fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

দুর্গাপুর ব্যারেজের লকগেট মেরামতে রাজ্যের পরিকল্পনায় অভাবের অভিযোগ বিজেপির

জয়দেব লাহা, দুর্গাপুর: তিনদিনেও জলস্রোত ঠেকানো দুর অস্ত। উল্টে বিপর্যস্ত লকগেট চ্যানেলে রাতে বাড়ল বাড়তি জলের স্রোত। যার জেরে ৪৮ ঘন্টা পরও মেরামতের কাজ হাত দিতে পারল না বিশেষজ্ঞরা। আর তাতেই বিস্তর অভিযোগ উঠল পরিকল্পনায়। প্রশ্ন উঠেছে, বার বার ব্যারেজের লকগেট বিপর্যয়ে জলশূন্য কেন? যার ফলে চরম ভোগান্তির শিকার শিল্পাঞ্চলবাসী। জলসঙ্কটের মুখে গোটা আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল। প্রযুক্তির যুগে লকগেট মেরামতে পরিকল্পনায় অভাবের অভিযোগ তুলল বিজেপি।
 প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে দুর্গাপুর ব্যারেজের ৩১ নং লকগেটের সাপোর্টিং খিল ছেড়ে পড়ে। জলের চাপে ভেঙে বাঁক ধরে যায়। ফলে চ্যানেল থেকে বেরিয়ে আটকে যায়। আর তার ফলে হু হু করে ব্যারেজের জল বেরিয়ে যেতে থাকে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় প্রশাসনিক আধিকারিকরা। লকগেটে বড়সড় দুর্ঘটনা ঠেকাতে পার্শ্ববর্তী লকগেটও খুলে দেওয়া হয়। বিকাল নাগাদ গোটা ব্যারেজে জলশূন্য হয়ে পড়ে। চলতি বর্ষায় ভাল বৃষ্টিপাতের দরুন দামোদর উপকুলবর্তী ও শাখা নদীর জল নামতে থাকে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কাজ শুরু করে। কিন্তু তিনদিনেও বালির বস্তা দিয়ে উপরিভাগের জলস্রোত ঘোরাতে কার্যত হিমসিম খেতে সেচ দফতরকে। তার ওপর সোমবার রাত্রে প্রায় হাজার কিউসেক জল ওই চ্যানেলে ঢুকে পড়ে। আর তাতেই গোঁদের ওপর বিষ ফোঁড়া হয়ে দাঁড়ায় জলস্রোত ঠেকানোয়।
যার ফলে লকগেট পুনস্থাপনের কাজই শুরু করতে পারেনি বিশেষজ্ঞরা। লকগেট না বসানোয় সোমবারও জলপুর্ন হল না ব্যারেজ। ফলে সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছে গোটা শিল্পাঞ্চল। লকগেট মেরামতের পরিকল্পনার ঘাটতির অভিযোগ তুলেছে বিজেপি।
প্রসঙ্গত,  দামদরের দুর্গাপুর ব্যারেজের ওপর নির্ভরশীল গোটা শিল্পাঞ্চল। দুর্গাপুর তাপবিদ্যুৎ, মেজিয়া তাপবিদ্যুত, ডিপিএল , দুর্গাপুর ইস্পাত, পানাগড়ে ম্যাট্রিক্স সারকারখানা, অন্ডালে তাপবিদ্যুৎ সহ একাধিক শিল্প কারখানা ব্যারেজের ওপর। গোটা শহরের পানীয় জল ব্যাবস্থাও নির্ভরশীল এই দামোদরের ব্যারেজের ওপর। ডিভিসির মাইথন, পাঞ্চেত জলাধার থেকে দামোদর ব্যারেজে রাখা হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজন মত সরবরাহ করা হয়।
ব্যারেজ জলশূন্য করতে ঝাড়খন্ডে থাকা ওই দুই জলাধারের জল ছাড়া আটকানো হয়। আর তার জেরে দুর্গাপুরে থাকা ফিডার ক্যানেল জলশূন্য। একই সঙ্গে আসানসোল শহরেও জোগান দেওয়া রিজার্ভারে সঙ্কটের আশঙ্কা দেখছে। ফলত গোটা শিল্পাঞ্চল এখন জলসঙ্কটের মুখে। ডিভিসি ( তাপবিদ্যুৎ) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে,” মেজিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মজুত জল এখনও ২-৩ দিন চলবে। অন্ডাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মজুত জল এখনও ৪-৫ দিন চলবে।” ডিএসপির জনসংযোগ আধিকারিক বেদবন্ধু রায় জানান,” কারখানার মজুত জল ২-৩ দিন চলবে। সংস্থার কারিগরি প্রযুক্তি সবরকম সহযোগিতা করা হচ্ছে।”
