fbpx
ব্লগহেডলাইন

কুমিল্লার ঘটনা এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক: ভারতের লোকসভার কংগ্রেস দলীয় নেতা পশ্চিমবঙ্গের অধীর রঞ্জন চৌধুরী বাংলাদেশের কুমিল্লায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার ব্যাপারে মোদি সরকারকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছেন। খবর বিবিসি বাংলা নিউজ। কি ধরণের হস্তক্ষেপ চান এ প্রশ্নের জবাবে শ্রী চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, “ব্যাপারটা হল প্রতিবেশী দেশে যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তখন ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলে সেই দেশকে একটু ‘নক’ করার দরকার হয়।” শ্রী চৌধুরী আরও বলেছেন, অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের ঘটনার প্রভাব সীমান্তের এপারেও পড়তে পারে। সেজন্য তারা চান বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের কাছে উত্থাপন করা হোক। এই প্রথম কংগ্রেস ও লোকসভায় এর দলনেতা বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে মুখ খুললেন।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ‘আমার দিদি’ মমতা ব্যানার্জী কবে মুখ খুলবেন এই অপেক্ষায় আছি। তিনি তাঁর রাজ্যের সংখ্যালঘুদের জন্যে সবকিছু ‘উজাড়’ করে দিচ্ছেন; কিন্তু তাঁর আত্মীয় বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জন্যে আজ পর্যন্ত ‘একটি শব্দ’ খরচ করেননি। কুম্ভকর্ণের ঘুম কি আদৌ ভাঙ্গবে? বাম ঘরানার নেতারা স্পষ্টত: হিন্দু-বিরোধী, ইসলামী মৌলবাদ তোষণকারী, এঁরা এ পর্যন্ত বাংলাদেশের হিন্দুদের বাঁশই দিয়ে গেছেন। তাই এদের কাছে কোন প্রত্যাশা নেই! বাংলাদেশের হিন্দু, মানে আমরা তাই মনে করি, বাম আর ইসলামী মৌলবাদ, একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ? বামদের বড় বড় নেতা বা তাঁদের পূর্ব-পুরুষ, এমনকি জ্যোতিবসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য-সহ অনেকে পূর্ব-পাকিস্তান বা আজকের বাংলাদেশ থেকে ‘লুঙ্গি’ পরে রাতের আঁধারে পালিয়ে এসেছেন? আর পশ্চিমবঙ্গের ‘গরু-খেকো’ বুদ্ধিজীবীরা মূলত: ‘মাইরের ভয়ে’ মুসলিম তোষণ করে চলেছেন!

এরা মুখ না খুললেও কুমিল্লার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতবাসী কথা বলছেন। কলকাতা, দিল্লি, বোম্বে বেশকিছু কর্মসূচি পালিত হয়েছে, আরও হবে। বিজেপি, এর নেতা  দিলীপ ঘোষ এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। কলকাতার মানুষ এখন বাংলাদেশের হিন্দুদের নিয়ে ভাবছেন। বাংলাদেশের হিন্দুরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গ জাগলে দিল্লি জাগবে, দিল্লি কথা বললে, বাংলাদেশের হিন্দুরা আশার আলো দেখবেন। ভারতের কিছু মিডিয়া এবার বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের প্রকৃত সত্য ঘটনা তুলে ধরছে। বিবিসিকে বিজেপি’র জাতীয় মুখপাত্র অপরাজিতা সারঙ্গী, এমপি বলেছেন, ‘কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে সেটা জানার পর নিশ্চয় ভারত ব্যবস্থা নেবে, বাংলাদেশ সরকারের কাছেও বিষয়টা তোলা হবে। বিজেপির পলিসি রিসার্চ সেলের নেতা অনির্বাণ গাঙ্গুলি বলেছেন, ‘ফ্রান্সের ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভের রেশ হয়তো কুমিল্লায় পড়েছে।

