fbpx
ব্লগহেডলাইন

ব্রতচারী আন্দোলন ও গুরুসদয় দত্ত

শ্যামল কান্তি বিশ্বাস: আজ ১০ ই মে, ব্রতচারী আন্দোলনের স্রষ্টা গুরুজী গুরুসদয় দত্তের জন্মদিন। আজকের এই দিনটিতেই অর্থাৎ ১৮৮২ খৃস্টাব্দের ১০ ই মে,অধূনা বাংলাদেশের শ্রীহট্ট জেলার কুশিয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গুরুসদয় দত্ত। কুশিয়ারা নদী তীরবর্তী গ্রামের জমিদার পরিবারে জন্ম হলেও শৈশব থেকে কৈশোর কেটেছে অতি স্বাভাবিক জীবন যাপনের মধ্য দিয়েই। পরিবারের আভিজাত্য তাকে গ্রাস করতে পারেনি। পিতা রামকৃষ্ণ দত্ত ও মাতা আনন্দময়ী দেবীর কনিষ্ঠপুত্র ছিলেন তিনি। দেখা যেত কুশিয়ারা নদী তীরে গো চারন ভূমি তে একাকী অবস্থান কিংবা নদী বক্ষে নৌকায় অবচরণ কিংবা ঘোড়ার পিঠে চেপে দুরন্তপনা, ছোটদের খেলার দলে নেতৃত্ব দিতেও বেশ সাবলীল ছিলেন তিনি এবং এই ভাবেই বেড়ে ওঠা গুরুসদয় দত্তের। শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পনের ক্ষেত্রে মায়ের সান্নিধ্যে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সহ ধর্ম পরায়নতনায় ও মন ছিল গুরুসদয়ের।

মাত্র ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই পিতা মাতাকে হারান তিনি। ১৮৯৮ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন, ১৯০১ সালে এফএ, পরীক্ষায় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এ সময়েই কংগ্রেস অধিবেশনে কংগ্রেস ভলেন্টিয়ার্স ইনচার্জ পদে আসীন হন তিনি। শ্রীহট্ট সন্মিলনীর আর্থিক সহযোগিতায় ১৯০৩ বিলাত যান এবং একই সালে আইসিএস ও ব্যারিস্টারি পড়া শুরু করেন। উভয় পরীক্ষাতেই ১৯০৫ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আই,সি,এস পরীক্ষায় ঘোড়ায় চড়া বিষয়ে ১০০নম্বরের মধ্যে ১০০ নম্বর ই পান তিনি। সে বছরের ই শেষ দিকে দেশে ফিরে আসেন এবং দেশে ফিরেই বিহারের আড়া জেলার মহকুমা শাসক পদে নিযুক্ত হন। তৎকালীন সময়ে বিয়েতে যাওয়ার ফলে সমাজ পতিদের কুনজরে পড়েন তিনি এবং প্রায়চিত্ত স্বরূপ বিধান মেনে না নেওয়ায় বাদ্ধ হন ধর্ম পরিবর্তন করে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষা নিতে। এরপরই এলো সেই শুভক্ষণ১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আইসিএস ব্রজেন্দ্রনাথ দে র চতুর্থ কন্যা সরোজনলিনী দেবীর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন গুরুসদয়। পুঁথিগত বিদ্যা তে এগোতে না পারলেও সরোজনলিনী ঘোড়ায় চড়া, টেবিল টেনিস, বেহালা বাজনা, এবং সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। স্বদেশী গান গাইতে খুব ভালোবাসতেন সরোজনলিনী। ১৯০৯ সালে একমাত্র পুত্রসন্তান বীরেন্দ্র সদয়ের জন্ম।

আরও পড়ুন: লকডাউনে বন্ধ নতুন সেতুর নির্মাণকাজ, সমস্যায় দুই জেলার মানুষ

১৯১১সালে সরোজনলিনী র অনুপ্রেরণায় বিচার বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে ফিরে আসে বাংলায়। ১৯১২ সাল থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার একাধিক জেলা খুলনা, যশোহর, ফরিদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা এবং বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে বিচার বিভাগের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। ১৯১৭ সালে বীরভূম জেলার জেলাশাসক পদে নিযুক্ত হন, তখন থেকেই গঠনমূলক কাজকর্মে সার্বিকভাবে মনোনিবেশ। বীরভূম জেলার সর্বত্র উন্নয়নমূলক কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। ১৯২৯ সালে স্ত্রী,পুত্র নিয়ে জাপানে যান। সেখানকার উন্নয়নমূলক কাজ কর্ম পর্যবেক্ষণ করে অনুপ্রাণিত হন এবং ১৯২০ সালে আবার জাপান থেকে দেশে ফিরে আসেন এবং ১৯২১ সালে পুনরায় বাঁকুড়া জেলার জেলাশাসক পদে নিযুক্ত হন। ১৯২২ সালে সমবায় প্রথায় কৃষি চাষ পদ্ধতির প্রচলন করেন তিনি। ১৯২৩ সালে শাসন বিভাগ থেকে বদলি হয়ে কৃষি ও শিল্প বিভাগ কার্যভার গ্রহণ করেন। ১৯২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি সরোজ নলিনী দেবীর মৃত্যু হয়। দুস্থ মহিলাদের কল্যাণার্থে স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গুরুসদয় দত্ত প্রতিষ্ঠা করেন সরোজ নলিনী নারী মঙ্গল সমিতি।

