fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

পশ্চিবঙ্গের জন্ম ও জনক

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়: বাংলা ভাগ নিয়ে পূর্ববঙ্গীয় তথা বাংলাদেশি তো বটেই পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিদের মধ্যেও ক্ষোভ আর হায়-আফশোষের শেষ নেই। ভাগাভাগির বিনিময়ে পাওয়া ‘স্বাধীনতা’ যে সুখের হয়নি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশভাগের সুফল কার্যত শূন্যও নয়, ঋণাত্মক। লোকক্ষয় শুধু Rdcliffe লাইনের তাৎক্ষণিক অভিঘাত নয়, একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তাহলে মহম্মদ আলি জিন্নাহ্র চাহিদামতো পুরো বাংলাকে পাকিস্তানে পাঠানোই কি রক্তপাত এড়ানোর উপায় ছিল? দেখা যাক।

১৯০৫ সালে যখন লর্ড কার্জ়ন প্রথম বেঙ্গল প্রভিন্সকে দু টুকরো করার কথা ঘোষণা করেন, তখন তার প্রতিবাদ করেছিল শুধু হিন্দু বাঙালিরা। পূর্ববঙ্গে সংখ্যাগুরু মুসলিমদের প্রতিবেশে নিরাপত্তাহীনতা ও পশ্চিমাংশে বিহারি ও ওড়িয়াভাষীদের কাছে ভাষিক সংখ্যালঘুত্ব – দুটোই হিন্দু বাঙালিদের ভাবিত করে তুলেছিল। লক্ষ্যণীয় সেই সময় মুসলিম বাঙালিরা কিন্তু বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানায়। যে সময় হিন্দু বাঙালি তরুণরা নিত্য বাংলা ভাগের প্রতিবাদে ‘স্বদেশী’ ও ‘বয়কট’ আন্দোলন করে পুলিশি নির্যাতন সহ্য করছে, সেই সময় ১৯০৬ সালে ২৭-৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় নবাব সেলিমুল্লার প্রাসাদে ‘মুসলিম লীগ’-এর জন্ম হল পৃথক রাজ্য ও আলাদা নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবি সংগঠিত করতে। তাহলে ১৯৪৭-এ সেই বাংলারই অখণ্ডতা তাদের কাছে অপরিহার্য মনে হল কেন?

কারণ কলকাতা গণহত্যার নায়ক বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (এখনকার পরিভাষায় মুখ্যমন্ত্রী) হুসেন শাহিদ সোহ্রাবর্দি দেখলেন, বাংলা ভাগ হলে পাটকল সহ অধিকাংশ শিল্পাঞ্চল, কয়লা খনি, কলকাতার মতো বাণিজ্য কেন্দ্র ও ব্যস্ত জাহাজ বন্দর এগুলো সবই হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিম বাংলায় থেকে যাবে, মুসলমান প্রধান কৃষিনির্ভর পূর্ববঙ্গের অর্থনীতি মার খাবে। ২৪ এপ্রিল ১৯৪৭-এ দিল্লিতে একটা প্রেস কনফারেন্স করে two-nation-র বদলে দেশকে তিন টুকরো করে স্বাধীন ‘বাংলা’ দেশ গঠনের প্রস্তাব দেন।

কারণটা সোজা – বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বিহার ও ওড়িশা আলাদা হয়ে গেলে সমগ্র বাংলায় মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৫%)। জিন্না নিমরাজি যেহেতু বাংলা আলাদা হলে পাকিস্তানের ভাগ কমে যাবে। যাইহোক, পাকিস্তানে না গেলেও বাংলা ইসলামিক রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানের বসংবদ হবে, এই বলে জিন্নার মত আদায় করে সোহ্রাবর্দি দ্বিধান্বিত মুসলিম নেতাদের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট হন। যে মুসলিম লীগ ১৯০৬ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত বাংলার অখণ্ডতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিল, সেই লীগই মুসলমান আধিপত্যের গন্ধ পেয়ে ১৯৪৬-৪৭-এ ‘অখণ্ড বাংলা’র প্রধান প্রবক্তা হয়ে উঠল। তাতে অসুবিধা কী?
একটু পিছিয়ে যাই।

