fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

ফেসবুকে দুর্দশা জেনে লোধা, শবরদের ত্রান দিলো কুইজ কেন্দ্র

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। আর ইচ্ছে যদি ষোলো আনা না হয়ে আঠারো আনা থাকে, তবে তো কথাই নেই। শিক্ষক অরিন্দম দাসের ইচ্ছেশক্তির কাছে হার মেনেছে কোরোনা ভাইরাস। ফেসবুক থেকে জেনে ছিলেন তাঁর পুরানো কর্মস্থল জঙ্গল মহলের ঝাড়গ্রাম জেলার জামবনী ব্লকের প্রত্যন্ত একটি এলাকার দুর্দশার চিত্র। সেখানকার মানুষের কষ্টের ছবি দেখে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে অরিন্দমবাবুর মন। তিনি মেদিনীপুর কুইজ কেন্দ্র সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সদস্য।

আসলে ফেসবুকে এই ছবি শেয়ার করে সাহায্যের আবেদন রেখেছিলেন রাহুল সমাদ্দার। অরিন্দমবাবুর পূর্বপরিচিত। রাহুলবাবু ওই ব্লকেরই চিল্কিগড় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যায়তনের পার্শ্ব শিক্ষক। ফোনে কথা বলে অরিরন্দবাবু জানতে পারেন পাশের লোধা-শবর অধ্যুষিত গ্রামগুলির কিছু পরিবারের অবস্থা খুবই শোচনীয়।

গত বছর ছয়েক ধরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মেদিনীপুর কুইজ কেন্দ্র সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সাথে যুক্ত থেকে অরিন্দম বাবুরা নানান সামাজিক কাজ করে চলেছেন। তাই দেরি না করে তিনি যোগাযোগ করেন সংগঠনের সম্পাদক সুজন বেরার সাথে। সংগঠনের উদ্যোগে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয় তৎক্ষণাৎ।

সুজনবাবু বলেন, লকডাউনে ওঁদের দুরবস্থার কথা পৌঁছে দিতে হবে প্রশাসনের কাছে। কারণ সংগঠনের পক্ষ থেকে হয়তো প্রাথমিকভাবে কিছু খাদ্যসামগ্রী বা কিছু জামাকাপড় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে পৌঁছে দেওয়া যেতেই পারে। কিন্ত তাতে ওঁদের কিছু দিন চললেও সারা বছর চলবেনা। তাই সংগঠনের তরফে তাঁদের কাজ হবে প্রাথমিক ভাবে কিছু ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনকে সঠিক বার্তা দেওয়া। যাতে ওঁদের স্থায়ীভাবে আগামী জীবন বাঁচে।

সংগঠন থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে এখানে খাবারের অভাব তো রয়েইছে, এমন কি পরনের কাপড়েরও অভাব রয়েছে কয়েকটি লোধা পরিবারে। অরিন্দমবাবুরা ঠিক করেন আপাতত পাঁচটা পরিবারের জন্য রসদ পৌঁছে দিতে হবে। সেই মতো শুরু হয় প্রস্তুতি। পাড়ার এক দোকান থেকে আলু, পেঁয়াজ, চিড়া, মুড়ি ,ডাল, গায়ে মাখা সাবান, কাপড় কাচা সাবান, সাবান গুঁড়ো, লবন,সরিষার তেল, চিনি, বিস্কুট, হরলিক্স, সোয়াবিন এবং পাড়ার কাপড়ের দোকানদারকে অনুরোধে করে গোটা কয়েক লুঙ্গি, গেঞ্জী, গামছা, শাড়ি যোগাড় করা হয়। পাশাপাশি কেনা হয় বেশ কিছু কাঁচা সবজি।

প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে অরিন্দমবাবু সহ আর একজন জামবনীর পথে রওনা দেন। অবশেষে প্রশাসনিক সহযোগিতায় ধেড়ুয়া থেকে বাইক নিয়ে স্থানীয় এক সার ব্যবসায়ীর সাহায্যে মালপত্র দুটো বস্তায় প্যাকিং করে দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ কিমি পথ পেরিয়ে জামবনী পৌঁছান।

