fbpx
আন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

করোনা পেরিয়ে বিলেত……

দেবার্ঘ্য কুমার চক্রবর্তী: সমগ্র পৃথিবী আজ শীতঘুমে। রাজপথ স্তব্ধ, সভ্যতা দাঁড়িয়ে একপাশে। তার পথচলার গতিরোধ করে দাঁড়িয়েছে করোনা ভাইরাসের করালগ্রাস, যার বিজ্ঞান সম্মত নাম হল Covid-19।

চিনদেশের পরেই পৃথিবীর যে অংশটি এই ভাইরাসে মূলত আক্রান্ত হয়, তা হল ইউরোপ মহাদেশ।এই মহাদেশের অন্যতম প্রধান দেশ হল ইউনাইটেড কিংডম বা ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য। এই দেশে করোনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় ইউরোপের মধ্যে সর্বাধিক তথা ৪৬০০০। প্রথমে দেশব্যাপী এই ভাইরাস ছড়াতে শুরু করলে সরকার সমগ্র দেশের জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করার পরিকল্পনায় কোনও রূপ লকডাউন ঘোষণা করে না।ফলে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে চরম অবস্থায় পৌঁছায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক প্রায় ৯০০০ মানুষ আক্রান্ত হতে থাকেন এবং ১২০০র কাছাকাছি সংখ্যক মানুষ মারা যেতে থাকেন প্রতিদিন। আক্রান্ত হন দেশের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও। অবশেষে তাদের পূর্ববর্তী নীতি থেকে সরে আসে ব্রিটিশ সরকার এবং প্রয়োগ করা হয় দৃঢ় লকডাউন।

ফল মেলে হাতেনাতে, কয়েক মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সংখ্যাটা বদলে যেতে থাকে। এখন অগাস্ট চলছে। অগাস্টের প্রথম সপ্তাহে দৈনিকে কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০০-র তলায় আর মৃত্যুর সংখ্যা ৩০-এর কাছাকাছি, তার মধ্যে স্কটল্যান্ডে গত কয়েক সপ্তাহে কোনও মৃত্যু হয়নি। লন্ডন শহর যেখানে ঘরে ঘরে কোভিড এনে দিয়েছিল ত্রাস, সেখান এখন ৩০ জন মাত্র দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা।

আরও পড়ুন: কঙ্গনার দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো হলে চোখ উপড়ে নেওয়ার হুমকি করণী সেনার

এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে আছে বেশ কটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। প্রথমত লকডাউন প্রয়োগ প্রক্রিয়া ছিল সুপরিকল্পিত ও সুদৃঢ়। পুলিশ এবং সেনাবাহিনী বিশেষ ভূমিকা নেয় এই ক্ষেত্রে। অর্থনীতির ওপর লকডাউনের বিপরীত প্রতিক্রিয়া নিয়েও সরকার ছিল ওয়াকিবহাল। সমস্ত কম আয় যুক্ত বাড়িগুলিতে গভর্নমেন্ট থেকে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয় সরাসরি। ফলে জীবিকার জন্য হন্যে হয়ে মানুষকে আর বেরোতে হয় না। ওষুধ থেকে শুরু করে সব নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হয় প্রৌঢ় মানুষদের জন্য। তার ফলে লকডাউন খুলে দেওয়ার তাড়া কিছুটা হলেও কমে যায়, অনেক ধীরে ধীরে তা তুলে দেওয়া হয় সময়ের সঙ্গে। আটকানো যায় সম্ভাব্য দ্বিতীয় স্পাইক বা করোনার অন্তর্দেশীয় মহামারী।

এই বিপুল অর্থসংস্থান হয় সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে, এগিয়ে আসে অনেক দাতব্য সংগঠন। তাছাড়াও বিভিন্ন ট্রেনের আসন্ন প্রজেক্টগুলি সাময়িকভাবে পিছিয়ে বা স্থগিত করে তার থেকেও আর্থিক সংস্থান করা হয়। সব মিলিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের থেকেও বেশি অর্থ খরচ করে সরকার স্বাস্থ্য পিছু।

ঘরবন্দি থাকার আরেক সমস্যা হল ডিপ্রেশন, যা সমাধান করতে অসংখ্য কলেজ পড়ুয়ারা এগিয়ে আসে রোজ একা থাকা মানুষগুলোকে ফোন করে কথা বলতে। সরকার এবং চ্যারিটি সংগঠন থেকে তাদের ইন্টারেন্টের বা ফোনের মাধ্যমে সঙ্গ দেওয়ার জন্য নানা ব্যবস্থা গৃহীত হয় মানুষের একাকিত্ব কাটাতে।

এছাড়া ওষুধ প্রয়োগে তারা গ্রহণ করে অগ্রণী ভূমিকা। ব্রিটেন ডাটাইন্সটিউট থেকে বের করা হয় গাইড লাইনস বিভিন্ন ওষুধের প্রয়োগ নিয়ে যা চিকিৎসার ধারা বদলে দেয় প্রথমেই। তারপর সরকার ভেন্টিলেশন যন্ত্র কিছু বাড়ালেও মন দেয় CPAP বা পসিটিভ এয়ার প্রেসার যন্ত্র তৈরিতে যা মানুষের বাঁচার সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়, কদিনের মধ্যে বিভিন্ন বড় হলগুলি বদলে যায় হাসপাতালে। এরপর তারা প্রকাশ করে খুব সস্তাও সহজলভ্য ওষুধ ডেক্সামেথাসনের প্রয়োগে করোনা নিরসনের উপায়, যা বদলে দেয় সম্পূর্ণ চিত্রটা। আর অবশেষে অক্সফোর্ড ক্রমশ এগিয়ে চলেছে তাদের অন্তিম ধাপের দিকে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের।
সব মিলিয়ে প্রথমে নীতির গাফিলতিতে জর্জরিত হলেও সময়ের সঙ্গে তারা দ্রুত বদলে ফেলে নীতি, ফলে বদলে যায় সম্পূর্ণ পরিস্থিতি।

হ্যাঁ ঠিক, এখনও নিকষ অন্ধকার ঘিরে রেখেছে আমাদের। কিন্তু তাও তার মধ্যেই আছে আলোর গল্প, আশার গল্প। সেই আলো ধরেই বেরিয়ে এসেছে ইউরোপ তথা ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের মতন দেশ। রোগাক্রান্ত শ্বাসকষ্টে ভারী বাতাস হয়ে এসেছে হালকা। সেই আলোতেই বেরিয়ে আসবে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। শুধু কিছুটা অপেক্ষা, ধৈর্য আর সর্বোপরি মানবিকতা। আবার তবেই আমরা পাব এক কাঙ্খিত সুস্থ পৃথিবী।

Related Articles

Back to top button
Close