fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাগুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গবিনোদনহেডলাইন

সাম্যময় ভানুর শতবর্ষ

অরিজিৎ মৈত্র: নিজে হেসেছেন, অপরকেও হাসিয়েছেন। সেই নিয়েই মানুষের মনে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছেন পুবের ভানু। শুধুমাত্র বাংলা ছবির বিভিন্ন চরিত্র চিত্রায়নের তিনি থেমে থাকেননি। তিনি একটি আদর্শের নামও বটে। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে কমেডি চরিত্রের মধ্যে ধরে রাখলে মস্ত অপরাধ হবে। এমন কিছু ছবির নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে যোনে কমেডিয়ান ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অনুপস্থিত। হাসির পরিবর্তে তাঁর চোখে জল। যা দেখে দর্শকরাও হতবাক হয়ে যান। সেই সব দৃশ্যেও তিনি অনবদ্য ও সাবলীল। কোনোভাবেই বেমানান লাগে না। ওই ধরনের ক্যারেকটারের প্রতিও বাঙালির হাসির রাজা সুবিচার করেছেন। ছবিগুলি দেখলে মনে হবে পরিচালক যোগ্য ব্যক্তিকেই নির্বাচিত করেছিলেন অভিনয়ের জন্য। সেখানে কোনও ভুল ছিল না। কমেডি দৃশ্যকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য কোনও সময় তাঁকে বিকৃত অঙ্গভঙ্গির আশ্রয় নিতে হয়নি। সংলাপ বলার টাইমিং এবং ধরনেই দর্শকেরা হেসেছেন। এখানেই তাঁর মুন্সিয়ানা। বাংলা ছায়াচিত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় একটি যুগ এবং সময়। সেই যুগ এখনও চলেছে। ভবিষ্যতেও চলবে।

পার্সোনাল অ্যাসিস্টেন্ট

আচার্য সত্যেন বোসের সুযোগ্য ছাত্র শুধু একজন অভিনেতা নন, ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ। একজন পরিপূর্ণ অভিনেতার মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর কোনদিকটা দিয়ে শুরু করা যায় সেটা ভেবে পাচ্ছি না। একটা কী দুটো ছবির কথা বাদ দিলে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় সব ছবিতেই পার্শ্চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কোনোদিনই রোম্যান্টিক রোলে কাজ করার জন্য ইন্ডাস্ট্রিতে  আসেননি। কিন্তু সেই সব চরিত্র এক সময় ছবির প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে তাঁর অভিনয় গুণে। আমাদের দেশের আঞ্চলিক ছবির চরিত্রে এবং কমেডি ছবির নিরিখে ‘পার্সোনাল অ্যাসিসটেন্ট,’ ‘মিস প্রিয়ংবদা ভানু গোয়েন্দা-জহর অ্যাসিসটেন্ট’, ‘যমালয় জীবন্ত মানুষ’, ‘৮০- তে আসিও না,’ ‘ওরা থাকে ওধারে,’ ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ইত্যাদি ছবি এক একটি মাইলস্টোন হয়ে রয়েছে। সেই সব ছবির কথা মানুষ আজও ভোলেনি।

কিংবদন্তি অভিনেতা সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ওপার বাংলার বিক্রমপুরে ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট। পড়াশোনা সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে। নানা কারণে স্কুলে ছাড়তে হয়েছিল। প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ভর্তি হন জগন্নাথ ইন্টারডিয়েট কলেজে। আর্টসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাম্যময় ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দ্রগুপ্ত নাটকে বাচালের অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেন। ১৯৩১ সালে ঢাকা বেতার কেন্দ্রে যোগদান করেন স্থায়ী শিল্পী হিসেবে। বি. এ. পরীক্ষা সামনে চলে এলে অভিনয় ছেড়ে পড়াশোনায় মন দেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি। ১৯৪১সালের ১৩ অক্টোবর তাঁকে ছ’ মাসের জন্য ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হয়। কোন অপরাধে এমন ঘটেছিল সেটা কেউ বলতে পারেনি। সেই বছরই আয়রণ অ্যান্ড স্টিল কন্ট্রোল দফতরে যোগ দেন।