এরপর১৯২৬ সালে আবার জেলাশাসক হয়ে ফিরে আসেন হাওড়া জেলায়। এই সময়ই গ্রামোন্নয়নের প্রেক্ষাপটে গ্রামের একটি পত্রিকা “গ্ৰামের ডাক” প্রকাশ করেন। গঠন করেন হাওড়া জেলা কৃষি ও হিতকারী সমিতি। পুকুর ,খাল,বিল সংস্কারের মধ্যদিয়ে ম্যালেরিয়া প্রকট, নিবারণ সহ বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে ব্রতী হন তিনি। ১৯২৮ সালে রেলওয়ে ওয়ার্কশপ এর শ্রমিকদের ওপর বামন গাছিতে বিনা প্ররোচনায় ইংরেজ সরকারের মিলিটারি, পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা, তার ইংরেজবিরোধী ঐতিহাসিক রায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, যার জন্য তিনি ইংরেজ সরকারের কু নজরে পড়েন। নিয়ম ছিল আইসিএসকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যায় না তাই শাস্তিস্বরূপ হাওড়া থেকে বদলি করা হয়। ১৯২৯ সালে রোমে আন্তর্জাতিক কৃষি সম্মেলনে যোগ দিয়ে ময়মনসিংহ জেলায় আবার জেলাশাসকের কার্যভার গ্রহণ করেন। ওই বছরই চতুর্থবার পুনরায় লন্ডন যান। সেখানে লোকসংস্কৃতি ও লোকগীতি রক্ষা সমিতির উদ্যোগে একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই লোক সংস্কৃতির উপর ভালোবাসা প্রকট হয়ে ওঠে। জেলাশাসকের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি গঠনমূলক কাজে মন ছিল তার প্রকট। তারপর আবার বীরভূম জেলায় ফিরে আসেন, গঠন করেন মিউজিক্যাল সোসাইটি। এরপরই আবিষ্কারের অন্বেষণে খুঁজে বেড়ানো বাংলার লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতিকে।১৯৩০ সালে বীরভূমের লুপ্তপ্রায় রায়বেশে নৃত্যের পূনঃ আবিষ্কার করেন তিনি। এর পর বহু গান রচনা করেছেন।

১৯৩১সালে প্রতিষ্ঠা করলেন বঙ্গীয় পল্লী সম্পদ রক্ষা সমিতি এই সংগঠনের মূল কাজ ছিল লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতির পুনরুদ্ধার, এরপরই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৩২ সালে র ৬ ই ফেব্রুয়ারি ( বাংলা ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ ২৩ শে মাঘ )ব্রতচারী প্রবর্তনের কথা ঘোষণা। ১৯৩৩ সালে কেন্দ্রীয় বিধানসভার সদস্য থাকাকালীন দিল্লিতে সর্বভারতীয় সঙ্গীত সমিতি গঠন,১৯৩৪ সালে বঙ্গীয় পল্লী সম্পদ রক্ষা সমিতি যার পরবর্তীতে পরিবর্তিত নাম বাংলার ব্রতচারী সমিতি। ১৯৩৫ সালে লন্ডনে আন্তর্জাতিক লোকসংস্কৃতি উৎসবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ। ১৯৪১ সালে ২৫ শে জুন কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় গুরুসদয় দত্তের। ব্রতচারী সখা, ব্রতচারী পরিচয় সহ বহু গ্রন্থের প্রণেতা গুরুসদয় দত্ত।

পরিশেষে যে কথা জানা অত্যন্ত জরুরি, ব্রতচারী অর্থাৎ ব্রত শব্দের অর্থ কোন অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছানোর বিশেষ সংকল্প আর চারী অর্থাৎ চারন করা অর্থাৎ অনুসরন করা কিংবা মেনে চলা সর্বোপরি বলা যেতে পারে,কোন অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছানোর জন্য যে বিশেষ পরিকল্পনা গ্ৰহণ, এবং তারই সফল বাস্তবায়ন হল ব্রতচারী এবং সমাজ জীবনে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন ব্রতচারী।

Related Articles

Back to top button
Close