বিলেত থেকে আইনে উচ্চ শিক্ষা সেরে ফেরার কিছু বছর পর ১৯৩৪ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও যোগমায়া দেবীর সন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হন।

প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন চালু হলে ১৯৩৭ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নির্দল প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন জিতে কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগ জোটকে সমর্থন জানালে উক্ত জোট ক্ষমতায় আসে। ১৯৩৮ সালে উপাচার্য পদ ছেড়ে শ্যামাপ্রসাদ সক্রিয় রাজনীতিতে চলে আসেন। এরপর ১৯৩৯-এ হিন্দু মহাসভায় যোগ দিয়ে ক্রমে কার্যনির্বাহী সভাপতি হন। মুসলিম লীগ নেতারা মন্ত্রীত্ব থেকে ইস্তফা দেওয়ায় কৃষক প্রজা পার্টি-র এ. কে. ফজ়লুল হকের নেতৃত্বে জোট সরকারে ১৯৪১-৪২ সময়টুকুর জন্য বাংলার অর্থমন্ত্রী হন (Finance Minister)।

কিন্তু এই সময়ই মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য, “মুসলিমরা পাকিস্তানে থাকতে চাইলে তল্পিতল্পা গুটিয়ে যেখানে খুশি চলে যাক।” [“pack their bag and baggage and leave India … (to) wherever they like”] । উপরন্তু ‘৪২-এ বন্যায় প্রভূত প্রাণহানি ও সম্পদ নষ্টের জন্য বাংলার সরকারের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ায় শ্যামাপ্রসাদের গতিবিধির ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপে, বন্যা কবলিত মেদিনীপুর জেলা পরিদর্শনেও তাঁকে বাধা দেওয়া হয়।

সেই সময় ‘হিন্দু মহাসভা’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ’ ভারত ছাড়ো আন্দোলন বয়কট করেছিল, যা নিয়ে বিস্তর কটাক্ষ করা হয়। কিন্তু গভর্নর স্যর জন হার্বাটকে লেখা শ্যামাপ্রসাদের চিঠি থেকে বোঝা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালীন অস্থিরতায় তিনি দেশ বা রাজ্যের অভ্যন্তরে কোনওরকম গোলযোগ চাইছিলেন না। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের ব্যাখাও অনুরূপ।

কিন্তু অনতিপরে ব্রিটিশ সরকারের দমনমূলক আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজেই মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করেন এবং ত্রাণের কাজে মহাবোধি সোসাইটি, রামকৃষ্ণ মিশন ও মারোয়াড়ি রিলিফ সোসাইটির সহযোগিতা আদায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। লক্ষ্যণীয় মেদিনীপুরের বন্যাত্রাণে তাঁর সভায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদেরও উপস্থিতি ছিল, যাঁদের উত্তরসূরীরা শ্যামাপ্রসাদকে বাংলা ভাগের ঘাতক বলে প্রচার করে। ১৯৪৬-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্দল প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন জিতে মুসলিম লীগ পরিচালিত সরকারে পুনরায় অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব পান।

সেই সময় পাঞ্জাবসহ উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে লাগাতার দাঙ্গা থামানোই যাচ্ছিল না। লাহোর রাওয়ালপিণ্ডিতে হিন্দু নিধন, গড়মুক্তেশ্বরে তার প্রত্যুত্তর – হানাহানির নরককুণ্ড! পূর্বদিকেও ‘কলকাতা গণহত্যা’ (Great Calcutta killing. 1946) ও নোয়াখালির পরিকল্পিত হিন্দু নির্মূলীকরণ ছাড়াও পূর্ববঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে অবিরাম রক্তপাত শুরু হল। প্রতিক্রিয়ায় বিহারের মুঙ্গেরে আক্রান্ত হল মুসলিমরা। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ব্রিটেনের Labour Party-র সরকারও উপনিবেশগুলো বিশেষত ভারতের দায় ঝেড়ে ফেলতে চায়। তৎকালীন ভাইসরয় মাউন্টব্যাটন ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য ছ মাসের সময় সীমা দিলেন। এর আগে জিন্না পাকিস্থানের দাবি তোলার পর ১৯৪১ সালে গান্ধীজি পরামর্শ দিয়েছিলেন, বাংলার জনগণ যাতে জনগনণায় অংশ গ্রহণ না করেন।

