলে ঢাকা শহরে পয়লা বৈশাখের ভিড়ে ওরকম ‘ধর্মীয় পুলিশ’ মোতায়েন করেছিল তারা, যারা বাংলাদেশে আরব দেশের কালচার আনতে চাইছে! শাড়ি-পরা যে মেয়েদের নাভি দেখা যায়, ঝুঁকলেই যে মেয়ের ক্লিভেজ শো করে, তাদের তারা শাস্তি দিয়েছে। এ নিতান্তই মহড়া। হাঁটিহাঁটি পা-পা করে ধর্মীয় পুলিশরা যাচ্ছে সেই ভয়ঙ্কর দিনের দিকে, যে দিন তারা বোরখা পরা মেয়েদেরও কপালে চুল দেখা গেলে পেটাবে।

ধর্মান্ধ জল্লাদ বেরিয়ে গেছে রাস্তায়। আরব দেশের জল্লাদরা যেমন পাবলিক প্লেসে তলোয়ার দিয়ে অপরাধীদের মুণ্ডু এক কোপে ফেলে দেয়, তেমনি বাংলাদেশের ধর্মান্ধ জল্লাদরাও মানুষের মুণ্ডু ফেলছে। তবে এক কোপে না ফেলতে পারলেও কয়েক কোপের দরকার পড়ছে। রাজীব, অভিজিৎ, বাবুদের ওপর দেশি জল্লাদরা মহড়া চালিয়েছে। হাঁটিহাঁটি পা-পা করে সেই দিনের দিকে তারা যাচ্ছে, যে দিন চাপাতি-টাপাতির ঝামেলা না করে ইসলামি মতেই বৈধ তরবারি হাতে নেবে, সরকারি আদেশে এক একটা বৈধ কোপে বিধর্মী , বুদ্ধিজীবি আর মুক্তমনা লেখক-ব্লগারদের মুণ্ডু ফেলবে।

হাঁটিহাঁটি পা-পা করে? মাঝে মাঝে মনে হয় বিশাল-বিশাল লম্ফ দিয়েই যাচ্ছে। খুব দ্রুতই যাচ্ছে।

আমি জানি না বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী। বাংলাদেশ কি সৌদি আরব হতে যাচ্ছে, পাকিস্তান হতে যাচ্ছে, নাকি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা এককালে দেখেছিলাম, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে সেই বাংলাদেশ? বাংলাদেশ তার বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরবে, বাংলাদেশের কোনও রাষ্ট্রধর্ম থাকবে না, কোনও একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বাকি ধর্মের মাথার ওপর বসে ছড়ি ঘোরাবে না, কাউকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করবে না বাংলাদেশ, বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের কোনও স্থান থাকবে না– এরকম বাংলাদেশ আজকাল আমার মনে হয় অসম্ভব তৈরি হওয়া। বাহান্নোতে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, উনসত্তরে যে বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলাম, একাত্তরে যে বাংলাদেশ গড়বো বলে ঘর ছেড়েছিলাম, সেই বাংলাদেশকে গড়ার সুযোগ আমরা হাতে পেয়েও কাজে লাগাইনি, একে নষ্ট করে ফেলেছি, একে হায়েনার মুখে জেনে-শুনে ছুড়ে দিয়েছি। জানি দেশ আর দেশ নেই, তারপরও শাহবাগ আন্দোলনের আর পয়লা বৈশাখের বিশাল জনস্রোত দেখে আশা জাগে। তাহলে হয়তো হায়েনার মুখ থেকে ছিনিয়ে এনে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত দেশটাকে শুশ্রুষা করে আবার সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পারি। ত্রিসীমানা থেকে আগে দূর করতে হবে হায়েনাকে।

পেণ্ডুলামের মতো দুলি আমি আশা আর নিরাশায়।

শুভ নববর্ষ। আচ্ছা, বাংলা বর্ষপঞ্জি মেনে কি আমরা আদৌ সারা বছর চলি? চলি না। মনে আছে যখন ডাক্তারি পড়তাম, এবং ডাক্তারি করতাম, তখন রোগিদের সঙ্গে রোগ নিয়ে কথা বললে ওরা বাংলা মাসের হিসেব দিত, একটি উদাহরণ দিচ্ছিঃ ‘ জোষ্ঠি মাসে অল্প যন্ত্রণা ছিল পেটে, আষাঢ় মাসে পেটের ডানদিকে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হইলো, শাওন মাসে কবিরাজ দেখাইলাম, কবিরাজি ওষুধ খাইলাম, ভাদ্র মাসে যন্ত্রণা বাড়লো,আয়ুর্বেদি ওষুধ খাইলাম, আশ্বিন মাসে হোমিওপ্যাথি খাইলাম, কার্তিক মাসে পেটের বাম দিকেও যন্ত্রণা শুরু হইলো, ইউনানি ডাক্তার দেখাইলাম, অঘ্রান মাসে বমি শুরু হইলো, পৌষ মাসে হাত পায়ে কোনও শক্তি পাই নাই, মাঘ মাসে যন্ত্রণা পেট থেইকা বুকে গেল, ফাগুন মাসে বিছানা থেইকা উঠতে পারি না, চৈত্র মাসে খাওয়া বন্ধ হইয়া গেল, বৈশাখ মাসে এই আইলাম সরকারি হাসপাতালে।’ ডাক্তারদের তখন বাংলা ক্যালেণ্ডারের সঙ্গে গ্রেগরীয় ক্যালেণ্ডার মিলিয়ে দেখে বুঝতে হতো রোগির রোগের ইতিহাস। শুধু ওই সময়টাতেই আমার বা আমাদের বাংলা ক্যালেণ্ডারের দরকার পড়তো, তাছাড়া পড়তো না।

