fbpx
অফবিটআন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণবাংলাদেশহেডলাইন

জর্জ ফ্লয়েড ও নিখিল তালুকদার-এর কথোপকথন…

শিতাংশু গুহ, ১০জুন মে ২০২০, নিউইয়র্ক: পরপারে দুই বন্ধু’র কথোপকথন। একজন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের শিকার কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড, অন্যজন বাংলাদেশে ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার নিখিল তালুকদার।

জর্জ ফ্লয়েড: তোমার নাম কি?

নিখিল তালুকদার: নিখিল। তোমার?

জর্জ ফ্লয়েড: জর্জ।

জর্জ: তোমার নাম শুনেছি। জানি যে তুমিও আমার মত পুলিশের পিটুনিতে মরেছো।

নিখিল: হ্যাঁ, তোমার এক সপ্তাহ পর।

জর্জ: কি হয়েছিল?

নিখিল: তুমি যেমন কুঁড়ি ডলারের জাল নোট দিয়ে ধরা খেয়েছো, আমিও তেমনি তাস খেলে ধরা খেয়েছি।

জর্জ: আমি তো আগেও ক’বার জেল খেটেছি, এবারো বিশ ডলারের জাল নোটটি সত্যি সত্যি জাল ছিল। কিন্তু তোমার দেশে তো তাস খেলা বেআইনি না, তবু তুমি ধরা খেলে কেন? হিন্দু বলে?
নিখিল: হতে পারে, হিন্দু পেটানো এখানে কোন ব্যাপার না! যেমন তোমার দেশে কালো বলে পুলিশ তোমার গলা টিপে দিয়েছে?
জর্জ: আমাকে মেরেছে সাদা পুলিশ, আমাদের দেশে এটাকে বলে ‘বর্ণবাদ’। তোমার দেশে কি বর্ণবাদ আছে?
নিখিল: না, নেই।
জর্জ: তবে তুমি মরলে কেন? এটাকে কি বলে?

নিখিল: আমি মরেছি ‘হিন্দু’ বলে, এটাকে বলে ‘সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস’।
জর্জ: ও, বুঝলাম। বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস অনেকটা একই?

নিখিল: খানিকটা এক হলেও তফাৎ অনেক।

জর্জ: কি রকম?

নিখিল: কালো হয়ে জন্মালেও তুমি মরলে ভিআইপি হয়ে, আর আমি মরলাম ‘হিন্দু’ হয়ে?

জর্জ: কি বলছ?

নিখিল: তুমি মরেছো বলে হাজার হাজার মানুষ দুই সপ্তাহ’র বেশি করোনা ভাইরাস উপেক্ষা করে রাস্তায় প্রতিবাদ করছে। আমার জন্যে কেউ রাস্তায় নামা তো দূরের কথা, মানুষ শুনতেই চায় না কি হয়েছে? ভাবটা এ রকম যে, একটা হিন্দু মরেছে তাতে কি হয়েছে?

জর্জ: বলো কি?

নিখিল: প্রথম কয়দিন তো মামলাও করতে দেয়নি, এখন শুনছি নাকি মামলা হয়েছে।

জর্জ: যাক, তাহলে অপরাধী সাজা পাবে?

নিখিল: সেই গ্যারান্টি নাই, উল্টা আমার পরিবারের ওপর জুলুম নেমে আসতে পারে।

জর্জ: কোনও আইন-কানুন নেই?

নিখিল: আছে, তবে হিন্দু’র জন্যে না!

জর্জ: তাহলে তো তুমি মরেও শান্তি পাবেনা?

নিখিল: ঠিক ধরেছো। তুমি মরেছো, তোমার পরিবার মিলিয়ন, মিলিয়ন ডলার পাবে। তোমার কন্যার কলেজ পড়া ফ্রী হয়ে গেছে। তোমার নামে বৃত্তি, ফাউন্ডেশন কত কি হচ্ছে? বললাম না, তুমি মরে ‘হিরো’ হয়ে গেছো। আর আমি মরে ‘জিরো’ হয়ে গেছি।

জর্জ: তুমি কি বলছো, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না? আমাকে মেরেছে সাদা পুলিশ, দেখো এখন আমার জন্যে সাদারা কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। একজন পুলিশ আমাকে মেরেছে, পুরো পুলিশ বাহিনী ‘হাটু গেঁড়ে’ প্রতিবাদ সমর্থন জানাচ্ছে।