হয়তো সমস্যা আঁচ করেই ধামাচাপা দেওয়ার প্রয়াস ছিল। কিন্তু মুসলিম লীগের নির্দেশ ছিল যাতে বাংলার প্রতিটি মুসলিম জনগনণায় অংশ নেয়। জনগণনায় দেখা গেল বাংলায় মুসলিমরাই সংখ্যাগুরু – ৫৮%। এই আবহে ১৯৪৬-এ কলকাতাকে দাঙ্গাবিধ্বস্ত এবং পরোক্ষে নোয়াখালিকে হিন্দুশূন্য করার অমর কৃতিত্ব নিয়ে সোহ্রাবর্দি দেশভাগের প্রাক্কালে যখন বাংলার অখণ্ডতা নিয়ে ভাবিত হয়ে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন সংযুক্ত বাংলা (United Bengal)র দাবি পেশ করলেন, তখন তো রাজি হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। নেহেরু, প্যাটেল সহ অন্যান্য কংগ্রেস নেতারা রাজিও হননি। কিন্তু এত কিছুর পরেও হিংসা ও দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং সীমা বিতর্ক এড়ানোর দোহাই দিয়ে সোহ্রাবর্দি বাংলার দ্বিতীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে সংযুক্ত বাংলার চিত্র তুলে ধরলে তাতে সায় দিয়েছিলেন শরৎ চন্দ্র বসু, কিরণ শঙ্কর রায়, আব্দুল হাসিম, সত্যরঞ্জন বক্সি ও ফজ়লুল কাদের চৌধুরী। সোহ্রাবর্দির সঙ্গে কংগ্রেস নেতা শরৎ বসুর রফাও হয়ে গিয়েছিল, যে কংগ্রেসের বাংলা শাখা (Congress Party’s Bengal section) ও মুসলিম লীগের বাংলা বিভাগের (Muslim League’s Bengal Division) জোট সরকার গড়া হবে। অখণ্ড বাংলার প্রস্তাবকদের মধ্যে কিরণ শঙ্কর রায় পরে চক্রান্ত থেকে সরে যান বলে জানা যায়।

বিপদের আঁচ পেয়ে শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমাদ গোণেন। বাংলার নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন, বাংলার শিল্পসমৃদ্ধ পশ্চিমাংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ পেয়ে সারা বাংলায় মুসলিম শাসন কায়েম করা ছাড়া বাংলার অখণ্ডতা চাওয়ার আর কোনও কারণ যে লীগের থাকতে পারে না। “They also opined that even though the plan asked for a sovereign Bengal state, in practice it will be a virtual Pakistan and the Hindu minority will be at the mercy of the Muslim majority forever”। লীগের শাসনে বাংলা মানে যে আদতে আর একটি পাকিস্তান, যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দু বাঙালিদের মুসলমান ভ্রাতাদের দয়ার মুখাপেক্ষী থাকতে হবে, যে দয়ার নিদর্শন কিছুদিন আগে কলকাতা, নোয়াখালিসহ বহু জায়গায় পাওয়া গেছে। ডঃ মুখার্জী বাংলার সমস্ত জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখিয়ে প্রশ্ন তুললেন, ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্তানে গেলে বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও পাকিস্তানে যাবে কেন? লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে (Lord Mountbatten) তিনি চিঠি লিখে বোঝান, বাংলার বিভাজন এবং হিন্দু বাঙালিদের নিজস্ব বাসভূমি পশ্চিম বাংলাকে ভারতে রাখা কতটা জরুরি। তাঁর যুক্তিকে ইংরেজ সরকারও অস্বীকার করিতে পারেনি।