আমি জানিনা এখনও গ্রামের মানুষ বাংলা মাসের হিসেবে জীবন যাপন করে কিনা। তবে আমরা শিক্ষিত শহুরেরা ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালন করি, বাংলা খাবার খাই, বাংলা গান গাই, কিন্তু বাংলা বর্ষপঞ্জিকে এড়িয়ে চলি। এখন আর আগের মতো দোকানপাটে হালখাতাও হয় না। দোকানিদের কাছেও হালখাতা বড় সেকেলে। কৃষকদেরও মনে হয় না বাংলা মাসের হিসেব রাখতে হয়। তারাও বেশ আধুনিক এখন।

গ্রাম বদলে যাচ্ছে। গ্রাম বদলে গেলে ফসল বোনা ফসল কাটা নবান্নের উৎসব কিছুতেই আর বাংলা বর্ষপঞ্জির দরকার হবে না। বাংলা মাসগুলো আমাদের স্মৃতিতে, নয়তো বাংলার ইতিহাসের পুস্তিকাতে ঠাঁই পাবে।

আর কত বছর নববর্ষের উৎসব হবে, মেলা হবে, গান কবিতা হবে, মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, তা কেউ সঠিক বলতে পারবে না। তবু ধর্মীয় উৎসব ছাড়া বাঙালির তো তেমন কোনও উৎসব নেই, অন্তত নিছক উৎসবের জন্য হলেও নববর্ষের উৎসব আরও হাজার বছর ধরে হোক। তা না হলে বাঙালের কাঙাল হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

শুনেছি একটা ইলিশের দাম নাকি খুব বেড়ে গেছে। পয়লা বৈশাখে ইলিশ খেতে হবে যে করেই হোক, তাই যে দামই হাঁকছে ইলিশওয়ালা, সে দামেই কিনছে বাঙালি। বাঙালি না বলে ধনী-বাঙালি বলাই ভালো। পয়লা বৈশাখ ইলিশ ছাড়া কী করে উৎযাপন হবে! কোরবানির ঈদের আগে চড়া দামে গরু কিনে লোকেরা যেমন চারদিকে বলে বেড়ায় কত টাকায় কিনেছে গরু, এও ঠিক তেমন, ইলিশ কিনে সবাইকে শোনাচ্ছে কত টাকায় ইলিশটা কিনেছে। যত বেশি দাম, তত বেশি ইজ্জত। পয়লা বৈশাখে গরু-খাসির বদলে ইলিশ কোরবানি দেয় মানুষ! পয়লা বৈশাখটা কি ধীরে ধীরে একটুখানি কোরবানির ঈদের মতো হয়ে উঠছে! কী ভালোই না হবে বাংলা নববর্ষ যদি কোরবানির ঈদের মতো বড় উৎসব হয়ে ওঠে। ধর্মীয় উৎসবের চেয়ে নববর্ষের উৎসব নিশ্চয়ই ঢের ভালো।

তবে যেভাবেই পালন করুক, পয়লা বৈশাখটা পালন করুক বাঙালিরা। বাংলা-ক্যালেণ্ডারের উৎপত্তির সঙ্গে বাংলা বা বাঙালির কতটুকু কী জড়িত সে নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে বাংলা-ক্যালেণ্ডারকে যেহেতু বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, বাঙালিরা আর ক্যাচাল না করে এর বারো মাসের তেরো পার্বন উৎযাপন করুক ঘটা করে।

বাঙালির বাঙালিত্ব তো প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। ভাষাটাই যাবো যাবো করছে।এই ভাষা গরিব লোকের ভাষা, এই ভাষা দাদু-দিদিমার ভাষা, ঠাকুম্মা- ঠাকুর্দার ভাষা। সত্যিই এখনকার ছেলেমেয়েদের জন্য বাংলাটা নেহাত প্রাচীন লোকদের ভাষা, চাষোভুষোদের ভাষা।

মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হোক ঢাকা শহরে, প্রতি পয়লা বৈশাখে। কুটির শিল্পের মেলা হোক। মানুষ কাঁচা লংকা আর পান্তা ভাত খাক। কেউ কেউ টিপ্পনি কাটে, বছরের একদিন পান্তা খেয়ে কী লাভ, বাকি দিনগুলোয় তো মোগলাই খাচ্ছে! আমার বক্তব্য, বছরে একদিনই উৎসব করুক। একদিন বৃদ্ধ থেকে শিশু সবাই দেখুক, তাদের সংস্কৃতিটা ঠিক কী। একদিন দেখুক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, শাড়ি ধুতি, নাচ গান, আল্পনা, কাগজের হাতি ঘোড়া। একদিন বাংলায় কথা বলুক, একদিনের জন্য হলেও শত ভাগ বাঙালি হোক।

একদিনের জন্য হলেও উৎসবটা করা জরুরি, কারণ সামনে এমন দিন আসছে, এই একটা দিনও হয়তো আর বাঙালির উৎসবের জন্য জুটবে না। এখনই ইসলামি মৌলবাদীরা হুমকি দিচ্ছে, পয়লা বৈশাখ যেন পালন না করা হয়। একবার তো রমনার বটমূলে ছায়ানটের গানের দিকে গ্রেনেড ছুড়েছিল ওরা। এরপর বলা যায় না হয়তো পয়লা বৈশাখের উৎসব যারা করবে, তাদের দিন দুপুরে জবাই করে ফেলে রাখবে রাস্তায়। যারা আরবের সংস্কৃতিকে গায়ের জোরে ঘরে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেদের বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে, তারা খুব ভয়ংকর, তারা আজ বাংলাদেশে বিশাল ক্ষমতার অধিকারী। তাদের এক হাতে অস্ত্র, আরেক হাতে টাকা। তাদের মাথার ওপর সরকারি আশির্বাদের হাত।

সুতরাং পয়লা বৈশাখের উৎসব বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আগে যত পারুক উৎসব করে নিক বাঙালি। যত পারুক বাংলা গান গেয়ে নিক। যত পারুক নেচে নিক। যত পারুক ঢাক ঢোল বাজিয়ে নিক। যত পারুক মুড়ি মুড়কির মেলা করে নিক। কবে আবার কাকে হিজাব বোরখা আর টুপি জোব্বার আড়ালে চলে যেতে হয় কে জানে।

সত্যি বলছি, খুব দাম দিয়ে মানুষ ইলিশ কিনছে বলে আমার ভালো লাগছে। মানুষ গর্ব করে বলুক, তারা বাঙালি। বন্ধুদের ডেকে ডেকে দেখাক, আত্মীয় পড়শিদের দেখাক সদ্য কেনা রূপোলি রূপোলি ইলিশ। পয়লা বৈশাখের পেছনে যত টাকা যায়, যাক। বাঙালিকে সারাবছর বাঙালিত্ব বিসর্জন দিতে হয়, একদিন অন্তত বাঙালিত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য তারা মরিয়া হয়ে উঠুক। যত হুমকিই আসুক, যত শত্রুই থাকুক বাঙালির আশেপাশে, তবুও যেন অকুতোভয়ের মতো পালন করে যায় বছরের একদিনের এই উৎসব।

ইহুদিরা আজও নিজের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে। নিজভূমি থেকে নির্বাসিত হয়ে ওরা হাজার হাজার বছর কাটিয়েছে বিদেশ বিভূঁইয়ে, ভিন্ন সংস্কৃতির দেশে, সংখ্যালঘু হয়ে, নিরন্তর অপমান সয়ে। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে কী করে এতকাল তারা বেঁচে ছিল, এ-ই বিষ্ময় জাগায়। এতদিনে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সব। কিন্তু না, সবই টিকে আছে। কারণ হাজার বছর ধরে ঘরে ঘরে নিজেদের ভাষা আর সংস্কৃতির চর্চা চালু রেখেছিল বলেই টিকে আছে। যে করেই হোক টিকিয়ে রাখবে এই প্রতিজ্ঞা করেছিলো বলেই টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে।

ইহুদি পারলে বাঙালি পারবে না কেন! নিশ্চয়ই পারবে, যদি নিজের ভাষা আর সংস্কৃতিকে ইহুদিদের মতো ভালবাসে। এখানেই আমার সংশয়, আমার মনে হয় বাঙালি তাদের সংস্কৃতিকে সত্যিকার ভালোবাসে না। বাসে না বলেই অত সহজে আরবের এবং ইংরেজের সংস্কৃতি বাংলাকে দখল করে নিতে পেরেছে।

এই অবাঙালির দেশে আমি কী করে কাটাবো আমার পয়লা বৈশাখ!পদ্মার ইলিশ কোথায় পাবো, রমনার বটমূলে গানই বা কী করে শুনতে যাবো! আমি না হয় দূর থেকেই সবার আনন্দ দেখলাম। না হয় দূর থেকেই গানের সূর শুনলাম। কাছে যাওয়া আমার না-ই হলো। সবার কি আর সব হয়!

Related Articles

Back to top button
Close