fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগশিক্ষা-কর্মজীবনহেডলাইন

সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা-কেন হ্রাস পাচ্ছে হিন্দি মাধ্যমের সফল পরীক্ষার্থী

রবীন্দ্র কিশোর সিনহা: ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন(ইউপিএসসি)২০১৯ সালের পরীক্ষার ফলাফল ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে। এ বছর মোট ৮২৯ জন পরীক্ষার্থী সফল হয়েছেন। সফল পরীক্ষার্থীরা দেশের শীর্ষ কূটনীতিক অথবা শীর্ষ পুলিশ অফিসার হবেন। এ পর্যন্ত সমস্ত কিছু ঠিকই আছে। কিন্তু, গত কয়েক বছর ধরে যে ধারাবাহিকতা চলছে, এবারও তা অব্যাহত। আসলে, হিন্দি মাধ্যম থেকে ভারতের প্রশাসনিক সেবা পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এবার হিন্দি মাধ্যম থেকে পরীক্ষা দেওয়া, প্রথম পরীক্ষার্থী ৩১৭তম স্থানে রয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর আগে থাকা প্রত্যেকেই ইংরেজিতে পরীক্ষা দিয়েছেন। এর ব্যতিক্রমও হতে পারে।

এখন যে পরীক্ষার্থী ৩১৭তম স্থানে রয়েছেন, তাঁর পক্ষে আইএএস, আইপিএস অথবা আইএফএস-এর মতো উচ্চ ক্যাডার পাওয়া কার্যত অসম্ভব। ভারতীয় প্রশাসনিক সেবার ক্রিম ক্যাডার মন করা হবে তাঁদের। কয়েক দশকের পুরনো কথা হবে, যখন শীর্ষ ১০ জনের মধ্যে তিন অথবা চারজন প্রার্থী হিন্দি মাধ্যমের প্রার্থী ছিলেন। এখন হিন্দি মাধ্যমের প্রথম সফল পরীক্ষার্থী ৩১৬ স্থানের পর রয়েছেন। এবার একটু ফিরে দেখা যাক।

আরও পড়ুন:ক্লান্ত শরীর… কবর দিতে গিয়ে নিজেই মৃতদেহের পাশে শুয়ে পড়লেন স্বাস্থ্যকর্মী

২০১০ সাল পর্যন্ত হিন্দি মাধ্যমের প্রায় ৪৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী প্রি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেইন পরীক্ষায় বসতেন। যা এখন ১০ থেকে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেকেই বলছেন, প্রি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেইন পরীক্ষায় যাওয়াই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। মেনে নিন সিস্টেমে নিশ্চয়ই কিছু খামতি রয়েছে। নাহলে এভাবে হিন্দি মাধ্যমের পরীক্ষার্থীরা উধাও হয়ে যেতেন না। হিন্দি পরীক্ষার্থীদের সিভিল সার্ভেন্ট পরীক্ষা থেকে বাইরে যাওয়া দেশের অর্ধেকের বেশি জনগণকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। প্রশ্ন হল, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত হিন্দি মাধ্যমের পরীক্ষার্থীরা ভালো ফল করছিলেন, আচমকাই তাঁরা কেন দুর্দশার শিকার হচ্ছেন।

আমার মনে হয়, বিষয়টি শুধুমাত্র ভাষার নয়, মানসিকতারও। হিন্দিতে দেওয়া উত্তরে খুব বেশি সন্তোষ প্রকাশ করেন না পরীক্ষকরা। উত্তর সঠিক হলেও। হিন্দি ভাষীদের আত্মবিশ্বাস তো এমনিতেই খানিকটা কম। প্রধান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও, ইন্টারভিউতে পর্যাপ্ত নম্বর পাওয়া যায় না। তাহলে কী মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়ার যে কথা বলা হয়, তা শুধুমাত্রই নাটক! আকবর এলাহাবাদী হিন্দিতে ঠিকই লিখেছিলেন,”তালিম কা জোর ইতনা, তহজীব কা শোর জিতনা। বরকত জো নেহি হোতি, নিয়ত কী খারাবি হে।”

হিন্দি ভাষীরা কেন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়া প্রমাণিত হচ্ছে। কিছু কারণ যা বুঝতে পারছি, পাঠ্য সামগ্রীর অভাব, অনুবাদকৃত বই এবং প্রশ্নপত্রের মধ্যে ভুল ব্যাখ্যা, হিন্দি মাধ্যমের পরীক্ষার্থীদের উপেক্ষা করা অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দেওয়া, ইংরেজি মাধ্যমের তুলনায় হিন্দি মাধ্যমের পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা কম হওয়া প্রভৃতি। একটি বিষয় তো অত্যন্ত সঠিক যে, আমাদের এখানে কোচিং সেন্টারের অভাব নেই, কিন্তু উন্নতমানের কোচিং ইনস্টিটিউটের অভাব রয়েছে। এই সমস্ত কোচিং সেন্টারই বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পড়ুয়াদের প্রস্তুত করার দাবি করে। দেশের সমস্ত শহরে ক্লার্ক থেকে সিভিল সার্ভিসের মতো পরীক্ষার প্রস্তুতি দেওয়া হয় এই সমস্ত কোচিং সেন্টারে। হিন্দিতে কোচিং সেন্টার তো প্রতিটি শহরের রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন:বেসরকারি হাসপাতালের বিলে আগুন! অবসাদে আত্মহত্যার চেষ্টা করোনা আক্রান্তের

