fbpx
গুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গব্লগশিল্প-বাণিজ্যহেডলাইন

পশ্চিমবঙ্গে কি দুর্ভিক্ষ হতে পারে? কোটি টাকার প্রশ্ন!

সুব্রত চৌধুরী: করোনা সংক্রমণ হওয়ার পর, কিছু প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, ভারত সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সংখ্যাতত্ত্ববিদও এমন আশংকা প্রকাশ করেছেন, পৃথিবীতে মন্বন্তর হতে পারে করোনা ভাইরাসের সর্বগ্রাসী,  স্তব্ধ-করে-দেওয়া করাল প্রভাবে।

এরকম ঋণাত্বক ভবিষ্যৎবাণীতে বৃহত্তর মানবসমাজ আঁতকে উঠবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে পশ্চিমবঙ্গে, এই মুহূর্তে সেটা উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়ও বটে।

১৯৪৩-র বাংলার মন্বন্তরের গা-শিউড়ে-ওঠা আর হাড়-জিরজিরে মরণোন্মুখ, মুমূর্ষু বাঙালীর ফটো আবার ভেসে উঠতে শুরু করেছে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন কোণে।

তার আগে দেখে নেওয়া যাক, ঠিক কী কী কারণে দুর্ভিক্ষ হতে পারে?

টেকনিক্যাল কারণ। যদি পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হয় আগামী ২০২০-র মৌসুমী খারিফ সিজনে।

২৫ এপ্রিল এই প্রবন্ধ লেখার সময়, আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে ২০২০ তে এই ভূ-ভারতে বর্ষার আগমন প্রায় সঠিক সময়েই আর বৃষ্টি প্রায় স্বাভাবিক, বা স্বাভাবিকের থেকে ৮% এধার-ওধার। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, বৃষ্টি বাংলার প্রধান খাদ্যশস্য ধানের জন্য সদা সদয় আর অনুকূল থাকবে ২০২০ তেও।

 

আসলে একবছর ফসল খারাপ হলে, তার কুপ্রভাব পড়ে ঠিক পরের খাদ্য-বছরে। তাই ২০২০ তে দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কা অমূলক হলেও,  ২০২১-এ চিন্তার কারণ থেকে যায় কৃষি-অর্থনীতিবিদদের মনে বেশ কিছু কারণে।

দেশে, ৮০০০ কোটি কিলো খাদ্যশস্য মজুত করা আছে ১৩০ কোটি আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার জন্য বিভিন্ন গুদামে। তাই, মাথা পিছু ৬০ কিলো শস্যে এ বছর তো চলে যাবে। কিন্ত খাদ্যপণ্ডিতরা বেশ চিন্তিত।

কেনো?

এ রাজ্যে এখন লকডাউন চলছে। জুন-জুলাই মাসে ধানের বীজ, বীজতলার প্রস্তুতি হবে। আর তার জন্য চাই তিনটে জিনিস: বীজ, সার আর কীটনাশক।

রাজ্যের ধানের বীজের একাংশ আসে রাজ্যেরই বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলা থেকে আর বাইরের রাজ্য থেকে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোও তাই উদগ্রীব আর মুখাপেক্ষী হয়ে বসে আছে বীজ পাওয়ার আশায়।

লকডাউন চলতে থাকলে, ট্রাক চলাচল কম হলে পশ্চিমবঙ্গে বীজের সরবরাহ স্বাভাবিকভাবেই কম হবে। তার কুপ্রভাব পড়বে আগামী বছরের খাদ্য যোগানে। ধান্য-ফসলের মধ্য-পর্যায়ে অতীব জরুরি ইউরিয়া আর রাসায়ানিক কীটনাশক আসে রাজ্যের বাইরে থেকে। তাই, কৃষির স্বার্থে, মানুষের বাঁচার স্বার্থে, মফস্বলে লকডাউন শিথিল করে রাজ্য সরকারের উচিত কৃষকদের কাছে এই তিনটি রসদ অবিলম্বে পৌঁছে দেওয়া, সাপ্লাই চেন ম্যানেজমেন্ট আর লজিস্টিকস দ্রুত দাঁড় করিয়ে।

আসলে, পশ্চিমবঙ্গের সমস্যাটা ম্যান-মেড, রাজনৈতিক।

করোনা ভাইরাস মবিলিটি রোগের মতো বিদেশ থেকে কিছু হাই-ফ্লাইং উচ্চমধ্যবিত্তদের দেহকে ভেক্টর করে এলেও, দিল্লিতে নিজামুদ্দিনের বিশেষ মিটিং-এ সমবেত দেশি-বিদেশি ধার্মিক লোকেদের মাধ্যমে এবং পরে, সেখান থেকে, পশ্চিমবঙ্গের “সবুজ” গ্রামাঞ্চলে এসে পৌঁছেছে।

এরপর লকডাউন না মেনে উদাসী, অতি-রাজনৈতিক রাজ্য সরকারের শিথিল নিয়মে, এই মারাত্বক ভাইরাসের ছোটো ছোটো খামার আর হ্যাচারি গড়ে উঠেছে, রাজ্য সরকারের দেখেও-না-দেখা অগোচরে,  রাজ্যের বিভিন্ন পকেটে।

গরম শেষে এ রাজ্যে বৃষ্টি আসবে। এই রোগের এখনও পর্যন্ত ভ্যাকসিন আর ওষুধ না থাকায়, তার শারীরিক আর মানসিক প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিকভাবে কৃষিতে।

সম্প্রতি, রাজ্যের জেলাগুলিতে কৃষকরা যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় জলের দরে শাক-সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, নিকটবর্তী শহর আর গ্রামে। রাজ্য সরকার হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন কৃষকদের এই প্রয়োজনীয় মুহূর্তে। দাম না পাওয়ায় কৃষকদের সহজাত অনীহা আর কৃষি শ্রমিকের অপর্যাপ্ততা আগামী দিনে খানিকটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেক কৃষি-বিশেষজ্ঞদের অনুমান।

আসলে, খারাপ সময় যখন আসে, তখন সব ক্ষেত্রেই আসে। “ব্ল্যাক স্বান” বা “কালো রাজহাঁসে”র মতো একটা কনসেপ্ট রয়েছে অর্থনীতিতে, যা অনাহূত আর অপ্রত্যাশিতভাবে এসে চুরমার করে দিয়ে যায় পণ্যের মূল্যের, বাজারকে ভেঙে দিয়ে। এই Black Swan সমাজের সর্ব ক্ষেত্রেই হতে পারে।

ব্যবসা কম হওয়ায় GST কালেকশন কম হচ্ছে, তাই রাজ্য সরকারের রসদ আর দানাপানি অবিরত শুকিয়ে যাচ্ছে। আর এর ক্যাসকেডিং আর স্পিলেজ এফেক্ট পড়ছে আর পড়বে, সব বিভাগেই।

এটা পরিহার করার জন্য শুধু অসহায় রাজ্যবাসীর প্রার্থনাই যথেষ্ট নয়, অবিলম্বে দরকার এক বলিষ্ঠ সুচিন্তিত কৃষি-আর্থ সামাজিক- রাজনৈতিক পদক্ষেপ —- যেটা হয়তো অধরা অধুরা থেকে যাবে, এ বছর, এ রাজ্যে, নির্বাচিত নেতৃত্বের খামখেয়ালিপনায় আর লোকদেখানো গ্যালারি প্লেয়িং-এ।

ওঠ, জাগো, দেবী! আর ছেলেখেলা নয় রাজ্যবাসীর ভবিষ্যতের মুখের গ্রাস নিয়ে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব )

Related Articles

Back to top button
Close