শ্যামাপ্রসাদকে সমর্থন করেন দামোদর সাভারকার সহ আরও অনেকে। শ্যামাপ্রসাদ গান্ধী ও নেহেরুকেও বোঝালেন। গান্ধীজী হিন্দু বাঙালির জন্য ভাবতে কতটা রাজি হতেন বলা যায় না, তবে স্বয়ং লর্ড মাউন্টব্যাটন বুঝেছিলেন। কলিন্স অ্যান্ড লাপিয়েরের “Mountbatten and the Partition of India” গ্রন্থে আছে মাউন্টব্যাটন গান্ধীজীকে বলেছিলেন, “আপনি ১৯৪৬-এর ১৬ আগস্টের কথা ভুলে যাবেন না। ঐদিন শুধুমাত্র মহড়া হিসাবে জিন্নাহ্ কলকাতায় পাঁচ হাজার মানুষ খুন করিয়েছিলেন।”

যাইহোক, ১৯৪৭-এর ১৫ এপ্রিল তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত “Bengal Partition Convention”-এ হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে শ্যামাপ্রসাদ ভারত ভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাগেরও দাবি করলেন। হিন্দুত্ব ও সাম্প্রদায়িকতাকে এক করে যারা দেখতে চায়, তারা মুসলিম লীগের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জোট বাঁধা নিয়ে কটাক্ষ করে, কিন্তু লীগের করাল রূপে বীতশ্রদ্ধ হয়েই যে ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে ডাঃ মুখার্জী তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলা ভাগ দাবি করেছিলেন, সেই সহজ কথাটা সেইসব সমালোচকদের উর্বর মস্তিষ্কে প্রবেশাধিকার পায় না। অবশ্য ভাগাভাগির পরেও যে হিন্দু বাঙালির সংকট কাটেনি – সেটা অন্য বিষয়। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাসে যে হিন্দু বাঙালিরা ১৯০৫-১১ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, ১৯৪৭-এ তাদেরই প্রাণ বাঁচাতে বাংলার অঙ্গচ্ছেদ করতে হল।

অশোক মিত্রসহ বহু বাঙালি কমিউনিস্ট নেতার এ জন্য আফশোষের সীমা নেই। অশোকবাবু বাংলাভাগে কংগ্রেসের রাজি হওয়া নিয়ে বক্রোক্তি করেছিলেন, “পশ্চিমবাংলাবাসীর জন্য কত দরদ, পূর্বদিকের জেলাগুলোর মানুষের যা খুশি হোক”।

অবশ্য অশোকবাবুদের বাংলা দরদের মান রেখে সোহ্রাবর্দির উত্তরসূরীরা বাংলাভাগের প্রতিশোধটাও নিলেন জমিয়ে। তাই বাংলা ভাগ করেও হিন্দু মৃগয়া আটকানো যায়নি। খুন, ধর্ষণ, বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ ও উচ্ছেদের ধারাবাহিকতায় পূর্ববঙ্গে ১৯০১ সালে যেখানে হিন্দু ছিল ৩৩%, বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহারের পর ১৯১১-য় হল ৩১.৫%, ১৯২১ সালে ৩০.৬%, ১৯৩১-এ ২৯.৪%, ১৯৪১-এ ২৮%, স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর ১৯৫১-তে ২২.৫%, ১৯৬১-তে ১৮.৫%, মুক্তিযুদ্ধে জয় লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে (’৭১-এ জনগণনা হয়নি) ১৩.৫%, ১৯৮১ সালে ১২.১৩%, ১৯৯১ সালে ১০.৫১%, ২০০১ সালে ৯.২%, আর ২০১১-তে দাঁড়িয়েছে ৮.৯৬%।

Source: Census of India 1901-1941, Census of East Pakistan 1951-1961, Bangladesh Government Census 1974-2011, Bangladesh Bureau of Statistics estimate 2015 এটা তো আধিকারিক রিপোর্ট, বাস্তবটা আরও ভয়াবহ। পাকিস্তানের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাসের হার সবচেয়ে বেশি ২৭% থেকে ২২.৫% এববং ১৮.৫% থেকে ১৩.৫%।

