fbpx
গুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

ভূমৌ দত্তেন তৃপন্তু তৃপ্তা যান্তু পরাংগতিম

রণজিৎ ভট্টাচার্য: ভাদ্রমাসের  কৃষ্ণা প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা (মহালয়া) পর্যন্ত কৃষ্ণপক্ষটি ‘প্রেতপক্ষ’ বা ‘পিতৃপক্ষ’ হিসাবে চিহ্নিত আর  আশ্বিনের শুক্লপক্ষ ‘মাতৃপক্ষ’, যে পক্ষে নবরাত্রি পালিত হয় এবং দেবী মহামায়া দুর্গার  অকালবোধন করে পুজো হয়।  এই  পিতৃপক্ষে পরলোকগত পিতৃ-মাতৃ উভয়কূলের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জলদানই তর্পণ।

এই তর্পণ বছরের প্রতিদিনই করা  যায়, তবে এই পিতৃপক্ষে প্রতিপদ থেকে মহালয়া পর্যন্ত প্রতিদিন তর্পণ করার ব্যবস্থা অতি প্রাচীন এবং শুধু ব্রাহ্মণ নয়,  সকলের জন্যই এই বিধান আছে।  তাই বর্তমান যুগেও ব্রাহ্মণ-বৈশ্য-শূদ্র সকলেই নানা কাজের  ব্যস্ততার মধ্যেও  অন্তত  একদিন ওই মহালয়া তিথিতে তর্পণে অংশ নিতে দেখা যায়।  এই পিতৃপক্ষ জুড়েই গয়া, এলাহাবাদের সঙ্গমস্থল, নাসিক, উজ্জয়িনীতে সারা ভারতের মানুষ জড়ো হয়ে তাদের পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করেন এবং বহু মানুষ মহালয়ার দিন তর্পণান্তে পার্বণ শ্রাদ্ধ করে থাকেন।

‘ওঁ যমায় ধর্মরাজায় মৃত্যবে চান্তকায় চ। বৈবস্বতায় কালায় সর্বভূতক্ষয়ায় চ।।’

বিভিন্ন বৈদিক রীতি অনুসারে যেমন সামবেদ, যজ্জুর্বেদ, ঋগবেদে–তর্পণের ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্র ও বিধি উল্লিখিত আছে।  কিন্তু সব  ক্ষেত্রেই কতকগুলি মন্ত্র প্রায় এক, কারণ উদ্দেশ্যে তো একই।  বৈদিক বিধিতে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলা হয়েছে  যে ব্যক্তি  জলপ্রার্থী  পিতৃ-মাতৃকূলকে তর্পণের মাধ্যমে জলদান করেন না, সেইসব তৃষ্ণার্ত পূর্বপুরুষ অত্যন্ত দুঃখ পান এবং দেহের রক্ত পান করে তৃষ্ণা মেটান। তাই আয়ু, শক্তি, ধর্ম ও সুস্বাস্থ্যকামী মানুষেরা অবশ্যই তর্পণ করবেন।

পিতৃপুরুষকে জলদান সবাই করতে পারেন। এতে কোনও লিঙ্গবিভাজন নেই।

তাই নিজ নিজ পূর্বপুরুষ — পিতৃকুলের তিন পুরুষ অর্থাৎ বাবা, ঠাকুরদা এবং তাঁর বাবার (প্রপিতামহ) সঙ্গে সঙ্গে মা,  ঠাকুরমা (পিতামহী) এবং তাঁর শাশুড়ি (প্রপিতামহী) এবং মাতৃকূলের দাদু, তাঁর বাবা (প্রমাতামহ) এবং তাঁর বাবা (বৃদ্ধপ্রমাতামহ) সঙ্গে দিদিমা (মাতামহী), তাঁর শাশুড়ি (প্রমাতামহী) এবং তাঁর শাশুড়ি (বৃদ্ধপ্রমাতামহী) প্রত্যেকের নাম উল্লেখ করে তাদের উদ্দেশ্যে জলদান করতে হয়।  কিন্তু এ সবের আগে আমাদের সকলের বহুল পূজ্য দেবতা যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র বা শিব এবং প্রজাপতির উদ্দেশ্যে জলদান করা হয়। তারপর ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন মুণি ও ঋষিদের নামে যেন মরীচি, অত্রি, অঙ্গীরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, প্রচেত, বশিষ্ট, ভৃগু, নারদ আর ধর্মরাজ যম, চিত্রগুপ্ত, ভীষ্ম সকলকে তৃপ্তির জন্য জলদান করতে বলা হয়েছে।