১৯৪৬ সালে তিনি পরিচালক বিভূতি চক্রবর্তী তাঁর জাগরণ ছবিতে একটি বিশেষ ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং তাঁর নাম বদলে হয় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। সারা জীবনে প্রায় ২৫০ টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন।

৮০ তে আশিও না

জনপ্রিয় ছবির তালিকা দীর্ঘ। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত জনপ্রিয় ছবির নামগুলি বলে দেওয়ার জন্য কোনও বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু এমন কয়েকটি ছবি রযেছে,  যেগুলি দেখতে দেখতে মনে হয়েছে তিনি না থাকলে হয়তো সেই বিশেষ ছবিটি দাঁড়তোই না। যেন দাদাঠাকুর। সেখানে কার্তিক-এর চরিত্রকে তিনি যেভাবে জীবন্ত করে তুলেছিলেন, তেমন কী আর কেউ পারতেন ‘অ্যান্টনী ফিরিঙ্গী’-র সংক্ষিপ্ত অভিনয় মনে দাগ রেখে যায়। ভোলা যায় না তপন সিংহ পরিচালিত হারমোনিয়াম ছবির পুলিশ অফিসারকে। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত অধিকাংশ ছবির চরিত্রগুলিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে এই লেখার কলেবর বৃদ্ধি পাবে।

আরও পড়ুন:ফের উর্দ্ধমুখী সংক্রমণের গ্রাফ! দেশে একদিনে করোনা আক্রান্ত ৬৭ হাজার

শতবর্ষে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম বরণীয় অভিনেতার কথা বলতে গেলে শুধুমাত্র চলচ্চিত্রের মধ্যে আবদ্ধ থাকলে অন্যায় হবে। তাঁর কৌতুকনকশাগুলির কথা ভুলে গেলে চলবে না। পাশাপাশি আছে নাটক। কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে যুক্ত থাকাকালীন শুরু হয়েছিল তাঁর নাটকে অভিনয়। আকাশবাণী কলকাতায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র,  বাণী কুমার, শ্রীধর ভট্টাচার্য, জগন্নাথ বসু প্রমুখের প্রয়োজনের বহু নাটকে অভিনয় করেছিলেন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত মঞ্চনাটকের ভিতর উল্লেখযোগ্য হল ‘শ্যামলী’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘জয় মা কালী বোর্ডিং’,  ‘ডাক বাংলো’, ‘শেষাগ্নি’ ইত্যাদি। যাত্রাও করেছেন।

অমৃতকুম্ভের সন্ধানে

‘যমালয় জীবন্ত মানুষ’, ‘জয় মা কালী বোর্ডিং’-এর যাত্রাভিনয় হয়, তখন সেখানেও তিনি অভিনয় করেন। ১৯৭০ –এ সালে সুশীল নাট্য সংস্থা কিনে সুশীল নাট্য কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৪-এ একটি যাত্রাদলও তৈরি করেছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে সংগীতশিল্পী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর সহধর্মিনী।

প্রভাত মুখোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, সোমা দে-র সঙ্গে শিল্পী

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনে মোট ১০ বার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান পেলেও কখনও রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাননি। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কি কারণে কখনও তাঁর অভিনয় করা হয়ে ওঠেনি জানি না। অবশ্য সত্যজিৎবাবু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বলেছিলেন, বাংলা ছবিতে ক্ষমতাবান জনপ্রিয় চরিত্রাভিনেতাদের দিয়ে সামান্য ভূমিকায় অভিনয় করিয়ে নেবার একটা রেওযাজ অনেক দিন থেকে চালু আছে। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ও এর ব্যতিক্রম নন। সর্বজনপ্রশংসিত বিরল অভিনেতাদের একজন। আমার কোনও ছবিতে যে তিনি আজ পর্যন্ত অভিনয় করেননি তার মানে এই নয় যে আমি তাঁর অভিনয়ের কদর করি না’।আপামর বাঙালি তাঁদের প্রিয় পুবের ভানুকে আজও ভোলেনি।

Related Articles

Back to top button
Close