নিখিল: তাইতো বলি, তুমি ভাগ্যবান। আমাকে মেরেছে একজন মুসলমান পুলিশ, মুসলমান তো দূরের কথা, আমার স্বজাতি একজন হিন্দুও মাঠে নামেনি। বরং স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান নেতারা মিলে যাতে মামলা না হয়, সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমার স্ত্রীকে বলেছে, মামলা করে কিচ্ছু হবে না, তারচেয়ে বরং তোমাকে ২লক্ষ টাকা (২৩০০ মার্কিন ডলার) নগদ, তুমি ও তোমার দেওরের চাকুরি দেওয়া হবে, মেনে নাও!

জর্জ: তোমার স্ত্রী মেনে নিল?

নিখিল: জর্জ, তুমি বুঝবে না! না মেনে কি উপায় আছে? ওদের কথাই আদালতের রায়! একজন দরিদ্র কৃষক গ্রাম্য মহিলার কি সাধ্য আছে ওদের অমান্য করার।

জর্জ: তবে যে বললে, মামলা হয়েছে।

নিখিল: শেষ পর্যন্ত হয়েছে। ওটা লোক দেখানো, কিচ্ছু হবে না। দেশের বাইরে কিছু লোক হৈচৈ শুরু করছে, তাই একটা মামলা হয়েছে আর কি!

জর্জ: কি বলছো তুমি?

নিখিল: দেখো, মামলা নিয়ে আমার তেমন মাথাব্যথা নেই? আমি ভাবছি, তোমার মৃত্যু তোমার সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে দিয়েছে। তুমি মরেও সার্থক। আমার মৃত্যু আমার ছোট্ট দু’টি সন্তানকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।

জর্জ: আমি দু:খিত, বন্ধু।

নিখিল: আমি মরেছি তাতে দু:খ নাই, আমার মৃত্যু যদি আমার সন্তান দু’টোর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে দিতো, তবে আমি মরেও আমি শান্তি পেতাম। বন্ধু, দেশ-কাল পাত্র ভেদে একেই বলে ‘এক যাত্রায় ভিন্ন ফল’।

জর্জ: আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, একটি অপরাধ হয়েছে, বিচার হবেনা কেন?

নিখিল: এতে আমার দেশের ভাবমুর্ক্তি ক্ষুন্ন হবে। সামান্য এক নিখিলের মৃত্য’র জন্যে তো দেশের ‘চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ নষ্ট হতে দেওয়া যায়না!

জর্জ: মাই গড! আমার জন্যে ‘ব্ল্যাক লাইভ মেটার্স’ আন্দোলন হচ্ছে, তোমার জন্যে কিছু হবেনা?
নিখিল: বাইরে থেকে কিছু লোক ‘হিন্দু লাইভ মেটার্স’ শুরু করার চেষ্টা করছে। কাজ হচ্ছেনা। হিন্দু লাইফ আসলে বাংলাদেশে মেটার করে না! ওটা সফল হবে না।

জর্জ: কেন সফল হবে না?

নিখিল: তোমার দেশে সংখ্যাগুরু সাদারা এগিয়ে এসেছে। আমার দেশে সংখ্যাগুরুরা সবদিকে শ্রেষ্ঠ, তাঁরা নিকৃষ্টদের নিয়ে তেমন মাথা ঘামানোর প্রয়োজন মনে করেনা।
জর্জ: আমার ফিউনারেলে কত ভিআইপি এসেছে, তোমার শেষকৃত্যে কতজন ভিআইপি এসেছিল?
নিখিল: বন্ধু, ভিআইপি কি জিনিস আমি বুঝি না। আমি হিন্দু, তারপর পুলিশ মেরেছে। শেষকৃত্য আবার কি? কোনমতে সবকিছু শেষ হয়েছে।

জর্জ: সত্যিই তুমি দুর্ভাগা।

নিখিল: ধন্যবাদ, তুমি বুঝতে পেরেছো।

জর্জ: ধন্যবাদ, উই উইল মিট এগেন।

( লেখকের লেখার বক্তব্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত)

Related Articles

Back to top button
Close