বিবিসি’র ভাষ্যমতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এই বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। দিল্লিতে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব জানান, ‘এ ঘটনার ব্যাপারে ঢাকায় আমাদের হাইকমিশন ও উপ-দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলছে। তাদের কাছে বিষয়টি আমরা উত্থাপন করেছি’। তিনি বলেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে যে বাংলাদেশ সরকার কুমিল্লার ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে’। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন অবশ্য বলেছেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ের তাঁর কিছু জানা নেই’। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘এটি আসলে একটি দুর্ঘটনা, সেটা ওই দেশেও হয়’। আমাদের দেশ সম্প্রীতির দেশ। আমাদের দেশে মাইনরিটিরা যত সুখে আছে, অন্য অনেক দেশে সে অবস্থা নেই’।’ ড: মোমেন আরো বলেন, ‘এরকম দুর্ঘটনার আমরা বিচার করি, তাই তদবির করার বা পরামর্শের দরকার নেই’।
কুমিল্লায় আসলে কি ঘটেছিলো, এবং এটা কি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি চলমান হিন্দু নির্যাতনের আর একটি অধ্যায়? ঘটনা পহেলা নভেম্বরের, ঘটনাস্থল কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা থানার ৪নং পূর্ব ধইর ইউনিয়নের কোরবানপুর গ্রাম। এই এলাকার বাসিন্দা ফরাসী নাগরিক কিশোর দেবনাথ কিষান ফেইসবুকে একটি পোস্টিং-এ লেখেন, ‘ফ্রান্স এর সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য ফরাসী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন বিভিন্ন অসামাজিক বা অমানবিক চিন্তাভাবনাকে শায়েস্তা করার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়’। এই পোস্টিং-র ওপরে মন্তব্যে কোরবানপুরে স্কুল শিক্ষক শংকর দেবনাথ লিখেছেন, ‘স্বাগতম প্রেসিডেন্টের উদ্যোগকে’। এই তিনটি মাত্র শব্দে নাকি ‘ইসলামের অবমাননা’ হয়েছে? এরফলে কয়েক হাজার মুসলমান হিন্দু পল্লীতে আক্রমন চালায়, ১২টি হিন্দুবাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই, পুরো এলাকায় লুটপাট, মহিলাদের শ্লীলতাহানী করা হয়েছে। মহিলারা শাঁখা-সিঁদুর ফেলে মুসলমান সেঁজেছে। পুরুষরা সব পালিয়ে বেঁচেছে। আক্রমণকারী তৌহিদী জনতা ৫টি মন্দির ধ্বংস করে। একটি হিন্দু কিশোর উন্মত্ত তৌহিদী জনতার সামনে পরে গেলে জীবন বাঁচাতে নাম পাল্টে মুসলিম সাজে! কানাডার নাগরিক এক হিন্দু বৃদ্ধা সারারাত বাথরুমে কাটিয়ে দেন! অবাক কান্ড যে, প্রশাসন তিনজন হিন্দুকে ইসলাম অবমাননার অজুহাতে গ্রেফতার করেছেন!

কুমিল্লার ঘটনার প্রতিবাদ শুধু ভারতে হচ্ছে তা নয়, বরং পুরো বিশ্বে বাংলাদেশী সংখ্যালঘুরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কোথাও কোথাও সরকারি প্রতিবাদ হচ্ছে। এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে কানাডা এবং আমেরিকার নাগরিক রয়েছেন। ফ্রান্স এবং ওই দু’টি দেশ তাদের নাগরিকদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন; সরকারের কাছে জানতে চাইছেন? হয়তো এসব কারণে, মুখরক্ষার খাতিরে পুলিশ বাদী হয়ে দুই হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মোবাইল কোর্ট কয়েকজনকে স্বল্পমেয়াদি সাঁজা দিয়েছেন। পুরো বাংলাদেশে হিন্দুরা এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছেন। ইউরোপ, আমেরিকায় প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে সম্প্রীতির কথা বলেছেন, তা শুধু কুমিল্লায় নয়, প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও দেখা যাচ্ছে। আর বিচার, ২০১২ সালে ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার অজুহাতে রামুতে যে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে, এরপর রংপুর, অভয়নগর, নাসিরনগর-সহ অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, একটিরও বিচার হয়নি? বাংলাদেশে গত পঞ্চাশ বছরে হাজার হাজার মুর্ক্তি ভাঙ্গা হয়েছে বা মন্দিরে আক্রমন হয়েছে, আজ পর্যন্ত একজনের সাঁজা হয়নি।