সেখান থেকে দুবড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের গোপালপুর গ্রাম। যেখানে পুরো গ্রামটাতেই লোধা শবরদের বাস। এই গ্রামেরই বাসিন্দা বাদল শবর ষাটোর্ধ বৃদ্ধ। হৃদরোগের সমস্যায় চলশক্তি এবং বাকশক্তি দুইই প্রায় হারিয়েছেন। দেখারও কেউ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে মৃত্যুর জন্য দিন গোনা ছাড়া আর কোন উপায় নেই তাঁর। কুইজ কেন্দ্রের তরফে বাদলবাবুর স্ত্রীর হাতে পরনের নতুন কাপড় এবং খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।

এরপর তাঁরা যান অমল শবরের বাড়ি। খাবারের অভাবে প্রতিবন্ধী অমলবাবু একেবারে মাটির সঙ্গে এক হয়ে পড়ে রয়েছেন। ওনার স্ত্রীরও কোনক্রমে লজ্জা নিবারণের মত পোশাকে রয়েছেন। ওনাদের জন্য শাড়ি, লুঙ্গি এবং আগামী বেশ কিছুদিন কেটে যাওয়ার মতো রসদ তুলে দেওয়া হয় কুইজ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে।

তারপর কিছু দুরের লালবাঁধ অঞ্চলের অন্য এক গ্রাম খড়্গপুরে পৌঁছান ওঁরা। সেখানে বনমালী শবরের বাড়ি। বাড়ি মানে ডালপালা দিয়ে তৈরি একটা ঝুপড়ি। যার মধ্যে একটা গরুও ঠিক ভাবে থাকতে পারে না। সেখানেই সংসার যাপন করেন বনমালী ও তাঁর স্ত্রী। একটু ছেড়েই কিছুটা দূরে ছিটেবেড়ার ঘরের বাসিন্দা দুই শবর বিধবা লক্ষ্মী ও মালতীর হাতেও সাহায্য তুলে দেন কুইজ কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা।
এই পরিবারগুলোর কেউই ভিক্ষা করে খায়না। জীবন জীবিকা সবই জঙ্গল নির্ভর। জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করার পাশাপাশি গ্রাম বা বাজার এলাকায় বিক্রি করে বা পাতা সংগ্রহ করেই দিন গুজরান হয় এঁদের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কাঠ পাতা কেনার লোক কোথায়? নিজের গ্রাম ছেড়ে যাওয়াও নিষেধ। আর তাতেই নেমে এসেছে চরম সংকট।

সরকারি সাহায্য তেমন এসে পৌঁছায়না এঁদের দুয়ারে। তাঁর আগেই হাপিস হয়ে যায় নেতাদের পকেটে। রেশনে অল্প হলেও চাল পান সব পরিবারই। কিন্তু শুধুই চাল। নুনটুকুও জোগাড় করা মুশকিল ওঁদের। পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য তথা এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবী সমীর কুমার ধলও ছিলেন। উনি অবশ্য আশ্বস্ত করেন বিভিন্ন সরকারি সাহায্য যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছে দেবেন ওঁদের কাছে।

অরিন্দম বাবুর মতে,বর্তমানে জাতীয় বিপর্যয় চলছে। এই লকডাউনের সময় সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব সরকারের। আমরা মনে করি এই দায়িত্ব এই মুহুর্তে কোনো সামাজিক সংগঠনের নয়। তাই অরিন্দমবাবুরা যোগাযোগ করেন স্থানীয় প্রশাসন, বিডিও ও চিকিৎসা পরিষেবার জন্য বি.এম.ও.এইচ এর সাথে। ওনারা প্রত্যেকেই বিষয়টি আন্তরিক ভাবে গ্রহণ করেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন।

Related Articles

Back to top button
Close