fbpx
অন্যান্যঅফবিটপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

সুলভ মূল্যের রঙিন পাখনা

অঙ্কন চট্টোপাধ্যায়: কথায় বলে যাঁর নয়-এ হয় না, তাঁর নব্বইতেও হয় না। তিনশো পয়ষট্টি দিনের বিভিন্ন সময়ে এই প্রবাদ আমার মাথায় ঘোরাফেরা করে। তবে এই ভাদ্রের গরমে সেসব বড্ড বেশিই মনে হয়। পঞ্চু যখন মাঞ্জা লাগাতে ব্যস্ত থাকে কিংবা কানাইকাকা যখন বাঁশের কঞ্চি কেটে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ কাগজ লাগায় , তখন মনে হয় এ জীবন বৃথা। এক্ষেত্রে চুলে এখনও অভিজ্ঞতার ছাপ পড়েনি, হাতও পাকেনি। হাওয়াকে বশে রাখতে শিখিনি এখনও। ছোটবেলায় লালু বগগা-র সঙ্গে পেটকাটি শ্যামলের যখন লড়াই হত, তখনও আমার হাতে শুধুই নিভন্ত মোমবাতি।

আজ ব্যালকনিতে বসে যখন শুনি, জুনিয়র ঘোষ জুনিয়র দত্তকে বলছে, ‘কাটা কাটা’…’ডান দিকে ডান দিকে’…’ এই গেল গেল’…তখন সেই নস্টালজিক দিনগুলোয় ফিরে যাই। বগগা-পেটকাটিতে এই মিলন হয় তো এই বিচ্ছেদ। তারপরে হঠাৎ পাশের পাড়ায় কোনও গাছের ডালে আটকে পড়া, কখনও হার স্বীকার করে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, কখনও আবার শুধুই ভোকাট্টার আনন্দ।

মাঞ্জার কাজে ব্যস্ত

বুঝতেই পারছেন আমি ঘুড়ির কথা বলছি। হ্যাঁ ঘুড়ি। পৃথিবীতে গুটিকয় খেলার মধ্যে এটি একটি, যাতে কোনও লিঙ্গগত বিভাজন নেই। এই যে বিশ্বকর্মা পুজো আসছে, এই সময়টা ঘুড়ি ওড়ানোর আদর্শ সময়। তাপমাত্রা অনুকূল না হলেও হাওয়া অনুকূল। গ্রামের দিকে আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, কত ছেলে-মেয়ে স্কুল ফেরত ঘুড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। আকাশময় উড়ছে নানা রঙের ঘুড়ি। শহরে এতখানি হয় কিনা জানি না, তবে যখন শহরে জেঠুর বাড়ি যেতাম দেখতাম এই গরমেও সব দোতলা বাড়ির ছাতে ছেলে-মেয়েরা ঘুড়ি ওড়ানোয় ব্যস্ত। কে কার ঘুড়ি কাটবে এই ভাবনা চিন্তা চলত সারাদিন।

শহরের উত্তরে বাড়িঘর এত গায়ে গায়ে লাগানো যে পরপর বাড়িগুলো লাফ দিয়েই চলে যাওয়া যায়। এই ভাদ্রের রোদে প্রায় সব বাড়ির ছাতেই কলাই ডালের বড়ি, পাঁপড়, আমের আচারের বয়াম, কাসুন্দির শিশি দেওয়া থাকে। কোনো কোনো সময় অসাবধানে একটা আধটা বড়ি পায়ের চাপে ভেঙেও যেতে দেখেছি। দেখেছি এক ছাত থেকে আরেক ছাতে লাফিয়ে এসে আমের আচার খেয়ে যাওয়া, দেখেছি ঘুড়ির মধ্যে প্রেমপত্র আটকে প্রেমিকার ছাতে পৌঁছে দেওয়াও৷ আসলে দেখেছি অনেক কিছুই যা আজকাল আর দেখি না। হয়তো আর কখনও দেখবও না। কলকাতায় ছয় বছর থেকেছি, একটি দিন ভুল করেও আকাশে ঘুড়ি উড়তে দেখিনি। ঘুড়ির সঙ্গে যেন অলিখিত আড়ি হয়ে গেল এই সময়ের কিশোর কিশোরীদের।

মাঞ্জার পরে লাটাইয়ে সুতো ভরা হচ্ছে

 

মনে পড়ে লাল ঘুড়ির গায়ে ইনভিজিবল মার্কার দিয়ে  প্রেমপত্র লেখার কথা। লিখেই যার উদ্দেশে লেখা তার বাড়ির ছাতে ফেলা। তখনও মোবাইল ফোনের আগ্রাসন নেই, সব বাড়িতেই একটা আধটা করে ফোন হয়ত বড়জোর, সে সব বাচ্চাদের হাতে কিছুতেই পড়ে না৷ সুতরাং ঘুড়ির উপর লিখে ফেলা হয় হৃদয়ের কথা। হৃদয় চিহ্ন এঁকে তাতে একটা বড় তির এফোঁড় ওফোঁড় করে পাঠিয়ে  দেওয়া হয় প্রাণবন্ধুর বাড়ি। মিনি-টর্চের আলোয় জ্বলজ্বল করে ওঠে সেই ভালোবাসার ছবি, শব্দ। তারপর উত্তরের জন্য খানিক অপেক্ষা। হোয়াটসঅ্যাপের যুগে এমন ভাবে হৃদয়ের কথা বলা কি আর এখন হয়? এখন কি আর ছাই ঘুড়িই ওড়ানো হয়!