হিসাবটা খুব সোজা – মুসলিমদের জন্মহার বেশি আর হিন্দুদের মৃত্যুহার! এমনকি রাজাকার বিরোধী ‘শাহবাগ’ অভ্যুত্থানেও উদারপন্থীদের সঙ্গে মৌলবাদীদের বিবাদের জেরে হিন্দু মেয়েদের অবাধে ধর্ষণ অপহরণ হয়েছে ও হয়ে চলেছে। গড়পড়তা এই হার বজায় থাকলেও ২০২৩-এর মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দু বাঙালির সংখ্যা ৫%-এ নেমে যাবে। বাস্তবে ২০১১-র পর ওপারে হিন্দু নির্মূলীকরণ অভিযান এবং এপারে হিন্দুদের আত্মহননের আগ্রহ যে হারে বেড়েছে, তাতে অচিরেই বাংলাদেশ হিন্দুশূন্য হয়ে যাবে। স্বপ্নের অখণ্ড বাংলায় হিন্দু জনসংখ্যা একই হারে ১৯৪-এ ৪৫% থেকে ২০১৪-য় ১২-১৩%-এ নেমে গেলে হয়ত অসুবিধা ছিল না।

আমাদের ইতিহাস বইতে এসব থাকে না। কোন সর্বনাশ এড়াতে বাংলা ভাগ তার উল্লেখমাত্র না করে বঙ্গভঙ্গ রদে (১৯০৫-১১) হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত অবদান ও কাল্পনিক মৈত্রীর গল্প শুনিয়ে শুধু কাঁটাতার নিয়ে হাহুতাশ করতে শেখানো হয়। কংগ্রেস, বামপন্থী বা স্বঘোষিত সেকুলার রাজনৈতিক শিবিরগুলির প্রভাবে সুমিত সরকার, রোমিলা থাপার, জয়া চ্যাটার্জি প্রমুখের মতো ঐতিহাসিকরা এসব ঘুণাক্ষরে উল্লেখ করেননি, বা করলেও বিকৃত ব্যাখ্যা করেছেন। হিন্দু মহাসভার নেতারা কিন্তু তখন বিপর্যয়ে রাজনৈতিক শিবির দেখেন নি, বাঙালির সার্বিক স্বার্থরক্ষার জন্য কখনও কংগ্রেস কখনও বা বামপন্থী নেতৃত্বকেও সমর্থন দিয়েছেন। স্বার্থান্বেষী হলে শ্যামাপ্রসাদবাবু নিজেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য প্রার্থী হতেন, আর সেই রক্তাক্ত আবহে জনসমর্থন পেতে খুব অসুবিধাও হোত না।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় যখন যুগপৎ শরণার্থী পুনর্বাসনে ও কেন্দ্রীয় উদাসীনতায় নাজেহাল, তখন শ্যামাপ্রসাদই ডাঃ রায়ের তোলা বাংলার ন্যায্য দাবি-দাওয়া সংসদে জোরালোভাবে পেশ করে যথাসম্ভব আদায় করে আনতেন।

অথচ আমাদের বুদ্ধিজীবিকার অন্যতম শর্ত দেশভাগের দায় গান্ধী-নেহেরু এবং বাংলাভাগের দায় শ্যামাপ্রসাদের ওপর চাপিয়ে চাপিয়ে জিন্নাকে দেবদূত বানানো। আর এখন তো ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’-এর পিতৃত্বের দায়ও মহম্মদ আলি জিন্নার পরিবর্তে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ওপর আরোপিত হয়েছে! স্বজাতি ও দেশের জন্য নিজের সারাটা জীবন উৎসর্গ করার বিনিময়ে ভদ্রলোকের হয়তো এই মূল্যায়নই প্রাপ্য ছিল। তবে সান্ত্বনা ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ ও শ্যামাপ্রসাদের জন্মতিথি পালন দ্বারা দেরিতে হলেও বাঙালির একটা বড় অংশ সত্যান্বেষণে আগ্রহ দেখিয়েছে।

(মতামত ব্যক্তিগত)

 

Related Articles

Back to top button
Close