দিল্লির মুখার্জি নগরে এই ধরনের শতাধিক কোচিং ইনস্টিটিউট রয়েছে। আপনাকে যাঁরা পড়াচ্ছেন তাঁরাও যদি দুর্বল হয়, তাহলে কী করে বেশি নম্বর পাবেন? এটাও মনে হচ্ছে যে, যে সমস্ত কোচিং ইনস্টিটিউট ভালো, তাঁরাও পড়ুয়াদের পঠনপাঠনের সামগ্রী সরবরাহ করতে অসমর্থ। এজন্যই হিন্দি মাধ্যমের পরীক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছেন। ইন্টারনেটে পঠনপাঠনের সামগ্রী খুঁজতে বলা হয় তাঁদের। সেই সমস্ত পঠন সামগ্রী ইংরেজিতেই হয়। হিন্দি মাধ্যমের দরিদ্র পড়ুয়ারা নিজেদের বুদ্ধিতেই সেই সমস্ত পঠন সামগ্রী বুঝবেন এবং উত্তর দেবেন। যদি এমনই পরিস্থিতি চলতে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে শশাঙ্কের মতো বিদেশ সচিব পাবে না দেশ। শশাঙ্ক দেশের সফল বিদেশ সচিব ছিলেন। তিনি হিন্দি মাধ্যম থেকে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফল করেছিলেন। একদিকে ভারত চেয়েছে হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রপুঞ্জের সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করাবে, অন্যদিকে হিন্দি আমাদের শীর্ষ আমলাতন্ত্র থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

হিন্দিকে বিশ্ব মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বার্থক ও দৃঢ় উদ্যোগ নিয়েছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ীজি।
১৯৭৫ সালে প্রথম বিশ্ব হিন্দু সম্মেলন আয়োজিত হয়েছিল নাগপুরে। সম্মেলনে প্রস্তাব পাশ হয়েছিল, “হিন্দিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশনে অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত”। দু’বছর পরেই, ১৯৭৭ সালের ৪ অক্টোবর জনতা পার্টি সরকারের বিদেশ মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়েছিলেন বাজপেয়ীজি। তাঁর আগে ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী অথবা কোনও প্রতিনিধি রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে হিন্দি ভাষার ব্যবহার করেননি। অটলজির ওই ভাষণের পর শুধুমাত্র ভারতে নয় সমগ্র বিশ্বে আনন্দে মেতে উঠেছিলেন হিন্দি প্রেমীরা। কিন্তু, নিজ দেশেই হিন্দির প্রভাব কমছে। এই উদ্বেগজনক নয়, দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি।

আরও পড়ুন:সুরক্ষিত রাখতে এক কুইন্টাল সোনা-রুপো সহ বিপুল ধনরত্ন তুলে দেওয়া হল রাম মন্দির ট্রাস্টের হাতে

এটাও অত্যন্ত কাকতলীয় যে, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় হিন্দি মাধ্যমের পরীক্ষার্থীদের অত্যন্ত হতাশাজনক পারফরম্যান্সে সবাই যখন রীতিমতো উদ্বিগ্ন, তখনই উত্তর প্রদেশের দশম এবং দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষাতেও হিন্দিতে হতাশাজনক ফল করেছে পরীক্ষার্থীরা। অর্থাৎ হিন্দির বিষয়ে কোথাও কোনও ভালো খবর নেই। তাহলে হিন্দির প্রতি উত্তরপ্রদেশের পড়ুয়াদের রুচি এবং আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে? হিন্দির শিক্ষকরা কী নিজের অধ্যাপনা ঠিকভাবে করতে পারছেন না? এই দু’টি প্রশ্ন এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ কারণ, মাতৃভাষায় লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার অনুর্ত্তীর্ণ হওয়া। প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যে সমস্ত পড়ুয়া ইন্টার ও মেট্রিক পরীক্ষায় হিন্দি মাধ্যম থেকে পরীক্ষা দেন, তাঁরা ভবিষ্যতে সিভিল সার্ভিসের মতো পরীক্ষায় ব্যর্থ তো হবেনই। আসলে যাঁরা নিজেকে হিন্দির সেবক বলেন এবং যাঁরা হিন্দির নামে রুটিরুজি উপার্জন করেন, তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে হিন্দি মাধ্যমের পড়ুয়া এবং পরীক্ষার্থীরা কেন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করতে পারছেন না?

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close