 গত ২০১৭ সালের ২৪ নভেম্বর ব্যারেজের ১ নং লকগেট ভেঙে চ্যানেল থেকে বেরিয়ে বিপত্তি ঘটেছিল। তখনও জলশূন্য করা ব্যারেজ। চারদিন ধরে চলে লকগেট মেরামতের কাজ। তখনও চরম ভোগান্তির শিকার হয় শিল্পাঞ্চলবাসী। তারপর ব্যারেজের ১১ টি লকগেট নতুন করে পুনস্থাপন কাজ শুরু হয়। যারমধ্যে ৪ টি পুনস্থাপন হয়েছে। বাকি রয়েছে ৭ টি। প্রশ্ন, বার বার ব্যারেজের লকগেট বিপর্যয় এবং মেরামতের জন্য জলশূন্য করা হয় ব্যারেজ। গোটা দেশ যখন ডিজিটাল ও প্রযুক্তির স্বপ্ন দেখছে। গঙ্গা নদীর তলায় মেট্রো চলাচলের ব্যাবস্থা হয়েছে। তখন ব্যারেজের জলশূন্য না করে লকগেট মেরামত করার পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয় না কেন?
সোমবার ব্যারেজ পরিদর্শনে আসেন রাজ্য বিজেপির সহ সভাপতি রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন,” রাজ্য সরকারের পরিকল্পনার অভাব। যার মাশুল দিতে হচ্ছে শিল্পশহরবাসীকে। পাশেই পানাগড় সেনাছাউনী। বিপর্যয় মোকাবিলায় তাদের সহযোগিতা নিতে পারত। তিন ধরে জলস্রোত ঠেকাতে সম্পুর্ন ব্যার্থ সেচ দফতর।” তিনি আরও বলেন,” এটাও একটা শিল্প তাড়ানোর ষড়যন্ত্র রাজ্যের। এরকমই ধুঁকছে দুর্গাপুরের বহু কারখানা। তিন চারদিন জল না পেলে অনেক  কারখানায় বন্ধ করে দেবে হয়তো। তখন কেন্দ্রের ওপর দোষারোপ করবে। রাজ্য  লকগেট বিপর্যয় মোকাবিলায় রাজনীতি করছে রাজ্য। মানুষকে দুর্ভোগে ফেলছে।” প্রদেশ কংগ্রেসের পশ্চিম বর্ধমান জেলা সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তী জানান,” ব্যারেজ তৈরীর পর বিগত ৬৫ বছরে আধুনিকিকরন কিছুই হয়নি। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যাবহারের অগ্রগতি দরকার ছিল। বিগত তিন বছর দুবার গোটা শিল্পাঞ্চলকে ভোগান্তির মুল করান প্রযুক্তির ব্যাবহারে পরিকল্পনার অভাব। একই সঙ্গে শহরে ডিভিসি, ডিএসপির মত সংস্থা রয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কারিগরি পরামর্শ নেওয়া উচিত ছিল। সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। “
দুর্গাপুর পুরসভার মেয়র দিলীপ আগস্তী  জানান,”গতবারের থেকে একটা শিক্ষা হয়েছে। তাই বিকল্প পানীয় জল সরবরাহের জন্য শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ১১ টি ডিপ টিউবয়েল করা হয়েছে। ৪০ টি ট্যাঙ্কার রাখা হয়েছে। সেখান থেকে জল নিয়ে ট্যাঙ্কার মাধ্যমে জল সরবরাহ করা হবে।” এদিন সেচ দফতরের সচিব গৌতম চট্টোপাধ্যায় বলেন,” জলস্রোতের ফলে বিকল লকগেটে গভীর চ্যানেল তৈরী হয়েছে। উপরিভাগের জলস্রোতের গতি ঠেকানো ও ঘোরানোর কাজ শুরু হয়েছে। ৪০০ মিটার ওপরে বালির বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শাল বল্লা ও বালির বস্তা দিয়ে ৩১ নং লকগেট চ্যানেলের জলস্রোতও ঘোরানোর কাজ চলছে। সোমবার রাত্রের মধ্যেই ওই কাজ সম্পুর্ন হবে। তারপর বিকল লকগেটটি তুলে নতুন লকগেট বসানো হবে। এবং ব্যারেজ জলপুর্ন করা হবে।”

Related Articles

Back to top button
Close