কুমিল্লার ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের বিতরণের একটি সুগভীর চক্রান্ত। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রধানত: ১৯৪৬’র নোয়াখালী হিন্দু নিধন দাঙ্গার সবকটি পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। এরসাথে সর্বশেষ সংযোজনটি হচ্ছে, ‘ফেইসবুকে ইসলাম বা নবী, বা আল্লাহ’র অবমাননা’। কিছু মুসলমান নিজের ধর্মের অবমাননা করে হিন্দুকে ফাঁসাচ্ছেন! কাবার ওপরে শিবের ছবি বসিয়েছে জাহাঙ্গীর; বাড়ীঘর পুড়েছে হিন্দুর, দেশত্যাগী হয়েছে বহু। এই অস্ত্রটি প্রয়োগ করা হচ্ছে, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন’- র একটি ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন ধর্মের অবমাননা করা যাবেনা’। কিন্তু এর মিথ্যা প্রয়োগ হচ্ছে শুধু হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর। এটি ‘ব্ল্যাসফেমি’ আইনের নুতন সংস্করণ। এই আইনের ফাঁদে অনেক হিন্দু কারাগারে পঁচছেন, বেশকিছু হিন্দু ছাত্রছাত্রীর জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিস্কার করা হচ্ছে। সরকার সবকিছুর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দেখছেন! বাংলাদেশের চমৎকার সম্প্রীতি বুঝাতে একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত দেই, ১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিলো সাড়ে ৭কোটি, এরমধ্যে হিন্দু দেড় কোটি। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে, মানে পঞ্চাশ বছরের মাথায়, হিন্দুর সংখ্যা এখনো দেড়কোটি, মোট জনসংখ্যা ১৭কোটি! এটাই সম্প্রীতি!

ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস বলে একটি কথা আছে, শুধু অক্টোবর ২০২০’র ক’টি ঘটনার কথা বলছি, পাঠক অ্যানালাইসিস আপনারা করুন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষক কুশল বরণ চক্রবর্ত্তীকে শুক্রবার ১৬ই অক্টোবর রাতে ফেসবুকে সৈয়দ শাহ্জাদ এক ব্যক্তি খুদে বার্তা ও অডিও’র মাধ্যমে হত্যার হুমকি দিয়েছেন, এবং বাংলাদেশকে ২০২৫/২০২৬’র মধ্যে হিন্দুমুক্ত করার কথা বলেছেন। ঢাকা ট্রিবিউন ২৭ অক্টোবর ২০২০ বলেছে, ফেসবুকে ইসলামের মহানবী সম্পর্কে কটুক্তির অভিযোগে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত হিন্দু ছাত্রী তিথি সরকারকে খুঁজে পাচ্ছে না পরিবার। ৫দিন পর মালীবাগ সিআইডি অফিসের চারতলা থেকে হাত-পা বাধা অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিবিসি বাংলা নিউজ ১৫ অক্টোবর ২০২০ জানায়, রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু মাইনীমুখ বাজারে একজন দর্জি সুজন দে-কে ফেসবুকে ইসলামের নবীকে নিয়ে ‘অবমাননাকর পোষ্ট’ দেয়ার দায়ে আদালত সাত বছরের দণ্ড দিয়েছেন। ইসলাম অবমাননা ঘটনায় এটি দ্বিতীয় কারাদন্ড। সময়নিউজ ১২ অক্টোবর ২০২০ জানায়, ফেইসবুকে মুহাম্মদকে নিয়ে কটূক্তি করায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী মিঠুন মণ্ডলের ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে। দৈনিক ঢাকার ভোরের কাগজ ০৫ অক্টোবর ২০২০ জানায়, পার্বতীপুরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, পালানোর সময় দিপ্তী রানী গ্রেফতার। দৈনিক কালের কণ্ঠ ২২ অক্টোবর ২০২০ জানায়, পূজা শুরুর আগেই বোয়ালমারী ও আড়াইহাজারে প্রতিমা ভাংচুর। ১৫ অক্টোবর ২০২০ বিডিনিউজ ২৪ জানায়, ভূমিদুস্যর কবলে’ চৈত্রহাটি মন্দিরের জমি। বিবিসি বাংলা ২৯ অক্টোবর ২০২০ জানায়, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট: পুরুষদের গোড়ালির ওপর পোশাক ও নারীদের হিজাব পরার নির্দেশ যে নির্দেশ দিয়েছেন, চাপের মুখে তিনি তা বাতিল করেছেন। পাঠক, কিছু বোঝা গেলো?

Related Articles

Back to top button
Close