আরও পড়ুন:বিশ্বের সফলতম রাষ্ট্রনায়কের স্বীকৃতি নরেন্দ্র মোদির, ৭৫ শতাংশ ভারতবাসীর অভিমত করোনা মোকাবিলায় এগিয়ে মোদি সরকার

ঘুড়ির ইতিহাসের গল্প ছোটবেলায় শুনতাম একটু বেশী বিদেশী গল্পের বই পড়া দাদুদের কাছে। সেই যে এক চৈনিক রাজা হান শিং একটি শহরকে দখল করতে সেই শহর পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ খুঁড়তে চাইলেন, তারপর তার মাথায় এল এক দারুণ বুদ্ধি। একটি পাতলা রেশমের কাপড়ে শক্ত কঞ্চি বেঁধে তাতে সুতো উড়িয়ে আকাশে দিলেন উড়িয়ে।

তৈরি হচ্ছে রঙিন পাখনা

ঘুড়ি উড়তে উড়তে পাশের শহরে গিয়ে পৌঁছাল। তারপর সেই সুতোর মাপ নিয়ে তিনি সুড়ঙ্গ কেটে সেই শহরকে দখল করলেন৷ এরপর সপ্তম শতকে মানুষ বিশ্বাস করত, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ঘুড়িতে চড়িয়ে অশুভ আত্মাকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাই ফসল ভালো হয়। এইভাবে পরের দিকে জাপানে ঘুড়ি ওড়ানো এতই জনপ্রিয় হয় যে লোকেরা তাদের কাজে যেতে চাইত না। তাই সরকারকে ফরমান জারি করতে হয়েছিল। ৯০৬ অব্দে রাশিয়ার রাজপুত্র নভগরদের ওলেগ কনস্টান্টিনোপল দখল নিতে চেয়ে ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন। এখনও ফিলিস্তিনের ছেলেরা ঘুড়িতে করে আগুনবোমা পাঠায় ইসরায়েলিদের সেনাচৌকিতে।

সুলভ মূল্যে আপনার জন্যে

এখনকার ছেলেমেয়েরা হয়ত গল্পের মতও শোনে না এসব। আসলে ঘুড়িই নয়, ঘুড়ির সঙ্গে ওড়ে প্রতিটা শিশুমন, ঘুড়ি আসলেই যে একটি অত্যন্ত সুলভ মূল্যের রঙিন পাখনা তা এখনকার ছেলেমেয়েরা বুঝেই উঠতে পারেনি। এখন ঘুড়ির গল্প যেন একান্নবর্তী পরিবারের মতই লুপ্তপ্রায়। যেন ঘুড়ি একটা অভিমানী রঙিন কাগজ হ’য়ে দুই প্রজন্মের মাঝে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বকর্মা পুজোতে সারা বাংলায় যে ঘুড়ি ওড়ানোর চল তার বেশিরভাগটাই এখন ভুলে যাওয়া।

লাল নীল সবুজেরই মেলা

ঘুড়ি যেন শৈশবের প্রতীক, যেন ছেলেবেলা থেকে কৈশোর অবধি যাত্রাপথের এক একটা রঙিন ফলক। যাই হোক, এত নঞর্থক কথায় গিয়ে কাজ নেই। আনন্দের কথা হল, আমি জানি, গ্রাম বাংলা বা মফস্বলের বহু জায়গায় প্রতিবারের মতন এ বছরেও ঘুড়ির মাঞ্জা তৈরি হচ্ছে, প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে। জাপানের ঘুড়ি উৎসবের মতই ঢাকাতেও সাকরাইন উৎসব পালন হবে এবারে। আমি জানি বাংলার অনেক গ্রাম হয়তো বা শহরেও এবছরও বিশ্বকর্মা পুজোয় গৃহবন্দি ছোট ছোট প্রাণেরা তাদের রঙিন পাখনা ঘুড়ির সঙ্গে মেলে দিয়ে উড়ে যাবে আকাশে। ওরা বোধহয় জানে পরির দেশের বন্ধ দুয়ার হানা দিলে, তাদের পুরনো সব হারিয়ে যাওয়া ঘুড়ি হয়তো বা সেখান থেকে উদ্ধার হলেও হতে পারে।

Related Articles

Back to top button
Close