fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাগুরুত্বপূর্ণবিনোদনহেডলাইন

আশুতোষের আলোয় জন্মশতবর্ষ……

অরিজিৎ মৈত্র: আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। নাহ, বাংলার বাঘ নয়। বাংলা কথাসাহিত্যের প্রাণ পুরুষ। কয়েক দশক ধরে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর লেখনীতে। সিস্টার রাধা মিত্রকে নিশ্চয়ই ভুলে যাননি সাহিত্যরসিকরা। কারণ সিস্টার রাধা মিত্রই তো দ্বীপ জ্বালিয়ে গেছেন চলচ্চিত্র আর সাহিত্যের মেলবন্ধনে। পারিবারিক বৃত্তে কেউ কখনও সাহিত্যচর্চা করেননি। তবু তিনি বেছে নিলেন সাহিত্যের পথকেই জীবিকা হিসেবে। তাঁর লেখায় জায়গা করে নিয়েছে মানুষ, মানুষের জীবন এবং মানুষের কাহিনি।

মেয়ের খাতায় বাবা আশুতোষের অটোগ্রাফ।

১৯৪৩ সালে খুব অপটুভাবে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের লেখক সত্বা জেগেছিল। সেটা জাগিয়েছিল নতুন করে বা পুনরায় পড়া চারটি উপন্যাস। শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’, তারাশঙ্করের ‘কালিন্দী’ এবং দু’খানি ইংরেজি বই ‘ইটারনাল সিটি’ এবং ‘ওয়ার ওয়াইন অ্যান্ড উইমেন’। সেরকমই এক সময় স্থির করলেন লিখবেন। হাতে তুলে নিলেন কলম। বয়স তখন বছর কুড়ি। শুরু হল লেখা আর ছিঁড়ে ফেলা। রাত জাগাও শুরু হল, পড়ার জন্যে নয়, লেখার জন্যে। বাবা-মা এবং অন্যান্য কৃতী সন্তানদের সংসারে এই ছেলে তখন সকল দুশ্চিন্তার কারণ। এগোনও সহজ না হলেও এগিয়ে চলতে হচ্ছিল। আর পাঁচটা মানুষের মত জীবনের চড়াই-উৎরাই পেরিয়েই চলতে হচ্ছিল।
সেই সময় আবার ভাগ্য বিশ্বাসঘাতকতা করল। প্রথম উপন্যাস ‘কালচক্র’ প্রকাশের মুখ দেখল। লেখা হল আরও তিনটি উপন্যাস ‘আর্তমানব’, ‘জীবনতৃষ্ণা’ এবং ‘চলাচল’। সিনেমা করার জন্য কনট্রাক্ট হয়ে গিয়েছিল ‘কালচক্র’-এর। ‘জীবনতৃষ্ণা’ ছাপার কাজও শেষ কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে ‘কালচক্র’ ছায়াছবি হতে গিয়েও হল না। ‘জীবনতৃষ্ণা’-র প্রকাশনা বন্ধ করে দিল প্রকাশন সংস্থা। তাও এগিয়ে তো যেতেই হবে। জীবনধারণের জন্যে রোজগারের প্রয়োজন, আর সেই প্রয়োজনের তাগিদে যুগান্তর পত্রিকাতে লিখতে শুরু করলেন ফিচার।
অন্যদিকে কবিরাজির ঔষুধের দোকানে বিজ্ঞাপন লেখার কাজও চলতে থাকল। আবার বসুমতী পত্রিকার সম্পাদক প্রাণতোষ ঘটক দৈনিকে অচল মানুষ সিরিজ লিখতে দেন। এই পত্রিকাতেই লেখা হয়েছিল নার্স মিত্র যা পরবর্তীকালে সাড়া জাগালো জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’ হিসেবে।

বন্ধুপ্রতীম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

যুগান্তর-এর সম্পাদনার কাজ করতে করতে লিখে ফেললেন অজস্র উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, কিশোর সাহিত্য। ১৯৫০ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় চল্লিশ বছর ধরে, জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত লিখেছিলেন। জনপ্রিয়তার নিরিখে লেখকের সৃষ্টিকে মাপলে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একজন সুপার-ডুপার হিট লেখক। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের রচনা যে কতবার চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে হিসেব করে তা বলা কঠিন। তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। ‘চলাচল’, ‘পঞ্চতপা’, ‘শঙ্খবেলা’, ‘আমি সে ও সখা’, ‘নগরদর্পণে’, ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘সাতপাকে বাঁধা’, ‘সাবরমতী’, ‘আলোর ঠিকানা’, ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’ ইত্যাদি। ছবির জগৎ ছাড়াও তাঁর গল্প, উপন্যাস পাঠকমহলে সর্বদাই সমাদৃত।

২৬টি রচনাবলীর পাতা উল্টোলে সামনে আসবে ‘নগরপারের রূপনগর’, ‘অপরিচিতের মুখ’, ‘শিলাপটে লেখা’, ‘বকুল বাসর’, ‘বাজীকর’, ‘নবনায়িকা’, ‘দিনকাল’, ‘শতরূপে দেখা’, ‘বলাকার মন’, ‘পরকপালে রাজারানী’, ‘সবুজতোরণ ছাড়িয়ে’, ‘রাগশর’, ‘উত্তরবসন্তে’, ‘অন্য নাম জীবন’, ‘একজন মিসেস নন্দী’ ইত্যাদি। লেখকের জীবনাবসানের পরে আশাপূর্ণা দেবী বলেছিলেন, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় চলে যাওয়া মানে শুধুই পৃথিবী থেকে একজন মানুষ চলে যাওয়া মাত্র নয়। তাঁর চলে যাওয়া মানে আমাদের চারপাশ থেকে সকালের আলোর মত নির্মল উজ্জ্বল একটি প্রাণখোলা হাসি চলে যাওয়া। একটি প্রাণখোলা প্রাণ চলে যাওয়া। আজকের যুগে ক্রমশই যে হাসি চলে যাওয়া।

ashutosh mukhejee

নিজের রচনা চলচ্চিত্রায়িত হওয়ার কারণে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে উত্তমকুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যয়, সুপ্রিয়া দেবী সহ রূপোলী পর্দার একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে। লেখক জীবনে নাম আর খ্যাতির সঙ্গে পেয়েছেন পুত্রশোক। বড় অসময়ে চলে যান তাঁর পুত্র জয়। স্ত্রী মমতা আমৃত্যু আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করে গেছেন। আর আজ তাঁর নাম যখন জয়গা করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়, তখন কন্যা সর্বাণী চেষ্টা করছেন বাবার লেখার ধারা বয়ে নিয়ে যাওয়ার। আশুতোষের আলোয় লেখকের শতবর্ষকে ধরে রাখার প্রচেষ্টায় মগ্ন প্রকাশকের। প্রেক্ষাগৃহের উজ্জ্বল আলোয় কথা ছিল তাঁর শতবর্ষ পালনের কিন্তু সেই পরিকল্পনায় বাধ সেধেছে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি। তাই লেখকের সম্পর্কে লেখার মাধ্যমেই শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

Related Articles

Back to top button
Close