fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

হাজারো বেকারদের নতুন কর্মের দিশা দেখাচ্ছে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ‘বায়োফ্লক’ মৎস চাষ পদ্ধতি

তারক হরি, পশ্চিম মেদিনীপুর: বর্তমান যুগের যা অবস্থা, জনসংখ্যা দিন দিন যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারত্ব সমাজ। শিক্ষিতরা আজ বঞ্চিত, নতুন কোনো পথ নেই কর্মসংস্থানের, সেক্ষেত্রে বেশীর ভাগই এখন ঝুঁকছে স্বাধীন ব্যবসার লক্ষ্যে। মৎস্য চাষের বৈজ্ঞানিক উপায়ে নতুন এক পদ্ধতি যার নাম বায়োফ্লক। মাছ চাষের এটি এমন এক পদ্ধতি যেখানে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অল্প জায়গায় বিপুল পরিমান মাছ চাষ করা যায়। যা মাছের উৎপাদন অতি দ্রুত বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে বলে দাবী করছেন বায়োফ্লকে মাছ চাষ করা চাষিরা।


পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকে ধামতোড় গ্রামের এমনিই এক বায়োফ্লকের অভিজ্ঞপ্রাপ্ত মাছ চাষী সৌমেন মহাপাত্র বলেন , “বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে মাছ চাষ শুরু করি। আগে পুকুরে মাছ চাষ করেছিলাম, কিন্তু ব্যবসায় এক বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় পুকুরে চাষ বন্ধ করে দিই এবং নিজ উদ্যোগে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে বর্তমানে সফলতার মুখ দেখছি। বায়োফ্লকে মাছ চাষ করতে গেলে খুবই সামান্যতম জায়গা প্রয়োজন, যারা ট্যাংক করতে পারবেন না তাঁরা কম আয়তনের অগভীর জায়গাতেও শুরু করতে পারেন। ট্যাংক করতে শুরুতে সাধারণত একটি খাচার মতো তৈরি করা হয়, যার নিচের দিকে ঢালাই দিয়ে মাটির সাথে আটকে দেয়া যেতে পারে। এর ঠিক মাঝামাছি জায়গায় জলের পাইপ সেট করা হয় সার্বক্ষনিক অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থার জন্য। অনেকে আবার ঢালাই না করেও পলিথিন দিয়েও মেঝের জায়গা প্রস্তুত করে ওপর থেকে খাচাটি ঢেকে দিতে হবে। তার পর ঠিক মতো ফ্লক তৈরি হলে জলের রং হবে সবুজ বা বাদামি, আর জলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দেখা যাবে।এবং তাপমাত্রা ২৪-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হবে, এখানে মাছ খাবার খায় আর বড় হয় – এটাই এর মুল থিম। অক্সিজেন ভালো থাকার কারণে মাছগুলো আনন্দে থাকে, যেটা পুকুরে সবসময় হয় না। একটা কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে মাছ দ্রুত বড় হয়।”


তিনি আরও বলেন , ‘ বায়োফ্লক একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেখানে জৈব বর্জ্যের পুষ্টি থেকে পুনঃব্যবহারযোগ্য খাবার তৈরি করা হয়। অর্থাৎ যে ব্যাকটেরিয়া ও শৈবাল তৈরি হয় তা জলে উৎপন্ন হওয়া নাইট্রোজেন গঠিত জৈব বর্জ্যকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি হতে না দিয়ে নিজেদের বংশ বাড়ায় এই পদ্ধতিটিকেই ফ্লক বলে। জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন, পিএইচ, ক্ষারত্ব, খরতা, ক্যালসিয়াম, অ্যামোনিয়া, নাইট্রেইট, ফসফরাস, আয়রন, জলের স্বচ্ছতা, গভীরতা, লবণাক্ততা – এগুলোসহ সবকিছুর সুনির্দিষ্ট পরিমাণ মেনে ব্যবস্থা নিতে হয়। এসব ফ্লকে প্রচুর উপাদান থাকে, যা মাছের পুষ্টির যোগান দেয়।

মনে রাখতে হবে জলে নাইট্রোজেন আর কার্বনের ব্যালেন্স ঠিকমতো না হলে এটা কাজ করবে না এবং মাছ মারা যাবে। অর্থাৎ পদ্ধতিটির সঠিক প্রয়োগ না হলে মাছের রোগ হবে বা মাছ মারা যাবে। এই পদ্ধতিতে তেলাপিয়া, রুই, শিঙ্গি, মাগুর, পাবদা, ও চিংড়ীসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা যেতে পারে। তবে যারা নতুন করে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষ শুরু করতে চান তারা অবশ্যই প্রথমে তেলাপিয়া, শিঙ্গি ও মাগুর দিয়েই মাছ চাষ শুরু করাটা ঠিক হবে। সৌমেন বাবুর এই সফলতা দেখে অনেক বেকার যুবকরা আজ আগ্রহী হয়ে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করে দিয়েছেন।

 

এনিয়ে এখনও পর্যন্ত সৌমেন নিজস্ব তত্ত্বাবধানে প্রায়, ৫০ এর বেশি ডেবরা থানা সহ পার্শ্ববর্তী জেলার বেকার যুবকদের তিনি হাতে কলমে এই বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে নতুন দিশা দেখিয়ে দিয়েছেন, যে স্বল্প জায়গায় যাতে অধিক পরিমাণ মাছ চাষ করা যায়। এই ব্যবসায় সত্যিই লাভের মুখ দেখছে বলে জানিয়েছেন অনুপ্রাণিত হওয়া বেশ কিছু নতুন চাষিরা।
এই প্রযুক্তি যদি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে আমাদের দেশের মাছের উৎপাদন অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। ফলে মাছ উৎপাদন করে ” মাছে ভাতে বাঙালী” এই উক্তিটি পুনরায় বাস্তবায়নের পথে হাটছে, এবং গ্রাম বাংলার বেকার শ্রেণীর মানুষেরা লাভের সন্ধানে একটি নতুন দিশা পেল।

Related Articles

Back to top button
Close