তিনি আসছেন।

এই তর্পণ বিধিতে দেখা যাচ্ছে মাটির উপরে এবং নীচে যেসব কীট, পতঙ্গ বাস করে তাদের নামেও ভূমিতে জলদান করা  হয়  এই মন্ত্রে—‘ওঁ অগ্নিদগ্ধাশ্চ যে জীবা যেহপ্যদগ্ধা কুলে মম। ভূমৌ দত্তেন তৃপন্তু তৃপ্তা যান্তু পরাংগতিম॥’ এছাড়াও  মৃত্যুর  পর যারা নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে তাদেরও সকলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে জলদান হয় (ওঁ নরকেষু সমস্তেষু যাতনাসু চ যেস্থিতাঃ, তেষমাপ্যায়নায়ৈতদ্দীয়তে সলিলং মায়া) এবং যাঁর কোনও বন্ধু নেই বা জন্ম-জন্মান্তরে কোনও বন্ধু ছিল না তাদের তৃপ্তির জন্য জল দেবার ব্যবস্থা রয়েছে এই মন্ত্রেই—‘ওঁ যে হ বান্ধবা বান্ধবা যে হ ন্য জন্মনিবান্ধনবা তে  তৃপ্তিমখিলাং যন্তু যে চাষ্মতোয়কাঙিক্ষণঃ॥’

এই ব্যবস্থার মধ্যে ওই সময়ের ব্রাহ্মণসমাজের যাঁরা এই বিধি বা মন্ত্র তৈরি করেছেন, তাদের উদার মানবিকতার একটা পরিচয় পাওয়া যায়।  বোঝা যায় তখন সমাজ কতটা ঐক্যবদ্ধ এবং    সামগ্রিকভাবে আবদ্ধ ছিল। তর্পণ শেষ হচ্ছেও রাম ও লক্ষ্মণের নামে জলদানের পর। কিন্তু এখানে রামতর্পণের মন্ত্রে পাওয়া  যাচ্ছে সপ্তদ্বীপসহ ত্রিভুবন নিবাসী সকলের তৃপ্তির জন্য এই জলদান করা হচ্ছে—‘ওঁ অব্রাহ্মভুবনাল্লোকা দেবদিপিতৃমানবাঃ।  তৃপ্যন্তু পিতরঃ সবের্ব মাতৃমাতামহাদয়ঃ॥  অতীতকুলকোটীনাং সপ্তদ্বীপনিবাসিনাম ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যন্তু ভূবনত্রয়ম॥’

মহয়ালয়ায় অনেকেই করেন পার্বণশ্রাদ্ধ।

তিন ভুবনের সকলের তৃষ্ণার তৃপ্তির উদ্দেশ্যে এই জলদান। এমন মহৎ কর্মটি আমরা অনেকেই অবহেলা করছি এই যুক্তিতে এখানে একটু জল অন্য পাত্রে ঢাললেই কি সেই আত্মা তৃপ্ত হয়? বৈজ্ঞানিক যুক্তি হয়তো হয়না, কিন্তু এই তর্পণের মন্ত্র বুঝে নিগুঢ় অর্থ নিজের মধ্যে অনুরণিত করতে পারলে এই বৃহৎ সংসারে সকলকে নিয়ে চলা, সকলের শুভ কামনা, সার্বিক উন্নতির একটা মানসিকতা উঠে আসতে পারে। আর একজন সুমানুষ হওয়ার জন্য এমন মননের প্রয়োজনীয়তা কি অস্বীকার করা যায়? এখানেই তর্পণের মাহাত্ম্য।

Related Articles

Back to top button
Close